Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরগরমে মেজাজ হারালেন কর্মীরা! চুঁচুড়ায় নিজের দলের লোকেদেরই বিক্ষোভের মুখে দেবাংশুবার্নল-বোরোলিন বিতর্ক, ‘লুম্পেনদের’ হুঁশিয়ারি দিয়ে বিপাকে ডিইও, কমিশনকে কড়া চিঠি ডেরেক ও’ব্রায়েনেরভাঁড়ে মা ভবানী! ঘটা করে বৈঠক ডেকে সেরেনা হোটেলের বিলই মেটাতে পারল না 'শান্তি দূত' পাকিস্তান

শিক্ষা-বিপ্লবের ২৫ বছর! রজতজয়ন্তীর দোরগোড়ায় ফিরে দেখা মানুষ গড়ার কারিগর হেরিটেজের যাত্রা

কলকাতার প্রান্তে ২০০১ সালে শুরু হয়েছিল এক শিক্ষাবিপ্লব— দ্য হেরিটেজ স্কুল। আজ ২৫ বছরে পা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি প্রমাণ করেছে, মানুষ গড়াই প্রকৃত শিক্ষা।

শিক্ষা-বিপ্লবের ২৫ বছর! রজতজয়ন্তীর দোরগোড়ায় ফিরে দেখা মানুষ গড়ার কারিগর হেরিটেজের যাত্রা

প্রদীপ আগরওয়াল।

শেষ আপডেট: 23 June 2025 21:06

গার্গী দাস

কলকাতার প্রান্তে, যেখানে এক সময়ে ছিল শুধু ধানখেত আর মেঠো পথ— সেখানেই মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে এমন এক প্রতিষ্ঠান, যার মূল লক্ষ্য শুধু পড়ানো নয়, মানুষ গড়া। দ্য হেরিটেজ স্কুলের নাম শুধু শহর নয়, এখন দেশজুড়ে পরিচিত। কিন্তু গল্পটা শুরু হয়েছিল একেবারে অন্য রকমভাবে।

কীরকম ছিল সেই যাত্রা? কথায় বলে, ‘টাইম ফ্লাইজ’। এরই মধ্যে প্রায় সিকি শতাব্দী পথ পেরিয়ে এসেছে দ্য হেরিটেজ স্কুল। রজত জয়ন্তী বছরে পৌঁছে ফিরে দেখা যাক সেই যাত্রাটাকেই।

কথা হচ্ছিল কল্যাণ ভারতী ট্রাস্টের চিফ এগজিকিউটিভ অফিসার শ্রী প্রদীপ আগরওয়ালের সঙ্গে। প্রদীপবাবু জানান, “স্বপ্ন দেখাটা শুরু হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। আর সেই স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন, কল্যাণ ভারতী ট্রাস্টের ২২ জন সদস্য। যাঁদের বিশ্বাস ও সঙ্কল্প ছিল, মানুষ গড়বেন তাঁরা.” প্রদীপবাবুর কথায়, “বিদ্যুৎ, জল ও রাস্তাহীন কলকাতার উপকণ্ঠের এক প্রান্তিক অঞ্চলে একটা স্কুলের যাত্রা শুরু করাটাই ছিল সাহসী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ। এখন তা দেশের অন্যতম মানবকেন্দ্রিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছে”।

প্রথম বড় প্রশ্ন ছিল— কেন কলকাতা? কেন হায়দরাবাদ বা বেঙ্গালুরু নয়?
প্রদীপ আগরওয়াল বলেন, “সেঞ্চুরি প্লাই, বিক্রম ইন্ডিয়া, পাহাড়পুর কুলিং টাওয়ার, রূপা অ্যান্ড কোং—এই সব সংস্থা কলকাতা থেকেই ব্যবসা শুরু করেছিল। তাই এই শহরকে কিছু ফিরিয়ে দেওয়া আমাদের কর্তব্য বলেই মনে হয়েছিল। সেই সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই জন্ম নিয়েছিল দ্য হেরিটেজ স্কুল”।

কসবার কিছু দূরে আনন্দপুরে তখন রাস্তাঘাট বলতে সেরকম কিছু ছিল না। নাগরিক পরিকাঠামো ও পরিষেবাও ছিল অপ্রতুল। তাই নির্মাণের জল আনতে হয়েছিল ট্যাঙ্কারে করে, স্থানীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিকমতো না থাকায় জেনারেটরের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। আর যোগাযোগের জন্য অনুমতি নেওয়া হয়েছিল ওয়াকিটকির।

প্রদীপবাবু জানান, “রাস্তা তৈরির কাজেও বাধা ছিল। স্থানীয় মানুষ ভয় পাচ্ছিলেন—বড় কোনও প্রতিষ্ঠান তাঁদের এলাকা দখল করে নেবে না তো? বহু বোঝানোর পরে, ধীরে ধীরে তৈরি হল পারস্পরিক বিশ্বাস। শুরু হল নির্মাণ। মাত্র ছয় মাসের মধ্যে স্কুলের কাজ সম্পূর্ণ হল।”

২০০১ সালের ২৫ জুন, ৪১৯ জন শিশু নিয়ে পথ চলা শুরু করেছিল দ্য হেরিটেজ স্কুল। প্রথমে ছিল ক্লাস ওয়ান থেকে ফাইভ। তবে শুরু থেকেই লক্ষ্য ছিল সুদূরপ্রসারী। কল্যাণ ভারতী ট্রাস্টের সদস্যরা মনে করতেন, ‘শুধু স্কুল তৈরিই হবে না, আসলে এটা হবে সভ্যতা গড়ে তোলার প্রকল্প’।  

