
পহেলগামে সৌরভ ও মণীষা।
শেষ আপডেট: 23 April 2025 13:08
শ্রীনগরে তখন একদিকে শঙ্করাচার্য মন্দিরে ঘণ্টা বাজছে। অন্যদিকে ধীরে ধীরে সূর্য পশ্চিমে হেলছে। হালকা হাওয়ায় ডাল লেকের জল শিকারা দুলে দুলে এগিয়ে চলেছে। কখনও মিশন কাশ্মীরের হাউস বোট দেখাচ্ছেন শিকারার মাঝি, কখনও আবার কীভাবে জলেও সবজি চাষ হয়, বুঝিয়ে দিচ্ছেন হাতেগরমে প্রমাণ দিয়ে। সে এক অদ্ভুত মুগ্ধতা। বামদিকে বরফে ঢাকা পাহাড়ের শৃঙ্গকে রেখে যখন শিকারা রাইড শেষ হল, তখন মনে হচ্ছিল অপূর্ব।
কিন্তু তার পরেই যা শুনলাম, থরথর করে কেঁপে ওঠে সারা শরীর (Kashmir Terror Attack)। মনে হয় কয়েক হাজার ভোল্টের বিদ্যুত খেলে গেছে। ঠিক যেখানে গতকাল, সোমবার আমরা ছিলাম, পহেলগামে (Pahalgam) সেখানেই নাকি জঙ্গি হামলা হয়েছে। ওই বৈসরন ভ্যালিতেই আমরাও ছিলাম আগের দিন, আনন্দ করে ঘুরছিলাম। মঙ্গলবার সেখানেই পর্যটকদের শরীর ঝাঁঝরা হয়ে গেছে গুলিতে! বেছে বেছে নাকি পর্যটকদেরই খুন করা হয়েছে, সংখ্যাটা ২৬!
মুহূর্তে মধ্যে বদলে গেল শ্রীনগরের চিত্রটাও। ঝিলমের ধার থেকে চলে যেতে শুরু করলেন ফেরিওয়ালারা। সেনায় ছেয়ে গেল গোটা এলাকা। ঝাঁপ বন্ধ হল দোকানের।
বর্তমানে আমরা শ্রীনগরেই আছি। গতকাল মানে মঙ্গলবারই শ্রীনগর ঢুকেছি। ভাগ্যিস, একটা দিন আগেই বেরিয়ে এসেছি। নাহলে কী হত! এটা ভেবেই বুক কাঁপছে। বৈসরনে ঠিক দুপুরের দিকেই গেছিলাম আমরা আগেরদিন। চেটেপুটে বৈসরনের সৌন্দর্য উপভোগ করেছি। বুঝিনি ওখানে সেসময় লুকিয়ে ছিল জঙ্গিরা। ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি কিচ্ছুটি। কারও হাবভাবেও এতটুকু অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়নি। কীভাবে বুঝব কেউ আক্রমণ করতে পারে! স্ত্রী মণীষা ও ঘুরতে আসা বাকি সদস্যদের সঙ্গে এখন সেই কথাই বলে চলেছি অনর্গল।
হুগলির কোন্নগর থেকে এসেছি আমরা কাশ্মীর। আরও বাঙালি পর্যটকরা সঙ্গে আছেন। আপাতত আছি শ্রীনগরের হোটেলে। থমথমে চারিদিক। কী যে অনুভূতি হচ্ছে বলে বোঝানো সম্ভব নয়। তাড়া করে বেড়াচ্ছে বৈসরনের পাইন বন, রাস্তাঘাট। চোখে ভাসছে সেসব দৃশ্য। আর বারবার ধন্যবাদ জানাচ্ছি নিজেদের ভাগ্যকে। ভাগ্যিস আর একটা দিন আগে এমন হয়নি।
তবে শ্রীনগরে থাকলেও নিজেদের নিরাপদ মনে হচ্ছে না। চারিদিকে শুধু ভয় আর অবিশ্বাস। হোটেল থেকে বের হতে পারছি না। লোকাল লোকজনকেও আর বিশ্বাস করতে পারছি না। ওঁরা আশ্বাস দিচ্ছেন, ভরসা জোগাচ্ছেন, অনেকে নিন্দাও করছেন এই ঘটনার, কিন্তু গতকালের পর বিশ্বাস করাও যেন খুব মুশকিল! বুঝতেই পারছেন... বিশ্বাস জন্মাচ্ছে না মনে আর। ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে সকলের মনে।
কাশ্মীরে যেদিন থেকে ৩৭০ ধারা বিলোপ হয়েছে, সেই থেকেই অনেকের কাছে খোঁজখবর নিয়েছি। যাঁরা ঘুরে গেছেন তাঁদের থেকে জেনেছি। কেমন অভিজ্ঞতা, কেমন আছে কাশ্মীর, সবটা জেনেই এখানে আসার পরিকল্পনা করেছিলাম। মনে হয়েছিল, কাশ্মীর এখন অনেক শান্ত, কাশ্মীরে বেড়ানো এখন নিরাপদ।
এই আমাদের সঙ্গেই যে এমন হবে, স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। আর কোনওদিন কাশ্মীর আসব না আমি বা আমার স্ত্রী। ভাবনাচিন্তা করারও কোনও প্রশ্ন উঠছে না। কখন কী হয়ে যাবে কিছু বলা যায়?
আপাতত ট্রাভেল এজেন্ট যিনি আছেন, তিনি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। ফেরানোর প্ল্যানিংও করছেন। সব ঠিক থাকলে আগামীকাল ভোরের মধ্যে হয়তো এখান থেকে ফিরেও যাব আমরা। কিন্তু এই ভয়াবহ স্মৃতি চিরজীবন মনে গেঁথে থাকবে। আতঙ্কও থেকে যাবে মাথায়।
(লেখক ৩৪ বছর বয়সি বেসরকারি কর্মী, কোন্নগরের বাসিন্দা, এই মুহূর্তে কাশ্মীরে রয়েছেন)