দ্য ওয়াল ব্যুরো: দেশের কোভিড পরিস্থিতিতে প্রথম থেকেই দুর্দান্ত সাফল্যের পথ দেখিয়েছিল দক্ষিণের রাজ্য কেরালা। মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নের পরিকল্পনা আর স্বাস্থ্যমন্ত্রী কে কে শৈলজার পরিশ্রমের মিলিত ফল মিলেছিল কয়েক দিনের মধ্যেই। প্রায় ছন্দে ফিরতে শুরু করছিল রাজ্যটি, শিথিল হচ্ছিল লকডাউন। কিন্তু ফের আশঙ্কার মেঘ ঘনায় গত মাসের শেষের দিকে। হটাৎই বেড়ে যায় আক্রান্তের সংখ্যা। সংক্রমণের চেন সবে ভাঙতে শুরু করেছিল দক্ষিণের এই রাজ্যে। তার পরেই সামান্য আলগা দেওয়াই কাল হয়েছে। দ্রুত সেরে ওঠার সংখ্যা বাড়ার ট্রেন্ড বদলে যেতে শুরু করে হঠাৎ।
কিন্তু সেই দ্বিতীয় দফার ধাক্কাও দক্ষ প্রশাসনিক পথেই সামলে নিল কেরল। জানা গেছে, গত তিন দিনে একটিও নতুন সংক্রমণের খবর নেই আর। এই মুহূর্তে রাজ্যের হাসপাতালগুলিতে চিকিৎসাধীন আছেন ৩৪ জন। মোট ৫০০ আক্রান্তের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছেন ৪৬২ জনই। মল্লপুরমের এক নবজাতক-সহ মৃত ৪।
মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন বলেছেন, "গোটা রাজ্যে ২১ হাজার ৭২৪ জন বিশেষ পর্যবেক্ষণে রয়েছেন এখন। এঁদের মধ্যে ৩৭২ জন হাসপাতালে আছেন, বাকিরা বাড়িতে। এখনও পর্যন্ত ৩৩ হাজার নমুনা পরীক্ষা হয়েছে, যার মধ্যে ৩২ হাজার ৩১৫টি নমুনা নেগেটিভ। যদিও দেশের বাইরে প্রায় ৮০ জন কেরলবাসীর মৃত্যুর খবর এসেছে। পাশাপাশি অঙ্গরাজ্যগুলিতেও সংক্রামিত একাধিক মালয়লি।"

সরকারি সূত্রে খবর, এখন আর একটিও হটস্পট নেই কেরলে। এবার হয়তো ঘুরে দাঁড়াবে রাজ্যটি। ইতিমধ্যেই এই ক'মাসে যা অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, সে দিকে নজর দিতে শুরু করেছে সেরাজ্যের সরকার। রাজ্যে যাতে বড়সড় ব্যবসায়িক বিনিয়োগ আসে, তারও চেষ্টা করছেন মুখ্যমন্ত্রী নিজে। ব্যবসায়িক কর্মপ্রক্রিয়াও যাতে সহজে শুরু হয়, তার জন্য লাইসেন্সিং ও রেজিস্ট্রেশনে কিছু ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সরকার। প্রতিটি বিনিয়োগকারীকে এক বছর সময়ও দেওয়া হবে প্রাথমিক ক্ষতি সামলে নিতে।
শুধু তাই নয়, যাতে চটজলদি রোজগারের পথে মানুষকে ফেরানো যায়, সেই চেষ্টায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কও গড়ার কথা ভাবছে সরকার।
অথচ, এ কথা না বললেই নয়, ভারতের প্রথম করোনা আক্রান্ত শনাক্ত করা গিয়েছিল দক্ষিণ ভারতের এই ছোট রাজ্যটি থেকেই! চিনের উহান থেকে আসা এক ছাত্রের দেহে ধরা পড়েছিল সংক্রমণ। সেই থেকেই আক্রান্ত হন আরও কয়েক জন। ধীরে ধীরে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ায় মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রাজ্যটি ভারতের অন্যতম হটস্পটে পরিণত হয়।
ক্রমে দেশের অন্য নানা রাজ্যে বাইরে থেকে দেশে ফেরা মানুষদের মাধ্যমে সংক্রামিত হতে থাকেন অনেকে। কয়েক দিনের মধ্যে এ সংখ্যাটা বাড়তে বাড়তে পৌঁছেছে ১০ হাজার ৮২৪-এ। মারা গেছেন ৪২০ জন। কিন্তু এসবের উল্টোদিকে কেরলের পরিস্থিতির সম্পূর্ণ উল্টো পরিবর্তন হয়েছে। আক্রান্তের হিসেবে আর প্রথম তিনেও নেই কেরল। এপ্রিল মাসে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা আগের থেকে বেশ কমেছে। অন্যদিকে আক্রান্তদের মধ্যে ৫০ শতাংশেরও বেশি মানুষ সুস্থ হয়েছেন ইতিমধ্যেই।
