দ্য ওয়াল ব্যুরো: শেষ কবে এত নীল আকাশ দেখেছে শহর কলকাতা? মনে করতে পারছেন না অনেকেই। অথচ কোনও এক জাদুকাঠির স্পর্শের মতোই যেন মাত্র দিন চারেকের ব্যবধানে একেবারে ধুয়ে-মুছে গেছে শহরের দূষণ। সৌজন্যে, করোনা-সতর্কতা।
তথ্য বলছে, শনিবার থেকে আজ মঙ্গলবার, মাত্র চার দিনে এতটাই কমেছে দূষণ, যে একধাক্কায় বদলে গেছে এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স। স্বাভাবিকের থেকেও নীচে নেমে এসেছে বায়ুতে দূষিত কার্বন কণার পরিমাণ। এয়ার কোয়ালিটি স্ট্যান্ডার্ড যেখানে খুব খারাপ থাকত, সেখানে তা খারাপ, মোটামুটি ভাল পেরিয়ে খুব ভাল হয়ে উঠেছে, মাত্র চার দিনে! এক কথায় বলা যায়, কলকাতা এখন প্রাণ ভরে শ্বাস নিচ্ছে।
এই নতুন ভাইরাস সারা বিশ্বকে ত্রাসের মুখে ফেললেও এই ভাইরাসের কারণেই অদ্ভুত এক ইতিবাচক পরিবর্তনের সাক্ষী হচ্ছে গোটা পৃথিবী। চলতি মাসের গোড়ার দিকেই জানা গেছিল, চিনের দূষণ আশ্চর্য ভাবে কমে গেছে। মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা চিনের দূষণের আগের ও পরের তুলনামূলক ছবি প্রকাশ করে জানিয়েছিল, করোনাভাইরাসের ভয়াল আক্রমণে চিনের অসংখ্য কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে চলতি বছর চিনের বায়ুতে নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা উল্লেখজনক ভাবে কমেছে। ২০১৯ সালের প্রথম দু’মাসের চিত্রের সাথে চলতি বছরের প্রথম দু’মাসের যে স্যাটেলাইট চিত্র নাসা তুলনা করেছে, তাতে স্পষ্ট লক্ষ্য করা গেছে, উল্লেখজনক ভাবে কমেছে বায়ুদূষণের মাত্রা।
কলকাতাও যেন তেমন পথেই এগোচ্ছে। কিন্তু মাত্র চার দিনে এই পরিবর্তন যেন অবর্ণনীয়।
তথ্য বলছে, শনিবার কলকাতার বাতাসে প্রতি আড়াই মাইক্রোমিটারে কার্বণকণার উপস্থিতি ছিল ৭৩ একক। যা স্বাভাবিক হওয়ার কথা ৬০। এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স ছিল ১৪৩। ৫০ এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স-কে আদর্শ বলে ধরা হয়।
রবিবার সকাল থেকে শুরু হয় জনতা কার্ফু। প্রায় কেউই ঘর থেকে বেরোননি, গাড়ি চলেছে নামমাত্র। বন্ধ ছিল প্রায় সব অফিস, কারখানা, দোকান-পাট। সেদিনই কার্বণকণার উপস্থিতি কমে হয়েছে ৫০.৯৬। যা স্বাভাবিকের চেয়ে সামান্য কম। এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স নেমে আসে ৯৫-তে। বিশেষজ্ঞরা জানান, বাতাসের এই মাপকাঠি অর্থাৎ এয়ার কোয়ালিটি স্ট্যান্ডার্ড যথেষ্ট সন্তোষজনক।

এর পরে সোমবার বিকেল পাঁচটা থেকে শুরু হয়ে যায় লকডাউন। এই দিন যেন ম্যাজিক দেখায় কলকাতার আকাশ-বাতাস। কার্বণকণার পরিমাণ নেমে আসে ৩১.৭৮-এ। এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স ৬৩! আদর্শ দূষণমুক্ত বায়ুমণ্ডলের খুব কাছে পৌঁছে গেছে শহর। পরিবর্তনও চোখে পড়ে স্পষ্ট। অনেক বেশি নীল শহরের আকাশ। নিঃশ্বাস নিয়েও আরাম। পাখির ডাকও শোনা যায় শহর এলাকায়।
মঙ্গলবারের হিসেব চমকে দিল আরও একবার। এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স নেমে এসেছে ৩০-এ। কার্বনকণার পরিমাণ ১৭.৮৩। এয়ার কোয়ালিটি স্ট্যান্ডার্ড রীতিমতো ভাল বলেই জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
করোনাভাইরাসের ঝুঁকি ভারতকেও গ্রাস করে ফেলেছে কয়েক দিন আগেই। আক্রান্তের সংখ্যা পেরিয়েছে ৫০০, মৃত্যুও ঘটতে শুরু করেছে রোজ। কলকাতায় ইতিমধ্যেই করোনা-আক্রান্তের সংখ্যা ৯, মারা গেছেন এক জন। এমন পরিস্থিতিতে কয়কে দিন আগে থেকেই সামাজিক জমায়েত, মেলামেশা বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল থেকে লকডাউন গোটা রাজ্য। ফলে গাড়ির ধোঁয়া বা কারখানার বর্জ্য-- সবই প্রায় শূন্য। বড়বড় অফিস, শপিং মল, সিনেমা হল, জিম-- এসবই বন্ধ থাকায়, বন্ধ হাজার হাজার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র। ফলে ক্ষতিকর কার্বন এমিশন বলতে গেলে নেই-ই। ফল মিলেছে হাতেনাতে।
আশঙ্কায় ভয়ে থমথমে হয়ে থাকা শহরবাসী অন্তত প্রশ্বাস নিতে পারছে প্রাণভরে!