.jpeg)
গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 27 March 2025 17:47
একটি পোস্টার, তাতে লেখা একটা প্রশ্ন আর তার নিচে দশ ডিজিটের একটি ফোন নম্বর। রুবির মোড় থেকে হাতিবাগান, এসপ্ল্যানেড থেকে বেহালা- এই পোস্টারেই মুখ ঢেকেছে শহর। পোস্টারের প্রশ্ন, 'অসহায় লাগছে'? তার ঠিক নিচে দেওয়া মৃত্যুঞ্জয় কর নামে এক ব্যক্তির নম্বর। পথচলতি মানুষ থমকে দাঁড়াচ্ছেন সেই পোস্টারের সামনে। কেউ কেউ নম্বরে ফোন করে হোয়াটসঅ্যাপ করেও দেখছেন। শহরে নতুন মনোবিদের আবির্ভাব? জানা যায়, বাস্তবের সঙ্গে এর কোনও মিল নেই! এ আসলে সিনেমার প্রচার। মানসিক অসুস্থতা নিয়ে গিমিক! মানতে পারছেন না অনেকেই। সমাজমাধ্যমজুড়ে পড়ছে লম্বাচওড়া পোস্ট। কেউ বলছেন অসংবেদনশীল, আবারও কারও মতে বড়ই বেদনাদায়ক! দ্য ওয়ালের তরফে বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হয়েছিল লাইফ কোচ ঐন্দ্রিলা চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। একজন কাউন্সেলার হিসেবে তিনি বিষয়টিকে ঠিক কীভাবে দেখছেন, তা নিয়ে হল আলোচনা।
পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের নাম ছবিতে মৃত্যুঞ্জয় কর। এই নামের সঙ্গে যে নম্বরটি দেওয়া আছে তাতে 'হেল্প' চাইলে আসছে একটা লিঙ্ক। জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে আগামী ১১ এপ্রিল আসতে হবে সিনেমা হলে। আর এনিয়েই যতকাণ্ড। এমন পিআর স্টান্টে হতাশ মনোবিদরা। ঐন্দ্রিলাও জানালেন সহমত। একদা মার্কেটিং সেক্টরের অংশ হওয়ায় এমন মার্কেটিং নিয়ে ভেবে দেখার পরামর্শও দিলেন।
তাঁর বক্তব্য, 'যেকোনও প্রচারই ভাল, কিন্তু সেটা যখন কোনও একটা সোসাইটিতে প্রভাব ফেলছে, সাধারণ মানুষ অসহায়, তখন রিথিংক করা উচিত। অসহায় মানে এমন একটা সময় যখন সত্যিই সাহায্য দরকার। আর ঠিক সেই সময়েই যখন কেউ বলছেন, আপনি অসহায়? এই নম্বরে ফোন করুন। তারমানে ওই নম্বরে ফোন করলে আমার ভাল হবে। কিন্তু যোগাযোগ করে দেখা যাচ্ছে সিনেমার প্রচার। শেষে একদম সতর্ক বার্তা হিসেবে লেখা একটা লাইন। দেওয়া সংস্থার নাম।'
শুধু একটা সংস্থার নাম নীচে দিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ? সে তো গুগল করলেই পাওয়া যায়। পাল্টা প্রশ্ন তোলেন ঐন্দ্রিলা। জানান, যিনি ওই নম্বরটি দেখে সময় নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ করবেন, আশা নিয়ে মেসেজ করবেন যে কিছু একটা ভাল হবে, কেউ একজন খুব খারাপ কিছু থেকে বের করতে পারবে অন্তত। তিনি আশাহত হবেন। আর সবসময় মানসিক সমস্যাই যে হতে হবে তা নয়। এমনি কোনও সমস্যাও হতে পারে। খুবই এমার্জেন্সি কোনও সিচুয়েশনে আছেন কেউ।
ঐন্দ্রিলা ব্যাখ্যা করেন বলেন, 'আমরা তো সাধারণ মানুষ, বুঝি না কোনটা মার্কেটিং, গিমিক আর কোনটা সত্যি। সাধারণভাবেই দেখব। কিছু ভাবব না। ফোন করব, সাহায্য চাইব। হতাশা আর অসহায়তা আরও বেড়ে যাবে। আমি তো বুঝতেই পারব না হচ্ছেটা কী। আমরা এমন একটা দেশে বাস করি, এমনই মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে একটা ট্যাবু চলে। এই নিয়ে মিসলিড করার উদাহরণও কম নেই। অধিকাংশ মানুষ এটা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে চান না, কথা বললে হেনস্থার শিকার হতে হয়। হাসাহাসি করা হয়। লঘু করে দেওয়া হয়। এটা আদতে এমন নয়। যারা ফেস করছেন তারা জানেন। এটা তো তাঁদের কাছে মকারি। সাহায্য চাইছি, উল্টে কেউ বলছে, সিনেমা দেখতে যাবেন!'