কিন্তু মাত্র দু-আড়াই মাসের ব্যবধানে সারা দেশের এই ছবিতে কেরল কী করে আলাদা হয়ে উঠল? কী করেই বা রুখে ফেলল ভয়াল সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী গতি? শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও ‘কেরালা মডেল উচ্চ প্রশংসিত’। এর কারণ অনুসন্ধান করলে অনেক তথ্যই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়। যার মধ্যে দু’টি কারণ উল্লেখযোগ্য। প্রথমটি হল, টেস্টিং। কোনও মানুষের সংক্রমণ আছে কিনা তা খুঁজে বার করতে অনন্য চেষ্টার পরিচয় দিয়েছে এ রাজ্যের প্রশাসন। যা রাজ্যকে অনেকটাই এগিয়ে দিয়েছে করোনা যুদ্ধে। এবং দ্বিতীয়টি হল, অভিজ্ঞতা। এই দ্বিতীয় কারণটির কথা উল্লেখ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রীও।
কেরালার স্বাস্থ্যমন্ত্রী কেকে শৈলজা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “যখনই এই ভাইরাসের কথা প্রথম শোনা যায়, তখন থেকেই আমরা প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। কোনও ঝুঁকির অবকাশ রাখিনি। করণ ২০১৮ সালে আর এক ভাইরাস ‘নিপাহ’ ছড়িয়েছিল আমাদেরই রাজ্যে। ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল সেবার। দেখেছিলাম, কত দ্রুত হাতের বাইরে চলে যায় পরিস্থিতি। সেই অভিজ্ঞতাকে মনে রেখে এবার আমরা অনেক আগে থেকেই ঠিক করে নিয়েছিলাম যে কীভাবে করোনার মোকাবিলা করা হবে। তাই জানুয়ারির শেষ দিকে যখন প্রথম বিমানটি উহানে আটকে পড়া কেরালাবাসীদের নিয়ে এখানে নামল, আমরা প্রস্তুত হয়েই ছিলাম।”
আর এই সব সাবধানতার পাশাপাশিই করা হয়েছে আগ্রাসী টেস্টিং। হু প্রথম থেকেই বলেছে, করোনাকে জব্দ করতে লকডাউন জরুরি হলেও, তা যথেষ্ট নয়। লকডাউন করে সময়টা হাতে পাওয়া মাত্র, যাতে সংক্রমণ আর না ছড়ায়। কিন্তু সেই সময়টায় যদি ব়্যাপিড টেস্ট করে আক্রান্তদের খুঁজে আইসোলেট করা শুরু না হয়, তাহলে কোনও লাভ নেই। কেরল সরকার সেটাই করেছে।
পাশাপাশি, রাজ্য সরকারগুলির মধ্যে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবচেয়ে বেশি অর্থ মঞ্জুর করছে কেরল সরকারই। পরিমাণ কুড়ি হাজার কোটি টাকা। এই রাজ্য দায়িত্ব নিয়েছে অভিবাসী শ্রমিকদেরও। তাই সারা দেশ থেকে যখন শ্রমিকদের বাড়ি ফেরার চেষ্টা নিয়ে বিশৃঙ্খলা ও আশঙ্কার খবর এসেছে, তখন কেরলে বসবাসকারী ভিন্ রাজ্যের শ্রমিকদের রাখার জন্য অসংখ্য ক্যাম্প তৈরি করেছে কেরল। শুধু তাই নয়, সেই ক্যাম্পগুলিতে সেইসব কর্মীদেরই মোতায়েন করা হচ্ছে সরকারের তরফে, যাঁরা এই শ্রমিকদের ভাষা বলতে পারেন। নির্দেশ, নিয়মকানুন আর কড়া অনুশাসনের বেড়াজালে মানবিকতা হারিয়ে যেতে দেয়নি এই রাজ্য।
ফলও মিলেছে সব মিলিয়ে। নতুন করে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অনেক কম। মৃত্যুও বাড়েনি। একের পর এক মানুষ সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরছেন। এঁদের মধ্যে সবথেকে উল্লেখযোগ্য এক দম্পতি, যাঁদের একজন ৯২ আর আর এক জন ৮৮ বছর বয়সি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী শৈলজা বলেন, “এই দু’জনকে সারিয়ে তোলা আমাদের চিকিৎসকদের একটা বড় সাফল্য। বয়স্করাই বেশি সংখ্যায় মারা যাচ্ছেন করোনায়। কিন্তু এঁরা দীর্ঘ চিকিৎসার পরে সেরে উঠেছেন। আমাদের রাজ্যে জনসংখ্যার ১৫% ই বয়স্ক। তাই তাদের মধ্যে যাতে সংক্রমণ না ছড়ায়, সেটাও আমাদের কাছে একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।”