
ব্রাত্য বসু। ছবি: সৌম্যদীপ সেন
শেষ আপডেট: 2 March 2025 22:23
শনিবার তৃণমূলপন্থী অধ্যাপকদের সংগঠন ওয়েবকুপার (WBCUPA) বৈঠক সেরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় (Jadavpur University) থেকে বেরোচ্ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু (Bratya Basu)। তার পরপরই ক্যাম্পাসে দফায় দফায় ছাত্রবিক্ষোভ, হাতাহাতি, অশান্তি গিয়ে পৌঁছয় মর্মান্তিক ঘটনায়। অধ্যাপকরা যেমন আহত হন, তেমনই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্র গুরুতর জখম হয়ে এই মুহূর্তে হাপাতালে ভর্তি। ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গিয়েছে। ক্যাম্পাস চত্বর এখনও থমথমে। আর শিক্ষামন্ত্রী? যথেষ্ট 'শকড'। আতঙ্ক কি কেটেছে মন্ত্রীর (Education Minister)? খোঁজ নিতে সময় নষ্ট করেনি দ্য ওয়াল (The Wall Exclusive)।
সাক্ষাৎকারটি দেখুন
ব্রাত্য জানালেন, "আতঙ্ক আমার হয়নি, গোটা ঘটনাটা ঠান্ডা মাথায় বোঝার চেষ্টা করেছি। ওই সময়টা একটু ঝাপসা হয়ে আছে আমার কাছে। মনে আছে গাড়ির কাচগুলো কিছু ছেলে-মেয়ে ঘুষি মেরে ফাটিয়ে দিচ্ছে। নিজেকে অসুস্থ লাগছিল। অস্বচ্ছন্দ বোধ করছিলাম। আর সেই জন্যেই হাসপাতালে গিয়েছিলাম। শারীরিক অবস্থা নিয়ে আর আলাদা করে বেশি কিছু বলতে চাই না।"
মূলত, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে এদিন শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুকে (Bratya Basu) ঘিরে বামপন্থী পড়ুয়ারা বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করলে মুহূর্তে অশান্ত হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর। পাল্টা আসরে নেমে ঘটনার আঁচ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয় তৃণমূলপন্থী পড়ুয়ারাও। দুই সংগঠনের মধ্যে চরম বাকবিতণ্ডা শুরু হলে শিক্ষামন্ত্রীর গাড়ির নীচে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া ইন্দ্রানুজ রায়। এখন তিনি কেপিসি হাসপাতালে ভর্তি।
ইন্দ্রানুজের আহত হওয়ার সময়ের একটি ছবি দেখানো হয় শিক্ষামন্ত্রীকে। খানিকটা গম্ভীর মুখেই মন্ত্রী জানান, "এই ছবিটা ঠিক নয়। দেখুন আমার গাড়ির সামনে ছবি-টবি কিছু নেই। আমি আমার চালককে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি বললেন ব্রেক কষা হলে ছেলেটি পাশে ছিটকে পড়ে। গাড়িটা যদি চলে তাহলে তো এরকমটা হওয়ার কথা নয়, দেখুন চারদিকটা সবাই ধরে আছে, অর্থাৎ গাড়িটা আমার দাঁড়িয়ে আছে।"
এরপরই ব্রাত্যকে একটি ভিডিও দেখানো হয়, যেখানে ছাত্রের গায়ে ধাক্কা লেগে আহত হওয়ার সময়ের ফুটেজ বিস্তারিত ধরা রয়েছে। তিনি সেই ভিডিও দেখতেই খানিকটা চটে যান। কোনও রাখঢাক না রেখেই বলেন, "খুবই খারাপ লাগছে। কিন্তু দয়া করে ওমপ্রকাশ মিশ্রকে গলা ধাক্কা দিচ্ছে, সেই ফুটেজও দেখানো উচিত নয় কি?"
দ্য ওয়াল সময় নষ্ট না করে ব্রাত্যকে সেই ভিডিও-ও দেখায়। তারপরই মুখ খোলেন মন্ত্রী। বলতে থাকেন, "অধ্যাপক পবিত্র চট্টোপাধ্যায়কে কিল, চড়, লাথি, ঘুষি মারা হচ্ছে সেই ফুটেজ দেখানো উচিত। একজন অধ্যাপিকার শাড়ি ধরে, টেনে ছিঁড়ে দেওয়া হচ্ছে সেই ফুটেজও দেখানো উচিত। আমাকে যেমন দোষারোপ করা হচ্ছে, যাঁরা এরকম অধ্যাপক-অধ্যাপিকার সঙ্গে আচরণ করলেন তাঁদের কেউ কিছু বলবে না? পবিত্র চট্টোপাধ্যায়, অধ্যাপক সোহিনী চক্রবর্তী, অধ্যাপক মনোজিৎ মণ্ডল, অধ্যাপক সৌগত পাল, এঁদের ভিডিও-ও তো মানুষকে দেখানো উচিত। যেভাবে ওঁদের নিগ্রহ করা হয়েছে তা মারাত্মক। অধ্যাপকদের মারাটা কম গুরুত্বপূর্ণ, এরকম একটা বাইনারি সেট করা হচ্ছে। তার কারণ এঁরা তৃণমূলপন্থী অধ্যাপক। তৃণমূলের অধ্যাপক হলে তো ছাত্রের হাতে মার খেতেই হবে, এটাই তো? এটাই ন্যারেটিভ? একটি ছাত্র আহত, তাঁর জন্য আমি সমবেদনা জানাই। একটা সংগঠন দেখান যারা অধ্যাপকদের মারার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে। এদের তো ন্যারেটিভই হচ্ছে শাসকদলের অধ্যাপক, অতএব মারব।"
তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ধর্মতলার মেয়ো রোডের সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন পুজোর পরেই রাজ্যের সমস্ত কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন করতে হবে। তারপরেও কেন এখনও ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ সামনে আনা হল না। এই হল মোদ্দা কথা। যার জন্য কালকের অশান্তির সূত্রপাত। কবে তাহলে তারিখ ঘোষণা হবে তাহলে?
