
শেষ আপডেট: 6 May 2023 16:12
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ঠিক কবে আর কী সূত্রে এটি তৈরি হয়েছিল, সে ইতিহাস আজও খোলসা করে কেউ বলতে পারে না। ঐতিহাসিকরা বলেন, এগারো শতকের গোড়ার দিকে এটি তৈরির কাজ শুরু হয়। অথচ আজ ব্রিটিশ ঐতিহ্য, ইতিহাস, স্মৃতির সঙ্গে আষ্টেপৃষ্টে জুড়ে আছে 'ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবে’। প্রায় এক হাজার বছর ধরে এই উপসনাস্থলই হয়ে আসছে ব্রিটিশ রাজপরিবারের রাজ্যাভিষেকের (king charles coronation) মঞ্চ। তার বিশ্ববিখ্যাত সমাধিক্ষেত্রে চিরশয্যায় শুয়ে আছেন চার্লস ডিকেন্স, জন ড্রাইডেন, জন কিটস, বায়রন, শেলি, টেনিসন, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, চার্লস ডারউইন বা আইজ্যাক নিউটন।
সেই ইতিহাস বিখ্যাত ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবিতেই অবশেষে ৭০ বছর পরে আবার সরকারিভাবে অভিষেক হল রাজা চার্লসের (king charles coronation)। কার্যত অতিথি-অভ্যাগতের ঢল নেমেছে লন্ডনে, ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবে জুড়ে চলছে জমকালো উদযাপন। প্রায় ২৩০০ অতিথি, ১০০-টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান-সহ বহু বিশিষ্টজনেরা রয়েছেন তাতে, পৌরহিত্য করছেন খোদ আর্চবিশপ অফ ক্যান্টারবেরি। ভারত থেকে থাকছেন উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড়। ৭৩ বছর বয়সে প্রবীণতম রাজা হিসেবে ব্রিটেন ও ১৪-টি কমনওয়েলথের শীর্ষে বসতে চলেছেন চার্লস (king charles coronation)।

১। ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবের প্রথম নথিভুক্ত অভিষেক ঘটে ১০৬৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর। বাংলায় পাল সাম্রাজ্যের সূর্য তখন পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। তার আগে কোথায় অভিষেক হবে সেই নিয়ে কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম বা প্রথা ছিল না। প্রথম অভিষিক্ত রাজা ছিলেন 'উইলিয়াম' বা 'উইলিয়াম দ্য কনকারার'। ইনি আদতে ছিলেন ইংলিশ চ্যানেলের ওপারে ফ্রান্সের নরম্যান্ডির বাসিন্দা। তৎকালীন রাজা এডওয়ার্ডের মৃত্যুর খবর পেয়ে তিনি সসৈন্যে ব্রিটিশ দ্বীপ আক্রমণ করেন এবং অ্যাংলো-স্যাক্সনদের হারিয়ে ব্রিটেনের প্রথম নর্ম্যান রাজা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
২। উইলিয়াম একইসঙ্গে ফরাসি ও ইংরেজ দুই জাতিরই ভাগ্যবিধাতা হন। তাঁর অভিষেকের সময় বাইরে প্রহরায় ছিল সশস্ত্র ফরাসি সৈন্য। কিন্তু তাঁর অভিষেকের সময় এমনই সবাই সোল্লাসে অভিবাদন করে ওঠেন যে, সেই সমবেত চিৎকারে বাইরের সৈন্যরা ভাবে, রাজাকে বুঝি খতম করে দেওয়া হল। এই ভেবে এমন হামলা চালায় যে, মাঝখান থেকে আগুন ধরে গিয়ে প্রায় লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় সবকিছু!

৩। চার্লসের আগে ব্রিটিশ রাজসিংহাসনে অভিষেক হয়েছিল সদ্যপ্রয়াত রানি এলিজাবেথের, ১৯৫৩ সালের ২ জুন। সেই অভিষেকই রাজপরিবারের ইতিহাসে প্রথম অভিষেক যেটা 'লাইভ' টিভিতে সম্প্রচারিত হয়েছিল। দেখেছিল সারা পৃথিবীর আমজনতা!
৪। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ছিলেন ব্রিটেনের ইতিহাসে ষষ্ঠ রানি, যিনি নিজ মহিমায় রাজপদে বসেছিলেন। প্রথমবার এই নজির ছিল রানি মেরির, ১৫৫৩ সালের ১ অক্টোবর।
আরও পড়ুন: কিছু অদ্ভুত নিয়ম যা ব্রিটেনের রাজপরিবারে থাকলে মানতেই হবে সবাইকে
৫। ১৬৮৯ সালের এপ্রিলে একটি নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে— প্রথম এবং একমাত্রবারের জন্য ব্রিটেনের রাজসিংহাসনে যৌথ অভিষেক ঘটে রাজা দ্বিতীয় উইলিয়াম এবং দ্বিতীয় মেরি। দ্বিতীয়বার এই নজির আর দেখা যায়নি। উইলিয়াম বসেছিলেন অভিষেকের জন্য বরাদ্দ ঐতিহাসিক চেয়ারে। ফলে মেরির জন্য নতুন একটা চেয়ার বানাতে হয়। আজও ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবির সংগ্রহে সেই চেয়ারটি অক্ষত রয়েছে।
৬। অভিষেকের জন্য বরাদ্দ এই চেয়ারে যে শুধু রাজা বা রানিই বসেছেন এমন নয়। ১৯৫৩ সালে রানি এলিজাবেথের অভিষেকের দিনে সেই চেয়ারে আরেকজনও বসে পড়েছিলেন। শুধু বসেই ক্ষান্ত হননি, রীতিমত জমিয়ে একখানা ঘুমও দিয়েছিলেন! তিনি— 'মাতিন' নামক একটি বিড়াল। অভিষেকের আগে চেয়ার প্রস্তুতের সময় দেখা যায়, তিনি পরমানন্দে সেখানে ঘুমোচ্ছিলেন।

