
টেম্পরি থমাস
শেষ আপডেট: 18 March 2025 15:50
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সালটা এখনও মনে আছে টেম্পরি থমাসের। ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭৭।
মনে আছে সময়টাও। শেষবিকেলের মন-খারাপ-করা আলোটা সদ্য মুছে গেছে। সন্ধ্যা নামছে চুপিচুপি। বাড়িতে উনুন ধরেনি তখনও। জ্বালানি বাড়ন্ত। তার জোগাড়যন্তর করতেই বেরিয়েছিল টেম্পরি। বয়স তখন মোটে পাঁচ বছর। এ রাস্তা সে রাস্তা ঘুরে এক সময় উঠে বসেছিল লোকাল ট্রেনে। একা একা। তারপর খড়দহ স্টেশনে নেমে পড়েছিল সে।
সঙ্গীহীন। অজানা জায়গা। উদ্দেশ্যহীন ঘোরাফেরা দেখে এক ব্যক্তির সন্দেহ হয়। তিনি নিয়ে আসেন খড়দহ পুলিশ স্টেশনে৷ এক রাত্তির সেখানে কাটানোর পর রেবেকাকে অনাথাশ্রমে পাঠানো হয়। সেখান থেকে প্রেসিডেন্সি জেলে।
পাক্কা এগারো মাস জেলে ছিল একরত্তি মেয়েটি। তারপর কোথা থেকে কী সব হয়ে গেল! একদল অচেনা ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলা এলেন দেখা করতে৷ ধোপদুরস্ত পোশাকে। কথা বললেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন৷ হাসিমুখে। তারপরের গন্তব্য কোনও সংশোধনাগার নয়—প্রায় ১৩ হাজার কিলোমিটার দূরের একটি অনাথাশ্রম। সাকিন: মিনেসোটা। দেশ: আমেরিকা।
ইন্টারন্যাশনাল মিশন অফ হোপ। এই নামেরই এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার মদতে মার্কিন মুলুকে চলে আসেন টেম্পরি। তারপর থেকে সেখানেই রয়েছেন তিনি। পড়াশোনা, কাজকর্ম, বিয়ে-থা—সব আমেরিকায়। অ্যাশলি ও এস্তেল নামে দুই সন্তানের জননী। ৩০ বছর ধরে হাউজ ক্লিনিং ব্যাবসা চালাচ্ছেন। নিরুপদ্রব জীবন৷ নিশ্চিন্ত ভবিষ্যৎ। সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল।
কিন্তু বাদ সাধল একটি বই: ‘আ লং ওয়ে হোম’। লেখক সারো ব্রেইরলি। অস্ট্রেলিয়ান। কিন্তু ভারতীয় বংশোদ্ভূত। ব্যক্তিগত জীবনের আখ্যান সেই বই। ঘরছাড়া এক কিশোর কীভাবে সাগর পেরিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে পৌঁছল, তারপর পথ চিনে ফিরে এল জন্মদাত্রী মায়ের কাছে—এই মানবিক গল্পই উপন্যাসের পাতায় লিখে রেখেছেন সারো।
পাতা উল্টে কিছুক্ষণের জন্য উন্মনা হয়ে পড়েছিলেন টেম্পরি। এ যে হুবহু তাঁরই জীবনের কথা! জন্ম ভারতে, রয়েছেন বিভুঁইয়ে৷ মা, বাবা, দাদা, দিদি—সাজানো সংসার ছিল৷ তাঁরা কোথায়? খড়দহ, ব্যারাকপুর, কলকাতা—কিছু নাম অস্পষ্ট মনে আছে কেবল। আর মনে আছে, বাবার পেশা। বিড়ি কারখানায় কাজ করতেন তিনি। মা লোকের বাড়ি ফাইফরমাশ খাটতেন। দাদার নাম মনে নেই। শুধু আবছাভাবে স্মৃতিতে ধাক্কা মারে তার আটকে আটকে কথা বলার ছবিগুলো।
আর এই ছবির টানেই ভরাট না হওয়া অ্যালবাম সাজাতে গত সপ্তাহে মিনেসোটা থেকে কলকাতাগামী বিমানে চড়ে বসেন টেম্পরি থমাস। শনিবার নামেন দমদমে৷ পরদিন, রবিবার, খড়দহে চলে আসা। সেই খড়দহ, যেখান থেকে অনাথাশ্রম, প্রেসিডেন্সি জেল হয়ে একদিন মার্কিন মুলুকে পাড়ি জমিয়েছিলেন বছর পাঁচেকের টেম্পরি৷ স্মৃতি হাতড়ানোর পর শেষ চিহ্ন হয়ে ফুটে ওঠে খড়দহ পুলিশ স্টেশন৷
‘পেছনের দরজাটা বদলায়নি, একই রকম আছে। আর সামনে যে টিউবওয়েলটা দেখছেন, সেখানে আমি সন্ধেবেলা মুখ ধুয়েছিলাম।’—১৯৭৭ সালের ১৪ ডিসেম্বরের সন্ধ্যা আবছায়াভরা নয়, শত সহস্র নক্ষত্রমালায় জেগে ওঠে টেম্পরির স্মৃতিপটে। তারপর সেই সপ্তর্ষিমণ্ডলের নকশা খুঁজে কখনও পা বাড়ান ব্যারাকপুরের চিড়িয়া মোড়ে, যে মোড় তার বিশেষ গোলকাকৃতির জন্য এখনও ধূসর হয়ে ওঠেনি, বিলক্ষণ মনে রেখেছেন টেম্পোরি। কখনও-বা হাতড়ে চলেন সেই চার্চ, যার ঠিকানা মলিন হতে হতে প্রায় মুছে যাওয়ার মুখে৷ শুধু মনে আছে: চার্চের পাঁচিলটি ছিল বেশ লম্বা। আর তার পাশেই ছিল দিদিমার বাড়ি। মায়ের হাত ধরে লোকাল ট্রেন ধরে প্রায়শই কলকাতা আসতেন৷ তারপর দোতলা বাসে চড়ে মামার বাসায়৷
লোকাল ট্রেন, ক্ষয়াটে টিউবওয়েল, পুলিশ স্টেশনের পাল্লাভাঙা দরজা, ডবল ডেকার বাস—কলকাতা আর শহরতলির ভূগোল এতদিনে বদলে গিয়েছে। গুগল ম্যাপের জমানায় স্মৃতির কম্পাস কতখানি অব্যর্থ? কতখানি নিখুঁত? এরও উত্তর খুঁজছেন টেম্পরি। এবার তাঁকে খালিহাতেই ফিরতে হয়েছে৷ সন্ধান পাননি পুরোনো বাসার, ফেলে আসা স্বজনের৷ কিন্তু ছিন্নমূল হওয়ার যন্ত্রণা যাঁকে একবার বিঁধেছে, তিনি কি চিরকাল ঘরছাড়া হয়ে থাকতে পারেন? তাঁকে ফিরে আসতেই হয়৷
ফিরে আসবেন টেম্পরি। পরের বছর৷ নতুন স্বপ্ন বুকে, নতুন চিহ্ন মাথায় নিয়ে, নতুন সংকেত স্মৃতিতে বুনে৷ একদিন খোঁজ পাবেন সেই দাদার। কথা বলতে গিয়ে হোঁচট খেত যে। খুঁজে পাবেন সেই দিদিকে। গোধূলিবেলায় যার সঙ্গে জ্বালানি কুড়িয়ে বাড়ির পথ ধরত একরত্তি টেম্পরি৷