
'টিনটিন'-থিমের ক্যাফে
শেষ আপডেট: 27 January 2025 18:02
দ্য ওয়াল ব্যুরো: গল্পের টিনটিন আর যাই হোক ভোজনরসিক নয়। অ্যাডেভেঞ্চারপ্রিয়। সাদামাটা হানি স্যান্ডউইচ দিয়ে সে আস্ত ‘চন্দ্রলোকে অভিযান’ সেরে ফেলে। কন্টিনেন্টাল ব্রেকফাস্টে সাজানো টেবিলে বসে কেবলই মেপে চলে এর-তার শরীরী ভাষা। খুঁজে যায় আদত শত্রুটিকে। অর্থাৎ, কাঁটাচামচের কারবারের চাইতে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার পরিকল্পনা ফাঁদতেই সিদ্ধহস্ত এই খুদে অভিযাত্রীটি।
এমন স্বল্পাহারী টিনটিন কি কখনও কলকাতায় এসে মুচমুচে ফিশ ফ্রাইয়ে কামড় দিয়েছিল? চেখে দেখেছিল আলুভাতে (নব্য আধুনিকদের ভাষায় ম্যাশড পটেটো), সেদ্ধভাত ও তৎসহ মাংস দিয়ে প্রস্তুত ডিশ ‘পট রোস্ট চিকেন’? ডেজার্টে দেশোয়ালি বেলজিয়ান চকলেটে বানানো পুডিংয়ে কি একবারও চামচ গেঁথেছিল সে?
টিনটিন-বিশেষজ্ঞেদের কাছে এমন প্রশ্ন কস্মিনকালেও আমল পাবে না। প্রবল অসম্মানে তাঁরা ফুঁৎকারে উড়িয়ে দেবেন সমস্ত ‘গুজব’। কিন্তু খাস কলকাতার হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সরণীর এই রেস্তোরাঁয় একটিবার ঢুঁ দিলে আপনিও নিশ্চিতভাবে তাঁদের উদ্দেশে বলে উঠবেন: ‘চুপ কর অবিশ্বাসী! কথা কোয়ো না।’ এর কারণ ঝাঁ-চকচকে খাবারের ঠেকটির দেয়ালে টাঙানো বিলবোর্ড, ফেস্টুন থেকে শুরু করে টেবিলক্লথ, আলমারি, মেনুকার্ড, দরজার পাল্লা—সবকিছু টিনটিন ও তার অনুচর-সহচরদের ছবিতে ভরা। ম্যুরাল থেকে স্কেচ, গ্রাফিতি থেকে হাতে-আঁকা-নকশা… ‘টিনটিন অ্যান্ড দ্য ব্রাসেলস ক্লাবে’র আনাচে-কানাচে মনে করাবে—এই ছদ্ম-শীতের আলোয়ানে মোড়া কলকাতা শহর ছেড়ে আপনি পাড়ি দিয়েছেন কঙ্গো, তিব্বত, মিশর… হয়ে চন্দ্রলোক! তারপর আলমারি থেকে ‘কাঁকড়া রহস্য’ নামিয়ে পড়তে পড়তে যখন ক্যারামেলে লেপ্টে থাকা ওয়াফেলে অন্যমনস্ক ছুরি চালাবেন, তখন আপনা থেকে আপনার মুখে শোনা যেতে পারে: ‘টিনটিন কি সত্যি এখানে কখনও খেতে আসেনি?’
লেক টেরেসের এই নতুন ঠিকানায় ‘টিনটিন অ্যান্ড দ্য ব্রাসেলস ক্লাব’ ল্যান্ড করেছে বছর তিনেক আগে। আগের আস্তানা ছিল হিন্দুস্থান পার্কে। কোভিড-পর্বে কিছুদিন বন্ধ থাকার পর পুরোনো উদ্যমে টিনটিন, ক্যালকুলাস, হ্যাডকদের দিয়ে মঞ্চ বেঁধেছেন কর্ণধার বর্ণালী সেনশর্মা ঘোষ। যদিও সেই সজ্জার আদ্যোপান্ত জুড়ে কেবলই ব্রাসেলসের বীর কিশোরটি নেই। আছেন নীরেন্দ্রনাথ। আছেন সত্যজিৎ রায়ও৷ কেন? কোন যুক্তিতে সত্যজিতের ম্যুরাল শোভা পাচ্ছে রেস্তোরাঁর দেয়ালে? বর্ণালীর জবাব—‘বাংলায় টিনটিন-আন্দোলনের পুরোধা যে দুজন, তাঁদের ভুলি কী করে? এমন কথা তো বেশ জোরালোভাবেই শোনা যায় যে, আনন্দমেলা কর্তৃপক্ষকে টিনটিন অনুবাদের পরামর্শ জুগিয়েছিলেন গুপি গাইন-বাঘা বাইনের স্রষ্টা! আর তর্জমার সেই দুরূহ কাজটি অবলীলায় সেরে ফেলেছিলেন যিনি, তাঁর নাম নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। ফলে এঁদের বাদ দিয়ে এ দেশে টিনটিন নিয়ে কখনও কিছু হতে পারে নাকি?’
