
শেষ আপডেট: 24 April 2022 09:53
বাংলা পেশাদারি থিয়েটারের সূচনাপর্বকে (Kolkata Heritage) অনায়াসেই ‘গিরিশ যুগ’ নামে চিহ্নিত করা যেতে পারে। তাঁর শিক্ষায় অনেক সৃষ্টিধর মঞ্চশিল্পী উঠে এলেও যিনি গিরিশচন্দ্র ঘোষের নাট্যস্বপ্ন ও ভাবনার প্রতিটি কণা দিয়ে নির্মিত, তাঁর নাম— বিনোদিনী দাসী। কলকাতায় এখনও রয়েছে গিরীশচন্দ্র ঘোষ ও নটী বিনোদিনীর বাড়ি। তবে অযত্নে, অনাদরে!
বাগবাজারে দুই রাস্তার মাঝখানে যত্নের অভাবে গিরিশচন্দ্রর বাড়ি আজ প্রায় ভেঙে পড়তে চলেছে। দ্রুত সংস্কারের কাজে হাত না দিলে এই ঐতিহাসিক বাড়ি নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।

রাজবল্লভপাড়া মোড় পেরিয়ে যতীন্দ্রমোহন অ্যাভিনিউ ধরে বাগবাজারের দিকে খানিকটা এগোলে রাস্তার মাঝেই পড়বে গিরিশ চন্দ্র ঘোষের বাড়ি। বাড়ির সামনের রাস্তাটি তাঁর নামেই নামাঙ্কিত। গিরিশ অ্যাভিনিউ। বহু নাটক, পরিকল্পনার সাক্ষী এই ভিটে। এখানে বসেই একের পর এক নাটকের জন্ম দিয়েছেন গিরিশচন্দ্র । এখানেই রাখা রয়েছে লাঠি, জুতো–সহ তাঁর ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিস। রয়েছে বহু দুষ্প্রাপ্য বইও। কিন্তু এই বাড়ির বিভিন্ন অংশে দেখা দিয়েছে ফাটল। খসে পড়ছে পলেস্তরা। মরচে ধরেছে লোহার রডে। বাড়ির দেওয়ালে গজিয়েছে বট, অশ্বত্থ।

শুক্রবার প্রবাদপ্রতিম নাট্যকারের বাসভবনে গিয়ে দেখা গেল, চারদিকে আবর্জনা। গাছের পাতার স্তুপ, ধুলোর পুরু আস্তরণ। বাড়িটিকে ঘিরে রেখেছে যে রেলিং, তাতে মরচে ধরে নড়বড়ে হয়ে গিয়েছে। একশোদিনের কাজের এর কর্মী সপ্তাহে একদিন এসে ঝাঁট দিয়ে যান।
আগে এই বাড়ির যত্নআত্তির জন্য কেয়ারটেকার ছিল। এখন আর নেই। শুধু বাড়ি পাহারা দেওয়ার লোক রয়েছে। তিনবেলা পালা করে বাড়ি পাহারা দেন তিনজন। তাঁদেরই একজন অরূপ দাসের কথায়, ‘বাড়ির ঘরগুলিতে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। কারণ বহুবছর সাফাই হয়নি। চাবি থাকে ওয়ার্ড অফিসে। কলকাতা পুরসভা একবার রঙ করেছিল। কিন্তু বাড়ির ভাঙাচোরা অংশ সারিয়ে তোলা হয়নি।’

