Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
IPL 2026: টানা চতুর্থ হারে কোণঠাসা কেকেআর, ৩২ রানে ম্যাচ জিতল সিএসকে‘ভূত বাংলো’য় সেন্সর বোর্ডের কাঁচি! বাদ গেল ৬৩টি দৃশ্য, ছবির দৈর্ঘ্য কমতেই চিন্তায় অক্ষয়ভোটের ডিউটিতে কড়া নিয়ম! প্রিসাইডিং ও সেক্টর অফিসারদের জন্য একগুচ্ছ নির্দেশিকা কমিশনের'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

আদালতের রায় কি সত্যিই অন্যরকম হতে পারত না?

সম্পূর্ণ প্যানেল বাতিল করে প্রায় ২৬ হাজার চাকরি এক মুহূর্তে হাপিশ করে দেওয়ার পেছনে কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ যে-যুক্তিগুলি হাজির করেছে, সেগুলির কোনওটিই ফেলে দেওয়ার নয়।

আদালতের রায় কি সত্যিই অন্যরকম হতে পারত না?

কলকাতা হাইকোর্ট

শেষ আপডেট: 26 April 2024 17:06

অংশুমান কর

চব্বিশ বছরের দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে গত দু-তিনটি দিনের মতো কঠিন দিন খুব কমই পার করেছি। একজন শিক্ষক সবচেয়ে বেশি বিপন্ন বোধ করেন যখন তাঁর ছাত্র বা ছাত্রীরা বিপন্ন হয়ে পড়ে এবং সেই বিপন্নতা জানায়ও শিক্ষককে। আমার বেশ কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রীর চাকরি চলে গেছে আদালতের রায়ে। গত কয়েকদিনে বিভিন্নভাবে তারা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের সংকটের কথা জানিয়েছে। অসহায় ভাবে এদের বিপন্নতার কথা শুনে যাওয়া ছাড়া এই মুহূর্তে আর কিছুই করার নেই আমার। এই সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে বা ফোনে কথা বলতে বলতে গত দু-তিনদিনে অনেক সময়ই আমাকে চুপ করে যেতে হয়েছে। সান্ত্বনা বাক্য বলতে হয়েছে যে, আজও এই পৃথিবীতে যোগ্যরা শেষ পর্যন্ত বঞ্চিত হয় না। কিন্তু পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে, তাতে এই বাক্যটির ওপরও ভরসা রাখতে পারছি না আর নিজেই। দায়িত্ব নিয়ে বলছি, আদালতের রায়ে যাদের চাকরি গেছে এদের মধ্যে আমি যাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি, তাদের অনেকের কেরিয়ার দুর্দান্ত– স্কুলে কেন এরা কলেজে পড়ানোরও যোগ্য। 

সম্পূর্ণ প্যানেল বাতিল করে প্রায় ২৬ হাজার চাকরি এক মুহূর্তে হাপিশ করে দেওয়ার পেছনে কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ যে-যুক্তিগুলি হাজির করেছে, সেগুলির কোনওটিই ফেলে দেওয়ার নয়। যেমন উচ্চ আদালত জানিয়েছে, যে সংস্থা ওএমআর শিট তৈরি মূল্যায়ন ও সংরক্ষণের দায়িত্ব ছিল তার নিয়োগই অস্বচ্ছ। এই সংস্থাটি আবার এই কাজের জন্য নিয়োগ করেছিল আরেকটি সংস্থাকে। যা একেবারেই করা যায় না। এটা ঠিক যে, পরীক্ষা সংক্রান্ত গোপনীয় কাজ করার জন্য অনেক সময়ই বদ্ধঘরেই কোনও একটি সংস্থাকে নির্বাচন করতে হয়। ঘোষিত টেন্ডারের প্রেক্ষিতে যে-সংস্থাগুলি এই কাজ পাওয়ার জন্য আবেদন করে,  তাদের পরিচয় জনসমক্ষে আনা হয় না। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালন সমিতির একজন সদস্য হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি যে, এক বা দু-জন ব্যক্তি ছাড়া কোন সংস্থা এই কাজ করছে সেটি এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অফিসারও জানতে পারেন না। সংস্থাটির পরিচয়ের জন্য ব্যবহার করা হয় কোড। এসব নিয়মবিধি এক্ষেত্রে মানা হয়নি এটি স্পষ্ট।