হোয়াটসঅ্যাপে মৃত্যুঞ্জয় করের থেকে পাওয়া পোস্টার দেখে আরেকটি বিষয়ে আলোকপাত করেন লাইফ কোচ। ওই বার্তার শুরুটা বাংলায় আর আসল সাহায্য সংক্রান্ত লাইনটি ইংরাজিতে লেখা। এটাও সমস্যা। হয় পুরোটাই বাংলায় লেখা হত না হয় পুরোটাই ইংরাজিতে। এটা যদি উল্টো করা হত, তাহলে ভাল হত। মানে প্রথমে যদি বলা হত আপানার সাহায্য লাগবে, আমরা আছি, এখানে যোগাযোগ করুন। তারপরে বলা হত, আমরা এই নিয়ে একটা সিনেমা বানাচ্ছি, আপনি চাইলে দেখতে পারেন, তাহলে তবুও এটা নিয়ে মানুষের ক্ষোভ তৈরি হত না বলে মনে করছেন তিনি।
একদা মার্কেটিং সেক্টরের ঐন্দ্রিলা মনে করেন, 'মার্কেটিং হলেও কিছু নিয়ম থাকে, সবকিছু নিয়ে হাসি মজা করা যায় না। আর এটা এমন একজনের ছবি, যিনি খুবই বিখ্যাত, তাঁর ফ্যান ফলোয়িং রয়েছে। তাঁর বা তাঁদের কাছ থেকে ভাল কিছু আশা করব। প্রথম সারির নির্মাতা যখন এমন কাজ করে তখন তাঁকে দেখে তো আরও কেউ এই একই কাজ করতে পারে। তাঁদেরও মনে হতে পারে, এই ধরনের জিনিস করা যায়। সেটা তো মোটেও ভাল হবে না।'
গোটা বিষয়টি নিয়ে বেশিরভাগ মনোবিদই মনে করছেন, এমন না করে একটু অন্যভাবে ভাবা যেতে পারত। ঐন্দ্রিলারও একই কথা। 'এটা ধাক্কা লাগার মতো। এটা তো মজা, আকর্ষণ করার জন্য। আরেকটু বেশি সচেতন হয়ে ভেবে করলে হয়তো অন্যভাবেও করা যেত।'
পরিচালক সৃজিত অবশ্য জানিয়েছেন এই পিআর স্টান্টের নেপথ্যে তাঁর ভূমিকা নেই। সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, 'সকলকে জানিয়ে রাখি, কিলবিল সোসাইটির কোনও মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি বা সৃজনশীল সিদ্ধান্তে আমার ভূমিকা নেই। এর উদ্ভাবন ও অন্যরকম চিন্তাভাবনার জন্য প্রশংসা অথবা সমাজের উপর সম্ভাব্য ক্ষতিকারক প্রভাব নিয়ে যে আলোচনা হচ্ছে তার উত্তর এসভিএফ (ছবির প্রযোজনা সংস্থা)-এর কাছেই গচ্ছিত আছে। তাই সঠিক জায়গায় প্রশ্ন করা উচিৎ। লেখক ও নির্মাতা হিসেবে শুধু এটুকুই বলতে পারি, এই ছবি অ্যাঞ্জেলিনা জোলির জীবনের একটি সত্যি ঘটনা অবলম্বনে।'