
শেষ আপডেট: 15 November 2023 12:01
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শীতের রাতে সামান্য ছেঁড়া কাপড়টা গায়ে জড়িয়ে কুঁকড়ে শুয়ে ছিলেন নমিতা। ফুটপাতে পাতলা চাদরেই রাত কাটে তাঁর। মাথার উপর খোলা আকাশ। আঁধার রাতে কুকুরের ডাক ছাড়া আর কোনও আওয়াজই কানে যায় না নমিতার। সেখানে ‘দিদি, ও দিদি’ ডাকে ধড়মড় করে উঠে বসে অবাকই হয়ে যান বৃদ্ধা। সামান্য জলটুকুও যেখানে কেউ যেচে পড়ে সাধতে আসে না, সেখানে একজন যুবক হাসি মুখে দিদি ডেকে ভাইফোঁটা চাইছে! এ কেমন ভাই, আর কীসেরই বা ফোঁটা? অবাক হয়েই শুধোন নমিতা।
এই ভাইকে চেনেন অনেকেই। কলকাতা পুলিশের কর্মী বাপন দাস। সদা হাস্যরত যুবক কারওর অসুবিধার কথা শুনলেই বাইক ছুটিয়ে চলে যান। করোনার সময়েই তাঁকেই দেখা গিয়েছিল অসুস্থ রোগীদের বাইকে চাপিয়ে হাসপাতালে পৌঁছে দিতে। রাস্তায় পড়ে থাকা মা-বোনেদের জন্য পরিত্রাতা হয়েও বহুবার দেখা দিয়েছেন বাপন। হারানো মায়ের সঙ্গে ছেলের মিল করিয়ে দিয়েছেন। কলকাতা পুলিশের এই কর্মীর জনসেবার কথা লোকের মুখে মুখে ফেরে।
সব হারিয়ে ফুটপাথেই যাঁদের জীবন, তাঁদেরও তো সাধ জাগে। সেই ইচ্ছাই নিঃস্বার্থভাবে পূরণ করলেন বাপন। রাস্তায় ঘুরে ঘুরে নমিতা, কাজল, সুজাতা দিদিদের থেকে ফোঁটা নিলেন। তাঁদের মিষ্টি মুখ করিয়ে নতুন শাড়ি উপহারও দিলেন। মিষ্টি খেয়ে আর শাড়ি পেয়ে এই দিদিদের আনন্দ আর ধরে না। প্রাণ ভরে আশীর্বাদ করলেন বাপনকে।
বয়স হয়েছে সুজাতা দিদির। ঘুম ভাঙাতেই অবাক মুখে বাপনকে দেখে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলেন। সামান্য খাবার জোটাতে যাঁকে হাতেপায়ে ধরতে হয়, সেখানে কেউ নিজে এসে ফোঁটা চাইছে? এ কেমন ভাই, কোথা থেকে এল? ফুটপাথই যাঁর সংসার, তাঁর কাছে ভাইফোঁটা বা দীপাবলির আনন্দ অলীক কল্পনামাত্র। স্বপ্ন দেখাও সেখানেও বিলাসিতা। ভাবনাটা দু'মুঠো খাওয়া আর মাথা গোঁজার আশ্রয়েই সীমাবন্ধ। চিন্তাভাবনার সেই ছোট্ট পরিসরে আচমকা কোনও অনাগত এসে যদি সব ওলটপালট করে দেয় তাহলে অবাক হওয়া ছাড়া আর গতি কী! শূন্য দৃষ্টি নিয়ে তাই নমিতা, সুজাতাদের বুঝতে সময় লাগে কেউ সত্যিই এসেছে ভাই হয়ে ফোঁটা নিতে।
সাদা চন্দন নেই তো কী হয়েছে, কালো ফোঁটাই কপাল আলো করল পুলিশ কর্মী বাপন দাসের। তিনবার ফোঁটা দিয়ে দিদিদের মিষ্টি খাইয়ে উপহারও দিলেন। আবার আসবেন বলে কথাও দিলেন। এই দিদিরা কিন্তু জানে না বাপন দাস কে। এমন ভাইকে পেয়ে তাঁরা এমনিই আপ্লুত, পরিচয়ের সেখানে প্রয়োজন নেই। মনটাই আসল পরিচয়।
উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়িতে বিধাননগরে বাড়ি বাপনের। ২০০০ সালে কলকাতা পুলিশের সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দেন। ২০১৪ সাল থেকে তিনি সৌগত রায়ের নিরাপত্তার দায়িত্বেই রয়েছেন। দু'তিন দিনের ছুটি পেলে উত্তরবঙ্গেও চলে যান তিনি। কখনও উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ, ডুয়ার্সের মালবাজার হাসপাতাল দার্জিলিঙ, নকশালবাড়ি ব্লক, ইসলামপুর, চোপড়াতে ব্লক হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে তিনি দুঃস্থ রোগীদের পরিবারের পাশে দাঁড়ান। করোনার সময়েও গ্রামে ঘুরে ঘুরে অনেক অসুস্থ, নিঃসহায় মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছেন। সচেতনতার পাঠও দিয়েছেন। পুলিশের দায়িত্ব, কর্তব্য সামলানোর পাশাপাশি মানবিকতার দায়িত্বও সামলাচ্ছেন বাপন দাস।