আদালত তাই ধরে নিয়েছে যে, নিয়োগ প্রক্রিয়াটির গোড়ায় গলদ ছিল। বাতিল করতে হবে পুরো প্যানেলটিই। উচ্চ আদালত আরও জানিয়েছে যে, “কতজনকে নিয়োগের জন্য আসলে এসএসসি সুপারিশ করেছিল সে ব্যাপারে তাদের কাছে আদালত স্পষ্ট বক্তব্য জানতে চেয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ শুনানিতেও তা নিয়ে স্পষ্ট দিশা দিতে পারেনি তারা”। রায়-পরবর্তী সময়ে অবশ্য এসএসসির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন যে, অযোগ্য প্রার্থীদের তালিকা আদালতে জমা দেওয়া হয়েছিল। সমস্যা হল এই যে, আদালতের রায়ে উল্লেখ করা আছে যে, “শুনানির মধ্যেও একটি ক্ষেত্রে এসএসসি জানিয়েছিল তারা ১০০ জনের সুপারিশ করেছে। যদিও মধ্যশিক্ষা পর্ষদ জানায় ওই সময়ে তারা শ’দুয়েক নিয়োগ করেছে। সব ক্ষেত্রেই সুপারিশ করেছিল এসএসসি”। বোঝাই যাচ্ছে যে, এসএসসি এবং পর্ষদের বক্তব্যের মধ্যে যে-গরমিল ছিল তাকে আদালত ভাল চোখে দেখেনি। যোগ্যপ্রার্থীদের জন্য গোদের ওপর বিষফোঁড়ার কাজ করেছে অযোগ্য প্রার্থীদের চাকরি বহাল রাখার জন্য সুপার নিউমেরারি পদ বা বাড়তি শূন্যপদ তৈরি করার অন্যায় সরকারি সিদ্ধান্ত। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, “এটা চমকে দেওয়ার মতো। জালিয়াতি করে পাওয়া চাকরি বাঁচানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল মন্ত্রিসভার মতো জায়গায়। এটা জেনেও যে, এইসব চাকরি হয়েছে প্যানেলের বাইরে এবং মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া প্যানেল থেকে”। রায়ে থাকা উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ গুলিকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু এরপরেও একটি কথা বলার অবকাশ বোধহয় থাকে।  

এসএসসির চাকরির দুর্নীতি নিয়ে সিবিআই তদন্ত চলছিল। তাদের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট এখনও জমা পড়েনি। জানা গেছে যে, ওএমআর শিটগুলির সফট কপি গুলি সিবিআই-এর কাছে আছে। ফাঁকা ওএমআর শিটতো সহজেই চিহ্নিত করা যায়। করা হয়েছেও। এভাবেই অযোগ্য প্রার্থীদের একটা বড়ো অংশকে ইতিমধ্যেই চিহ্নিত করা গেছে। বাকিদেরও কি যেত না? যেত কিন্তু। আদালতের রায় থেকে মনে হয়েছে যে, ওএমআর শিট তৈরি এবং সংরক্ষণের প্রক্রিয়াটির মধ্যে স্বচ্ছতার অভাব থেকে আদালত এমনটা মনে করেছে যে, ওএমআরর শিটেও কারচুপি করা হয়ে থাকতে পারে। এই আশঙ্কা অমূলক নয়। কিন্তু কারচুপি ধরার পদ্ধতি আজ তো আছে। প্রযুক্তি এখন এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে যে, ওএমারশিটে ন্যূনতম কারচুপি হলে, উত্তর, সই বা অন্য যে কোনো জিনিসের অদলবদল (ট্যাম্পারিং) করা হলে তা ধরা পড়বেই। ওএমআর শিটের ডিজিটাইজড কপিগুলি পরীক্ষানিরীক্ষা করে এই কাজ করা কি একেবারেই অসম্ভব? মনে হয়, সম্ভব।  হ্যাঁ, এই কাজে সময় লাগবে অনেকখানি। এই সময়টুকু কি দেওয়া যেত না? রায় কি এমন হতে পারত না যে, ইতিমধ্যেই চিহ্নিত অযোগ্যদের চাকরি এক্ষুনি চলে যাক কিন্তু যাদের যোগ্যতা সম্পর্কে প্রশ্নচিহ্ন আছে, তাদের যোগ্যতা খতিয়ে দেখা হোক? এত তাড়াহুড়ো করে রায় দেওয়ার কোনো প্রয়োজন সত্যিই ছিল কি? কেন বিশেষ করে এই রাজ্যে লোকসভা ভোটে চলাকালীনই তাড়াহুড়ো করে এমন একটি সংবেদনশীল বিষয়ে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই রায়দান করা হল? সিবিআইকে গোটা ঘটনার তদন্ত সম্পন্ন করার জন্য সময়সীমা বেঁধে দিয়ে চাপ দেওয়া যেতেই পারত আদালতের পক্ষে।