বাগবাজারের সঙ্গে শিল্প-সংস্কৃতির যোগ বহুদিনের। রামকৃষ্ণদেব, সারদা দেবী, ভগিনী নিবেদিতা সহ বহু বিশিষ্টের পদধূলি ধন্য এই এলাকা। গিরিশচন্দ্র ঘোষ নিজেও রামকৃষ্ণদেবের ভাবধারায় অনুপ্রাণিত ছিলেন। বাগবাজার নিয়ে স্থানীয় মানুষের যথেষ্ট গর্ব রয়েছে। স্থানীয়রা জানালেন, এই বাড়ি অবশ্যই কলকাতার একটা ‘ল্যান্ডমার্ক’। অবিলম্বে সংস্কার করা না হলে অচিরেই হারিয়ে যাবে এই বাড়ি।
এলাকার লোকজনের আরও আক্ষেপ, সামনেই ভগিনী নিবেদিতার বাড়িটি সুন্দর করে সংরক্ষণ করে রেখেছে রামকৃষ্ণ সারদা মিশন। তৈরি হয়েছে হেরিটেজ মিউজিয়াম। অথচ রামকৃষ্ণদেবের স্নেহধন্য গিরীশ ঘোষের বাড়িটির প্রায় ভগ্নদশা!
শেষ কবে সংস্কার করা হয়েছিল? পাশের ভোলানাথ কেবিনের মালিক বললেন, ‘আটান্ন বছর থেকে দেখছি, কোনওদিন সংস্কার হয়নি। সবসময় বাড়ির দু’পাশ দিয়ে গাড়ি যায়। পুরোনো বাড়ির ক্ষতি হয়। অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
প্রথম বার ক্ষমতায় আসার পরে তৃণমূল পুরবোর্ড নাট্যকারের বাড়ির রঙ নীল-সাদা করে দিয়েছিল। সর্বস্তরে সমালোচনা শুরু হওয়ায় তা পাল্টে ফের হলুদ রঙ করা হয়। সেসময় শোনা গিয়েছিল,পুরো বাড়ি মার্বেলে মোড়া হবে। সেই সঙ্গে ওই নাট্যকারের সমসাময়িক ছ’জন মনীষীর মূর্তি বসানোরও পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু কিছুই হয়নি।

এই ওয়ার্ডের (৮ নম্বর) তৃণমূল কাউন্সিলর পুজা পাঁজা বললেন, ‘হ্যাঁ বাড়িটির পরিস্থিতি খারাপ তা পুরসভা জানে। সংস্কারের বিষয়ে পুরসভা সিদ্ধান্ত নেবে। আমরা বিষয়টিতে যথেষ্ট সচেতন।’
স্থানীয়রা জানালেন, প্রতি বছরই গিরিশচন্দ্র ঘোষের জন্ম ও মৃত্যুদিনে এই বাড়িটি ফুল-মালা দিয়ে সাজানো হয়। লাগানো হয় নানা রঙের আলো। ওটুকুই। তারপর আবার বছরভর অনাদরে পড়ে থাকে গিরিশ ঘোষের বসত ভিটে।

অন্যদিকে, গিরিশ ঘোষের বহু নাটকের নায়িকা নটী বিনোদিনী থাকতেন স্টার থিয়েটারের পাশের গলির ‘গোপাল কূটীর’ নামের একটি বাড়িতে। এদিন সেই বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, সামনে ‘চেতনা গণ সাংস্কৃতিক সংস্থা’র তরফে ১৯৯৪ সালে একটি ফলক লাগানো হয়েছে। যাতে লেখা, ‘বাংলা নাট্যমঞ্চের প্রথম পর্বে যাঁরা বাংলা নাটকের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছিলেন, তাঁদের অন্যতমা বিনোদিনী দেবী (১৮৬৩–১৯৪২) এই বাড়িতে বাস করতেন।’ কিন্তু ওই পর্যন্তই। সরকার বা কোনও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বাড়িটি সংরক্ষণে এগিয়ে আসেনি।

তবে বিনোদিনীর ঘর, তাঁর ব্যবহার করা জিনিস এখনও যত্নে আগলে রেখেছেন রত্না দাস ও তাঁর স্বামী সুব্রত দাস। তাঁরা নটী বিনোদিনীর দূর সম্পর্কের আত্মীয়। ওই বাড়িতেই থাকেন। কিন্তু বাইরের কারও প্রবেশাধিকার নেই।

রত্না বললেন, ‘একমাত্র কালীপুজোর দিন আমরা বাইরের লোককে ঢুকতে দিই। সেদিন নটী বিনোদিনীর জিনিসপত্র, ঠাকুরঘর দেখার সুযোগ দেওয়া হয়। আগে অনেকেই এসে জিনিসপত্র চুরি করার চেষ্টা করেছে। তাই আর কাউকে ঢুকতে দিইনা।’
উত্তর ভিজছে, এদিকে দক্ষিণবঙ্গ চেয়ে আছে চাতকের মতো, বৃষ্টি কই! কী বলছে হাওয়া অফিস