ব্রাত্যর কথায় "অগস্ট মাসের পরই পুজোর মরশুম এসেছে। পুজোর পর উপনির্বাচন, তারপর শীতকাল, মাধ্যমিক পরীক্ষা, সামনেই উচ্চমাধ্যমিক, একটু সবুর তো করতে হবে। আর যারা নির্বাচন নির্বাচন করছে তাদের বলব, কাল যে অনুষ্ঠান ছিল, সেটা কি নির্বাচনের তারিখ বলার দিন ছিল? আমি তো কাল শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাইনি। তবু ডেপুটেশন জমা নিয়েছি, সেই ছবিও আছে। ওরা আসলে আলোচনা চাইছিল না, সন্ত্রাস করতে চেয়েছিল। আমাকে হয়তো শারীরিক ভাবে হেনস্থা করতে চেয়েছিল।"
সদ্য একটি ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল করে কেউ কেউ বলছেন, বহু আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও সোশ্যালিস্ট নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণের গাড়ির বনেটে উঠে খানিকটা একই ঢঙে প্রতিবাদ করেছিলেন, তাহলে একালে একজন মন্ত্রীর গাড়ির বনেটে উঠলে তা কেন কাম্য নয়? গা ঝাড়া দিয়ে প্রশ্নের গুরুত্ব খুঁজতে যাননি ব্রাত্য। স্পষ্ট জানিয়ে দেন, "যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে, তখন আমি ক্লাস থ্রি-ফোর হব। আমার পক্ষে রাজনৈতিক ভাবে খুব একটা ব্যাখ্যা করার জায়গাই নেই।"
গতকালই দ্য ওয়াল প্রথম খবর করেছিল ইন্দ্রানুজের পাশাপাশি আরও এক ছাত্রের পায়ের উপর দিয়ে তৃণমূল সমর্থিত অধ্যাপক ওমপ্রকাশ মিশ্রের গাড়ির চাকা চলে গিয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। সেই এসএফআই নেতার নাম অভিনব বসু। যিনি আবার সাঁকরাইল ব্লক তৃণমূলের সভাপতি অমৃত বসুর ছেলে। ঘটনার কথা মন্ত্রীর সামনে উত্থাপন করলে তিনি বলেন, "ওমপ্রকাশ মিশ্রের সঙ্গে সকালে আমার কথা হয়েছে। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন তাঁর গাড়ি কারও পায়ের ওপর দিয়ে যায়নি। এ ব্যাপারে উনিই আরও ভাল করে খোলসা করতে পারবেন।"
স্বাভাবিকভাবেই শনিবার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দফায় দফায় যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, সেই আগুনে ঘি ঢেলেছে গাড়ির তলায় পড়ে ছাত্রের আঘাত লাগার ঘটনা। ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে, শিক্ষা দুর্নীতি থেকে শুরু করে এমন ঘটনায় ব্রাত্য বসুর ভাবমূর্তিতে যথেষ্ট ধাক্কা লাগতে পারে। সে ব্যাপারে এযাবৎ কতটা সাবধানী মন্ত্রী, জানতে চাওয়া হলে চালকের দিকে দায় ঠেলেন মন্ত্রী। বলেন, "গাড়ি তো আমি চালাইনি। যে চালিয়েছে সে রীতিমতো বাচ্চা ছেলে। সে গাড়িটায় ব্রেক কষে। তাতেই ওই ছাত্র পড়ে যান। আমার মনে হয় না এতে আমার ভাবমূর্তিতে কোনওরকম আঘাত লেগেছে বলে। তার কারণ, আমি মনে করি না যাঁরা রাজনীতি করেন তাঁদের ভাবমূর্তি বলে কিছু থাকতে পারে।"
শেষে জখম ছাত্রের পরিবারের উদ্দেশে ব্রাত্য দ্য ওয়ালের মাধ্যমে বার্তা দিয়ে জানিয়ে দেন, "আমি শুনলাম ছেলেটির বাবা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তিনি এক অর্থে আমার সহকর্মীও বটে। আমি তাঁর সঙ্গে আলাদা করে ফোনে কথা বলতে পারি।' তবে এখনও তাঁর শক্ত উবাচ, বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন উশৃঙ্খলতা, নৈরাজ্য, প্রফেসরদের শারীরিকভাবে নিগ্রহ করা, লাঠি আন বলে চিৎকার-- এটাও যথেষ্ট অন্যায়।