এই গোছানো উত্তরেই মালুম হয়, থিমপ্রধান ক্যাফের পরিচালিকা বর্ণালী দেবী স্রেফ শৌখিন টিনটিনভক্ত নন। তিনি স্বধর্মে স্থিত, স্বীয় সংস্কৃতিতে আস্থাবান। কিন্তু তাই বলে কোনও গোঁড়ামিকে প্রশ্রয় দিতেও নারাজ। ক্যাফের ওয়ালপেপারে দুটো ‘বি’-কে একত্রে গেঁথেছেন বর্ণালী। যা এক লহমায় চোখ টানে। কী এর কারণ? বর্ণালী জানান—‘ব্রাসেলস আর বেঙ্গল… দুটো জায়গাকে জুড়তে চেয়েছিলাম। কলকাতা আর ব্রাসেলসের স্কাইলাইন এক হয়ে যাক, ঘুচে যাক ভূগোলের দূরত্ব—আজ বলে নয়, বরাবর চেয়ে এসেছি আমি। আসলে হৃদয়ের নিবিড়তায় দুটো শহরই একে অন্যের খুব কাছের। তাই বাংলায় টিনটিন চর্চা থেমে নেই। কিন্তু আমাদের কাজ যেহেতু খাওয়াদাওয়া নিয়ে, তাই ভেটকির পদে টিনটিনকে মিলিয়ে দিতে চেয়েছি।’
মেলাতে চেয়েছেন বটে। পেরেছেন কতটা? মেনুকার্ডে চোখ বোলাতে গিয়েই নজরে এল রংচঙে নাম: হ্যাডক স্পেশাল প্রন টার্ট, ক্যালকুলাস স্পেশাল অরেঞ্জ জিঞ্জার ফিশ, থমসন অ্যান্ড থম্পসন পমিগ্রানেট পর্ক এবং ভেটকি সিগার রোল (অনুষঙ্গ: ‘ফ্যারাওয়ের চুরুট’)। ঠিক যেমনটা থিম-মুখ্য রেস্তোরাঁ থেকে প্রত্যাশিত। পেয়ালাপিরিচ, কফি মাগ, দেয়ালবাতির কোনওটা ‘ক্যালকুলাসের কাণ্ড’, কোনওটা-বা ‘লোহিত সাগরের হাঙরে'র দুর্ধর্ষ মুহূর্তকে ধরে রেখেছে। খাবার আসতে কিঞ্চিৎ দেরি হলেও অসুবিধে নেই। বিনোদন জোগাবে টিনটিনের গল্পমালার ক্যুইজ কিংবা পাজল।
তবে নিছক চোখে তাক লাগানোয় নয়, জিভে জল আনাতেও ষোলো আনা পরিশ্রম ও পরীক্ষানিরীক্ষা করে চলেছে রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষ। তাই সাবেক মেনুকার্ডে যুক্ত হয়েছে সসেজ স্টাফড চিকেন গ্র্যান্ড রোল, ছোট চিংড়ি ও নানাবিধ মরশুমি সবজিতে সাজানো ভেটকি রোল কিংবা হ্যাম, স্টেক ও পিৎজার রকমারি আইটেম।
খানছয়েক টেবিল। টিনটিনের বিভিন্ন অ্যাডভেঞ্চারের সফট টয়ে সজ্জিত। দেয়াল-আলমারিতে উঁকি দিচ্ছে কমিক্স। এক কোণে রাখা গ্র্যান্ড পিয়ানো। মেরেকেটে ১৮ থেকে ২০ জন রেস্তোরাঁয় বসতে পারবেন। টেক অ্যাওয়েরও ব্যবস্থা রয়েছে। লেক টেরেস চত্বরের আশপাশে যাঁরা থাকেন, তাঁরা দোকানে কল করে (ফোন নম্বর: ৭৬৪৭৯৮৬০০১) অর্ডার দিতে পারে। বাকিদের জন্য স্যুইগি, জোম্যাটোর অপশন তো রয়েইছে।
তবে পেটের খিদের সঙ্গে মনের আশ মেটাতে চাইলে, আমরা বলব, ডাইন ইন-ই বেস্ট অপশন। কী বললেন? খাবার সার্ভ করতে দেরি হলে আপনার মাথা ধরে? বিরক্তি জাগে? তাহলে চেয়ারে বসে একটু কষ্ট করে চোখ দুটো উপরে তুললেই দেখতে পাবেন ক্যাপ্টেন হ্যাডক ভুরু কুঁচকে আপনাকেই দেখছেন আর বিড়বিড় করে রাগতস্বরে বলে চলেছেন: ‘If eat good you must, Patience you need first.’