
শেষ আপডেট: 9 May 2023 07:31
অধিকারী ভবনটা কোনদিকে? প্রশ্ন শুনে মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন বউবাজারের বাবুরাম শীল লেনের এক বাসিন্দা। বলা হল, ওই বাড়িতে একটা ঝুলন্ত পথ আছে (Kolkata Jhulan Bari)। এবার বুঝতে পেরে বললেন, 'ও ঝুলনবাড়ি, সোজা চলে যান।'
আকাশপথে যাওয়ার ব্যবস্থা এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি। বাড়ি থেকে পাশের মন্দিরে যাওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছিল ঝুলন্ত ব্রিজের মতো সুদৃশ্য ওই 'আকাশপথ'। আগে কলকাতায় এরকম কয়েকটি বাড়ি ছিল। সেগুলি সংস্কারের অভাবে হারিয়ে গিয়েছে। টিকে আছে একটিই, বউবাজারের রামকানাই অধিকারীর এই বাড়িটি।

১৫০ বছরেরও পুরনো অধিকারীবাড়ির ঝুলন কলকাতায় বিখ্যাত (Kolkata Jhulan Bari)। সেইসঙ্গে ওই ঝুলন্ত ব্রিজ বা বারান্দার মতো পথের জন্য স্থানীয়রা এই বাড়িকে চেনেন 'ঝুলনবাড়ি' হিসেবে। অনেক নীচ দিয়ে চলে গিয়েছে গলিপথ। সেখান দিয়ে স্থানীয়রা যাতায়াত করেন।
বাঁদিকের বাড়িটি ঠাকুরবাড়ি আর ডান দিকে বসত বাড়ি। দুই বাড়িতে যাতায়াতের জন্যই এই ঢাকা আকাশপথ। তাছাড়া অন্যান্য বাড়ির মত দুই বাড়ির একতলাতেও রয়েছে দরজা। যা দিয়েও গলিপথ পেরিয়ে এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে যাতায়াত করা যায়।

কিন্তু শুধুই ঝুলন বা ঝুলন্ত পথ নয়, এই বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার গৌরবময় ইতিহাস। রামকানাই অধিকারীর এই বাড়িতেই জীবনের শেষদিনগুলি কাটিয়েছেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিষ্ণুপুর ঘরানার বিশিষ্ট শিল্পী যদু ভট্ট। তিনি পঞ্চকোটের রাজসভার সভাগায়ক ছিলেন। পরে কলকাতায় আসেন। বালক রবীন্দ্রনাথকে গান শেখাতেন। বাড়ির বাইরে মার্বেলের ফলকে যদু ভট্টের বিষয়ে তথ্য রয়েছে।
ঝুলনদিনে এখনও সঙ্গীত উৎসব হয় বউবাজারের বাবুরাম শীল লেনের রামকানাই অধিকারীর ঝুলনবাড়িতে। এই আসরেই যদু ভট্টের গানে পাখোয়াজে সঙ্গত করতেন রামকানাই অধিকারী। সে ১৮৭০-৭৫ সালের কথা।

হীরুবাবু-শ্যামবাবু থেকে শুরু করে এটি কানন, ভিজি যোগ, মশকুর আলি খাঁ সাহেব, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের মতো ওস্তাদ আসর উজ্জ্বল করেছেন। জানালেন রামকানাই অধিকারীর বংশধর রাজা।
রাজা অধিকারী বললেন, 'তখন অভিজাত বাড়ির মহিলারা সাধারণের পথ ব্যবহার করতেন না। আলাদা পালকি, আলাদা রাস্তা ব্যবহার করতেন। আমাদের পরিবারও তার ব্যতিক্রম ছিলনা। কিন্তু রামকানাই অধিকারী এই মন্দির তৈরি করার পর বহু মানুষের সমাগম হত। এখনও হয়। বাড়ির মেয়েরা যাতে আলাদাভাবে মন্দিরে ঢুকতে বেরোতে পারে, সেজন্যই এই ঝুলন্ত পথ তৈরি করা হয়।'
ওই পথ থেকে সোজা ঢোকা যায় মন্দিরের গর্ভগৃহের একপ্রান্তে। দিন কয়েক আগে সেখানে গিয়ে দেখা গেল জগন্নাথের ভোগ সাজানো হচ্ছে। দিনের আলো প্রবেশের জন্য মন্দিরেরর ওপর এখনও রয়েছে 'স্কাইলাইট'।

তবে মেরামতির অভাবে সেটা এখন ত্রিপলে ঢাকা। নাহলে বর্ষায় জল সরাসরি মন্দিরে পড়তে পারে। তাঁরসঙ্গেই ঝোলানো রয়েছে বেলজিয়াম কাঁচের একটি সুদৃশ্য ঝাড়বাতি। এই ঝাড়বাতির সঙ্গে লাগানো রয়েছে একটি বড় ঘড়ি।
আর এক উত্তরসূরি উৎপল অধিকারী বললেন, 'পুরসভার রাস্তার ওপর দিয়ে এরকম ঝুলন্ত পথ কলকাতায় আর নেই। তখন ব্রিটিশদের কাছে অনুমতি নিয়েই তৈরি করা হয়েছিল বলে শুনেছি। আমাদের মন্দিরে পাঁচদিনের শাস্ত্রীয় সংগীতের আসরে যদুভট্ট আসতেন। তিনি এখনকার একটা ঘরেই থাকতেন। এখানেই প্রয়াত হন।'

সময় এবং প্রকৃতির নিয়মে ওই বাড়ির আকাশপথটির এখন সংস্কারের প্রয়োজন। দেওয়ালে নোনা ধরেছে। গজিয়েছে বটের চারা। এই বাড়িতে এখন সপরিবারে বসবাস করেন রাজা অধিকারী। বললেন, 'সময় বদলেছে। আমার স্ত্রীই এখন মন্দিরে ভোগের বিষয়টা দেখেন। ওই রাস্তা এখন আর কেউ ব্যবহার করে না। আমরা বাড়ি অনেকটা সারিয়েছি। বাকি অংশের সংস্কারও করা হবে।
মোটা বরপণ, বিলিতি ডিগ্রি, জামাইদের অত্যাচার আর অপমান নীরবে সহ্য করেছেন রবীন্দ্রনাথ