
চিকিৎসকদের সঙ্গে রিঙ্কু মাঝি।
শেষ আপডেট: 26 March 2025 18:15
এ যেন এক ফিনিক্স পাখির কাহিনি। যে কাহিনি শুরু হয়েছিল ১৯৯৫ সালে। ‘লিখতে’ শুরু করেছিলেন, হৃদরোগের প্রবাদপ্রতিম চিকিৎসক, ডক্টর দেবী শেঠি। প্রেসক্রিপশনের আকারে। যাতে লেখা ছিল, ব্যারাকপুরের ছোট্ট মেয়ে রিঙ্কু মাঝির ‘হৃদয়ের’ কথা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, ‘টেট্রালজি অফ ফ্যালট’। সহজ করে বুঝিয়ে বললে, হার্টে জন্মগতভাবে চার রকম অস্বাভাবিকত্ব।
এর পরে একাধিকবার অস্ত্রোপচারের লড়াই, যে লড়াইয়ে জীবন-মৃত্যু বারবার ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা খেলেছে রিঙ্কুকে ঘিরে ঘিরে। এ খেলার মাঝেই রিঙ্কুর জীবন এগিয়েছে নিয়ম মেনে। পড়াশোনা করে তিনি বড় হয়েছেন, নার্সিং ট্রেনিং নিয়েছেন, বিয়ে হয়েছে, সন্তানও হয়েছে।
কিন্তু এর পরে ৩২ বছরে এসে দুয়ারে কড়া নেড়েছে সাক্ষাৎ মৃত্যু। জীবনদেবতা একরকম জানিয়েই দিয়েছেন, খেলা শেষ! ঠিক এই জায়গা থেকেই খেলা ঘুরিয়ে দিল কলকাতার মেডিকা সুপারস্পেশালিটি হাসপাতাল। বলা ভাল, চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিল তারা। নেতৃত্ব দিলেন, হাসপাতালের ক্যাথ ল্যাবের ডিরেক্টর, ডক্টর দিলীপ কুমার।
৩২ বছর বয়সি রিঙ্কুর শরীরে লিডলেস পেসমেকার ইমপ্ল্যান্ট করা হয়েছে, যিনি জন্মগত জটিল হৃদরোগ Tetralogy of Fallot (TOF)-এ আক্রান্ত। তাঁর শারীরিক গঠন এমন ছিল, যে প্রথম পেসমেকারের ব্যাটারি শেষ হওয়ার পরে, দ্বিতীয়বার সাধারণ পেসমেকার বসানো সম্ভব হচ্ছিল না। দরকার ছিল অত্যাধুনিক লিডলেস পেসমেকারের। কিন্তু এমন জটিল পরিস্থিতি দেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানে আগে ঘটেনি। বিশ্বে ঘটেছে মোটে দু-তিনটে।
এমনই এক চ্যালেঞ্জ হাতে নেন ডক্টর দিলীপ কুমার ও তাঁর টিম। শুধু তাই নয়, অস্ত্রোপচারের টাকা পরিবারের পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব ছিল না বলে, সে বিষয়েও দায়িত্ব নেন তিনি নিজেই। মনিপাল ফাউন্ডেশনের সিএসআর তহবিল থেকে শুরু করে আরও নানা জায়গা থেকে তোলা হয় চিকিৎসার অর্থ। ডাক্তারবাবুরা বাদ দেন তাঁদের ফিজ, পেসমেকারটিও সরবরাহ করা হয় ন্যূনতম দামে।
শেষমেশ প্রযুক্তি, দক্ষতা ও মানবিকতার মেলবন্ধনে, মার্চ মাসের গোড়ায় সফলভাবে সম্পন্ন হয় ঘণ্টা দেড়েকের এই অস্ত্রোপচার। রিঙ্কু এখন ভাল আছেন, সুস্থ আছেন, দু’বছরের ছোট্ট ছেলের সঙ্গে সুন্দর সময় কাটাচ্ছেন। তাঁর এই বিরল সুস্থতা যে ভবিষ্যতের বহু জটিল হৃদরোগীর জন্য নতুন আশার আলো দেখাবে, সে কথা বলাই বাহুল্য।
ব্যারাকপুরের বাসিন্দা রিঙ্কু জন্মের পর থেকেই হৃদরোগে ভুগছিলেন। জন্মগতভাবে ফুসফুসে ঠিকমতো রক্ত প্রবাহিত হত না, তাই ছোটবেলাতেই তাঁর ইন্ট্রাকার্ডিয়াক রিপেয়ার ও গ্লেন শান্ট অস্ত্রোপচার করানো হয়। পরে ফের তাঁর পেসমেকার বসানো হয়। তবে পরবর্তী কালে সেই এপিকার্ডিয়াল পেসিং লিড বিকল হয়ে যায়, যার ফলে তাঁর হার্ট ঠিকভাবে স্পন্দন করছিল না।
২০২৪ সালে তাঁর পেসমেকার পুরোপুরি কাজ করা বন্ধ করে দেয়, ফলে তিনি একটি অস্থায়ী পেসমেকারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। কিন্তু প্রচলিত ট্রান্সভেনাস পেসমেকার বসানোর সুযোগ তাঁর ক্ষেত্রে ছিল না, কারণ তাঁর হৃদযন্ত্রের গঠনই ছিল ব্যতিক্রমী।
এই অবস্থায় একমাত্র বিকল্প ছিল লিডলেস পেসমেকার, যা সরাসরি হৃদপিণ্ডে বসানো যায় এবং এর জন্য কোনও তার প্রয়োজন হয় না। সেই ঝুঁকিই নেন সিনিয়র কার্ডিওলজিস্ট ডক্টর দিলীপ কুমার। তাঁর সঙ্গে ছিলেন পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজির প্রধান ডক্টর অনিল কুমার সিংহী, কার্ডিয়াক অ্যানাস্থেসিওলজিস্ট ডক্টর সোমনাথ দে, ঢাকুরিয়া মনিপাল হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের ডিরেক্টর ডক্টর প্রকাশ কুমার হাজরা।
ডক্টর দিলীপ কুমার এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘গ্লেন শান্ট করা কোনও রোগীর শরীরে লিডলেস পেসমেকার বসানোর ঘটনা আগে কখনও হয়নি দেশে। এটি বিশ্বেও মাত্র ২-৩বার হয়েছে। ফলে রিঙ্কুর এই ঘটনা চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য ঐতিহাসিক।’
রিঙ্কুর কথায়, ‘আমি প্রায় আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমার চিকিৎসা আর সম্ভব হবে না। কিন্তু ডক্টর দিলীপ কুমার ও তাঁর দল অসম্ভবকে সম্ভব করল। সবার সাহায্যে আমি আবার সুস্থ হয়ে উঠেছি। এখন আমি আমার ছোট সন্তানের কাছে ফিরতে পারব, এটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া।’
মণিপাল হাসপাতালের তরফে বলা হয়েছে, ‘আমরা বিশ্বাস করি, অর্থের জন্য কারও জীবন বিপন্ন হওয়া উচিত নয়। আমরা পূর্ব ভারতে উন্নত চিকিৎসা পৌঁছে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের চিকিৎসকদের দক্ষতা এবং সকলের এগিয়ে আসার কারণেই এই অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে।’