আইনের মারপ্যাঁচ না বোঝা, যোগ্য বিপন্ন ছাত্রছাত্রীদের মুখগুলি দেখে ততোধিক বিপন্ন বোধ করা একজন শিক্ষকের বারবার এটাই মনে হচ্ছে আজ। দেশের সর্বোচ্চ আদালত কি এইরকম একটি ভাবনাকে প্রশ্রয় দিতে পারে না যে, দুর্নীতি প্রমাণ হয়েছে যে-সমস্ত প্রার্থীদের চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে, তাদের দ্রুত অপসারণ করা হবে, কিন্তু একজন যোগ্য প্রার্থীও বঞ্চিত হবে না আদালতের যান্ত্রিক কোনও রায়ে? সমস্ত ওএমারশিট উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে খতিয়ে দেখলে পাঁচ বছর ধরে যে-যোগ্য প্রার্থীরা রাস্তায় বসে আছে, তারাও কিন্তু ন্যায়বিচার পাবে। প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষকের অভূতপূর্ব অপসারণ স্কুল শিক্ষায় যে-অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে একটি নতুন পাঠ্যবছরের সূচনা পর্বে, সেই সংকট থেকেও অনেকখানি পরিত্রাণ পাবে স্কুল, ছাত্র এবং অভিভাবকেরা। এই কথা তাই বারবার মনে হচ্ছে যে, দুর্নীতিকে কণামাত্র প্রশ্রয় না দিয়ে রায়টি কি আর একটু মানবিক হতে পারত না? ক্যান্সার রোগাক্রান্ত একজন শিক্ষিকার চাকরি বহাল রেখেছে কলকাতা উচ্চ আদালত। চাকরি পাওয়ার পর যোগ্য প্রার্থীদের যারা গৃহঋণ নিয়েছেন, আত্মীয় পরিজনের চিকিৎসার খরচ চালাচ্ছেন চাকরির ভরসায়, তাদেরও কি কর্কট রোগের শিকার করে ফেলল না আদালত? এই রায় তো তাঁদের মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে আর্থিক এবং সামাজিকভাবে। আরও একটি কথা। ২০১৬তে যারা যোগ্য ছিল, তারা গত ৩-৪ বছরে উচ্চশিক্ষার অঙ্গন থেকে বেরিয়ে আসা প্রভূত নম্বর পাওয়া নতুন প্রজন্মের ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে লড়াই করবে কী করে, বিশেষ করে যেখানে স্কুল শিক্ষকের চাকরির পরীক্ষায় অ্যাকাডেমিক কেরিয়ারের ওপর বেশ অনেকখানি নম্বর দেওয়া হয়ে থাকে? উচ্চশিক্ষার সঙ্গে যুক্ত থেকে দেখেছি গত দশ বছরে উচ্চশিক্ষায় ছাত্র-ছাত্রীদের প্রাপ্ত নম্বরের হার গড়ে দশ শতাংশ করে বেড়ে গিয়েছে। সমগ্র নিয়োগ প্রক্রিয়াটি যদি আবার নতুন করে শুরু করতে হয়, তাহলে ২০১৬তে যে-প্রার্থীরা যোগ্য ছিল, তারা সুবিচার পাবে তো?

সত্যি কথা বলতে কি, এই পরিস্থিতি তৈরিই হত না যদি না পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি হত স্কুলশিক্ষকের চাকরি প্রদানে। এই পরিস্থিতির জন্য বিরোধীদের তাই দায়ী করে লাভ নেই। সরকার প্রথমে দুর্নীতি হতে দিয়েছে। পরে সুপার নিউমেরারি পোস্ট তৈরি করে দুর্নীতিকে মান্যতা দিতে চেয়েছে। এখনও অযোগ্যদের পাশে দাঁড়াবার বার্তা দিচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকাদের। আসলে শাসকদলটি জোর গলায় অযোগ্যদের পাশে দাঁড়াতে চাইছে  কারণ দুর্নীতি যে এ রাজ্যের নির্বাচনী সমীকরণে খুব বড় বিষয় নয় তা সারদা-নারদা কাণ্ডে প্রমাণ হয়ে গেছে। কিন্তু সারদা-নারদা কাণ্ড ছিল এক জিনিস, আর স্কুল শিক্ষায় চাকুরি ক্ষেত্রে পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি আরেক জিনিস। এ কথা সত্যি, আমাদের সমাজের এক বিরাট অংশের মানুষ হয়তো এই দুর্নীতির দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হননি বা হবেন না। উচ্চশিক্ষা লাভ করে সমাজের এক ক্ষুদ্র অংশ। এর আরও ক্ষুদ্র এক অংশ শিক্ষকতার পেশাকে বেছে নেয়। এর বাইরে রয়ে গেছে যে-বৃহৎ জনসমাজ, শিক্ষার মেরুদণ্ডটি ঘুণপোকায় খেয়ে নিলেও তার প্রত্যক্ষ প্রভাব এদের জীবনে হয়তো পড়বে না। কিন্তু গত ১৩ বছরে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাক্ষেত্রে যে-অনাচার এবং নৈরাজ্যের বীজ রোপন করা হয়েছে, তা বিষবৃক্ষের জন্ম দেবেই। দিতে শুরুও করে দিয়েছে। একটি সমাজ প্রকৃত শিক্ষার অভাবে ধ্বংস হতে বাধ্য। পচে যেতে বাধ্য গোড়া থেকে। সেই পচনের পথে আমরা হাঁটতে শুরু করেছি। 

শাসক দলের মধ্যে শুভবুদ্ধি সম্পন্ন যে-সমস্ত নেতা-নেত্রীরা আছেন, তাঁরা কি সরকারের প্রধানকে একটুও সুপরামর্শ দিতে পারেন না? অন্তত এইটুকু কি তাঁরা নেত্রীকে বোঝাতে পারছেন না যে, অযোগ্য প্রার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিয়ে তিনি পরিস্থিতিকে আরও ঘোরালো করে তুলছেন?

মতামত ব্যক্তিগত

লেখক বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজির অধ্যাপক ও কবি


```