৭। সময় পালটায়, পালটায় প্রযুক্তিও। চার্লসই প্রথম রাজা, যার অভিষেক এবারে দেখানো হবে সোশ্যাল মিডিয়ায়, 'লাইভ স্ট্রিমে'।
৮। এবারের অভিষেক প্রতীক বা 'করোনেশন এমব্লেম' ডিজাইন করেছেন স্যার জনি আইভি। যিনি আগে অ্যাপলের 'চিফ ডিজাইন অফিসার' ছিলেন।
৯। এবারের চার্লসের অভিষেকের সাক্ষী থাকতে চলেছেন বিপুল সংখ্যক সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য। সূত্রের খবর, ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যের সেনাবাহিনী ও আধাসেনার ৬০০০ জন সদস্য এবারে থাকছেন অভিষেকে। পাশাপাশি ৩৫ টি কমনওয়েলথ দেশের প্রায় চারশোর বেশি সেনা-সদস্য থাকছেন এবারে।

১০। ১৯০২ সালে রাজা সপ্তম এডওয়ার্ডের অভিষেকের দিন ধার্য হয়েছিল ২৬ জুন। ভারতে তখন বড়লাট লর্ড কার্জনের রাজত্বকাল। কলকাতা ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী, পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র। এডওয়ার্ডের অভিষেক নিয়ে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের জন্য দীর্ঘ পরিকল্পনা করা হয়েছিল। রানির গাউনের ডিজাইন করেছিলেন খোদ লর্ড কার্জনের স্ত্রী লেডি কার্জন। কিন্তু ঠিক দুই দিন আগে তাঁর অ্যাপেনডিক্সের সমস্যা ধরা পড়ে। তখন এটি ছিল ভয়ানক এক রোগ। তড়িঘড়ি অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করা হয়, করেন সেকালের প্রবাদপ্রতিম সার্জন স্যার ফ্রেডারিক ট্রেভিস। অভিষেক পিছিয়ে যায় ৯ আগস্ট। অতিথিরা অতদিন আর অপেক্ষা করতে চাননি। সমস্ত অতিথিরা বিস্তর হ্যাপা সামলে লন্ডনে এসেও শেষে বেশিরভাগ মান্যগণ্যরা অভিষেক না দেখেই ফিরে যান।
১১। অভিষেকের পবিত্র আচার হিসেবে নবাভিষিক্ত রাজাকে গোপন প্রণালীতে মিশ্রিত এক বিশেষ ধরণের তেল দিয়ে বরণ করার রীতি আছে। ১৩৪৯ সাল থেকে প্রতি অভিষেকের জন্য নতুন একটি করে চামচ বানানোর রীতি আছে। শোনা যাচ্ছে, চার্লসের জন্য নির্দিষ্ট তেলটি জেরুসালেম থেকে সংগৃহীত।
১২। ১৯৫৩ সালে রানি এলিজাবেথের অভিষেকের পরে অতিথিদের এক বিশেষ ধরণের মুরগির মাংসের রেসিপি দেওয়া হয়েছিল। কনস্ট্যান্স স্প্রাই এবং রোজমেরি হিউম নামক দুই ব্রিটিশ শেফ একত্রে এই রেসিপিটি উদ্ভাবন করেছিলেন, যেখানে চিকেনকে ক্রিমি কারির সঙ্গে সিজনড স্যালাড ড্রেসিং ও বিচিত্র নানা হার্বস দিয়ে সাজানো হয়েছিল। পরে এই ডিশটির নাম দেওয়া হয় 'করোনেশন চিকেন'। এবারেও এটি পরিবেশন করার পরিকল্পনা আছে।
অবশেষে ৭৪ বছর বয়সে মিলল ‘প্রোমোশন’, যুবরাজ থেকে রাজা হলেন চার্লস: একনজরে কিছু অজানা তথ্য