
শেষ আপডেট: 9 October 2023 18:00
দ্য ওয়াল ব্যুরো: একজন শরীরে নারী। বাহ্যিক রূপে দেখলে অন্য কিছু ভাবা সম্ভবই নয়। তবে মননে তিনি আদ্যোপান্ত পুরুষ। স্বভাব, চলন-বলন, চাহিদা- সবই। মনে মনে সঙ্গী হিসেবে কামনা করতেন একজন নারীকেই। কিন্তু সেই ভালবাসার মানুষকেই নাকি গৃহবন্দি করে রেখেছে পরিবার। অভিযোগ, দুটি মানুষের ভালবাসাকে নিষিদ্ধ তকমা দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে তাঁর প্রিয়তমাকে। এরপরেই কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হলেন এক তরুণী। কিন্তু তারপরেও শূন্য হাতেই ফিরতে হল তাঁকে।
কলকাতা সেক্টর ৫এর বাসিন্দা অঞ্জনা (নাম পরিবর্তিত) শরীরে নারী হলেও মননে নিজেকে পুরুষ বলেই পরিচয় দেন। বর্ধমানের বাসিন্দা দীপা (নাম পরিবর্তিত) নামে এক তরুণীর সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। কিন্তু অঞ্জনা নিজেকে পুরুষ ভাবলে কিংবা তা বলেই পরিচয় দিলেও দুজনের সম্পর্ক মেনে নেয়নি দীপার পরিবার। 'নিষিদ্ধ' প্রেমের জাল থেকে মেয়েকে উদ্ধার করতে তাঁকে গৃহবন্দি করে রাখে বাড়ির লোকজন। কিন্তু তাতেও বাধ মানেনি প্রেম। সুযোগ বুঝে এক ফাঁকে অঞ্জনার সঙ্গে পালিয়ে যান দীপা। কলকাতার বাগুইআটিতে একঙ্গে দুজনে থাকতে শুরু করেন।
কিন্তু ফের ভিলেন হয় দীপার পরিবার। দীপার বাবা সুমন্ত মল্লিক (নাম পরিবর্তিত) বর্ধমান জেলা পুলিশের কাছে মেয়েকে অপহরণের অভিযোগে মামলা রুজু করেন। তাঁর অভিযোগ, অন্য এক মহিলা তাঁর মেয়েকে প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে চলে গেছে। দীপা অবসাদগ্রস্ত, বর্তমানে চিকিৎসা চলেছে বলে জানান তিনি। তিনি আরও জানান, কলকাতার কোনও একটি হোটেলে তাঁকে আটক করে রাখা হয়েছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তে নামে বর্ধমান জেলা পুলিশ। এরপর ১৬ অগস্ট কলকাতা থেকে দীপাকে উদ্ধার করে কলকাতা পুলিশ।
এদিকে পুলিশ সঙ্গীকে উদ্ধার করে নিয়ে যেতেই কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন অঞ্জনা। তিনি জানিয়েছেন, তিনি একজন সমকামী। একসঙ্গে ২২দিন বসবাসের পর পুলিশ তাঁর প্রেমিকাকে জোর করে তাঁর কাছ থেকে তুলে নিয়ে বর্ধমানের বাড়িতে নিয়ে চলে গেছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী তাদের সম্পর্ক বৈধ। সমকামী বিয়ে বৈধ না হলেও সমকামিতা বৈধ। তাই জোর করে দীপার বাবা-মা তাঁকে আটকে রাখতে পারেন না। পাশাপাশি অঞ্জনার আইনজীবী আদালতকে জানান, দীপাকে পুলিশ উদ্ধার করার পর বর্ধমান মহকুমা আদালতে তাঁর গোপন জবানবন্দি নেওয়া হলে তাতে দীপা জানিয়েছেন, তিনি অঞ্জনার সঙ্গেই থাকতে চান।
কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী ও বিচারপতি পার্থসারথি চক্রবর্তীর ডিভিশন বেঞ্চে অ্যাডিশনাল পাবলিক প্রসিকিউটর দেবব্রত চট্টোপাধ্যায় আদালতে কেস ডায়েরি জমা দিয়ে জানান, নিম্ন আদালতে দীপা দাবি করেছেন, আগে তিনি অঞ্জনার সঙ্গে থাকতেন। কিন্তু বর্তমানে তিনি নিজের ইচ্ছে মতো অন্যত্র থাকতে চান। সেই কারণে নিম্ন আদালতের নির্দেশ মতো দীপা তাঁর বাবা-মায়ের কাছে ফিরে যান। এখানে তাঁর বাবা-মা জোর করে তাকে আটক করে রাখেননি। নিজের ইচ্ছাতেই বাড়িতে ফিরে গেছেন তিনি। তাই হাইকোর্টে এই মামলা গ্রহণযোগ্যতা নেই। মামলা খারিজ করে দেওয়ার আর্জি জানান তিনি।
সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পর বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তীর ডিভিশন বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, সমকামিতা বৈধ হলেও দেশের আইন অনুযায়ী স্ত্রী বা স্বামী উভয়েই একে অপরকে ছেড়ে চলে গেলে তাঁকে ফিরে পেতে চাইলে সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী আদালত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু যেহেতু দীপা স্বেচ্ছায় নিজের বাবা মায়ের কাছে ফিরে গেছেন, তাই এ বিষয়ে আদালত হস্তক্ষেপ করবে না। সমকামী অঞ্জনার দোষ না থাকলেও এই বিষয়ে আদালতের কিছু করার নেই বলে সাফ জানিয়ে দেন বিচারপতিরা