পূর্ব ভারতে প্রথমবারের মতো হেরিটেজ নিয়ে আসে ‘ডে বোর্ডিং’ মডেল। প্রদীপ আগরওয়ালের কথায়, “ছেলেমেয়েরা স্কুল থেকে ফিরে কোথাও নাচ শেখে, কোথাও ছবি আঁকে, কোথাও প্রাইভেট টিউশন নেয়—এভাবে অনেক সময়, শক্তি নষ্ট হয়। আমরা ভাবলাম, কীভাবে সব কিছু এক ছাদের তলায় দেওয়া যায়। খাওয়া, শেখা, বিশ্রাম—সবকিছু পরিকল্পিতভাবে।”

হেরিটেজ কখনওই তথাকথিত বোর্ডিং স্কুল হয়ে ওঠেনি, কারণ দর্শন ছিল পরিষ্কার। শিশুকে তার মা-বাবার থেকে আলাদা করা যাবে না। দিনের শেষে পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পেতেই হবে। কারণ সময় ক্ষণস্থায়ী, আর শৈশবের স্মৃতি গড়ার ক্ষেত্রে পরিবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকা পারিবারিক মূল্যবোধ, স্নেহ, ভালবাসা নিয়ে বড় হয়ে ওঠাও খুব জরুরি।  

মানবিক ও সর্বাঙ্গীন শিক্ষা দেওয়ার এই ভাবনা যে ফলদায়ী হয়েছে তা প্রমাণ করে দেখিয়েছে দ্য হেরিটেজ স্কুল। হেরিটেজের প্রাক্তনীরা গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে রয়েছেন। আইআইটি বম্বে, ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, অক্সফোর্ড, লাক্সেমবার্গ থেকে শুরু করে গুগল, মাইক্রোসফ্ট, অ্যামাজনের মতো সংস্থায় কাজ করছেন তাঁরা। কেউ বা গবেষণা করছেন, কেউ শিক্ষাদান করছেন, কেউ নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

প্রদীপবাবু বলেন, “হেরিটেজ কখনও বিজ্ঞাপন দেয়নি। ভাল কিছু করলে মানুষ এমনিই আসবে—এই আত্মবিশ্বাস নিয়েই বিনিয়োগ করা হয়েছে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, উন্নত ল্যাব, আধুনিক শিক্ষা পরিকাঠামো নির্মাণে”।

তাঁর কথায়, দ্য হেরিটেজ স্কুলের পঠনপাঠনের ক্ষেত্রে আমরা খুব যত্নশীলভাবে একটা ধারা তৈরি করেছি। পরিবেশ, প্রযুক্তি ও মানবিকতাকে এক সুতোয় বেঁধে এমনভাবে ছেলেমেয়েদের গড়ে তোলা হচ্ছে যা তাদের শুধু পুঁথিগত পাঠ দেয় না, দায়িত্বশীল করে তোলে। জল অপচয়, বিদ্যুৎ অপচয় বন্ধে শিশুদের সচেতন করা হয় প্রথম দিন থেকেই। শিশুদের পরিবেশ সম্পর্কেও সচেতন করা হয়। পূর্ব ভারতের প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে এখানে তৈরি করা হয়েছে সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট, যা উদ্বোধন করেছেন জার্মান মন্ত্রকের সদস্য।

এরই সমান্তরালে গবেষণায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের উৎসাহ দেওয়া হয়েছে গবেষণার জন্য। প্রতিষ্ঠানের গবেষণাগারে তৈরি হয়েছে গ্লাস সোলার সেল, যা নিয়ে চলছে আন্তর্জাতিক গবেষণা। কোভিডের সময় ওরাল ভ্যাকসিন থেকে শুরু করে পারকিনসনের রোগীদের জন্য সেন্সর-চালিত চামচ, ডায়াবেটিস ও লিভার ক্যানসার নিয়েও চলছে গবেষণা। এই সব উদ্ভাবনের জন্য মিলেছে ভারতীয় অন্তরীক্ষ হ্যাকাথন (Bharatiya Antariksh Hackathon), গান্ধিয়ান ইয়ং টেকনোলজিকাল ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড (Gandhian Young Technological Innovation Award), এবং এইচপি গ্লোবাল ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড (HP Global Innovation Award)।

তা ছাড়া দ্য হেরিটেজ স্কুলের পাঠক্রমে রয়েছে যোগ, সঙ্গীত, আঁকা, নাটক, নাচ, সাইবার সিকিউরিটি থেকে শুরু করে ব্যক্তিত্ব গঠনের পাঠ।

এভাবেই পঁচিশে পা দিয়েছে দ্য হেরিটেজ স্কুল। প্রদীপবাবু বলেন, “এই সাফল্য শুধুমাত্র পরিসংখ্যানের নয়, এটি একটি স্বপ্নের জয়। একটি দর্শনের জয়। আগামীতে আরও গভীরভাবে মানুষ গড়ার সংকল্প নিয়ে এগোবে দ্য হেরিটেজ স্কুল।” তাঁর কথায়, “আমরা প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করি না। আমরা বিশ্বাস করি, শিক্ষার আসল রূপ হল নীরবে পরিবর্তন। মানুষ তৈরি হলে, সমাজ নিজে থেকেই পাল্টাবে। আমরা সেই মানুষ গড়ার কাজটাই নিঃশব্দে, নিষ্ঠার সঙ্গে চালিয়ে যাব। স্বামী বিবেকানন্দ দেখানো পথেই আমাদের এই যাত্রা চলবে।”


```