দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘লেগেছে লেগেছে আগুন...প্রচণ্ড তাপ, কি কাণ্ড বাপ, জ্বলে পুড়ে যা।’
যুদ্ধ লেগেছে। এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধ। মহাশূন্যে এক ধ্বংসলীলা চলছে। থামার কোনও লক্ষণই নেই। জ্বলে-পুড়ে যাচ্ছে তারাদের ঘরবাড়ি। ছিটকে বেরোচ্ছে আগুনের হলকা। ভিন্ পাড়ায় গ্রহ খুঁজতে গিয়ে এ কী দেখে ফেলল নাসার প্ল্যানেট-হান্টার কেপলার! ভুল করে তারাদের সংসারের অশান্তি দেখে আর চোখ ফেরাতে পারেনি। ঠায় লেন্সে নজর রেখে কেপলার এখন যুদ্ধ দেখছে। কতটা ভয়ঙ্কর সেই যুদ্ধ তার বিবরণ সে পাঠিয়েছে নাসার গ্রাউন্ড স্টেশনে।
আমাদের চেনাপরিচিত সৌরজগতের বাইরে ভিনদেশী গ্রহদের খুঁজে বার করাই কেপলারের কাজ। সেটা করতে গিয়েই তার নজর পড়েছে দুই তারার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে। সে এক অতি ভীষণ যুদ্ধ। যেন খামচে ধরছে একে অপরের শরীর। ছিঁড়ে-খুঁড়ে যাচ্ছে রক্তমাংস-হাড়-মজ্জা। প্রচণ্ড উত্তাপ এবং আগুনের হল্কা যেন রক্তস্রোতের মতো বইছে মহাকাশে।

আমাদের সৌরজগতের ঠিক পাশের পাড়াতেই বাস আলফা সেনটাওরি নক্ষত্র-জগতের। তবে এই যুদ্ধ সেখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে বাঁধেনি। এই
নক্ষত্র-জগৎ (Star-System)আরও দূরের। সেখানকার দুই তারার মধ্যেই লেগেছে জোরদার লড়াই। তারা সূর্যের মতো আড়েবহরে বিশাল নয়, তবে বেশ মাংসল অর্থাৎ ভরযুক্ত। একটি ধবধবে সাদা, অন্যটি আগুনে-খয়েরি। সূর্য বা তার থেকেও বড় নক্ষত্রদের মতো গনগনে আঁচ নেই এদের, তাই তারাদের জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় বলে বামন নক্ষত্র বা Dwarf Star। নাসার কেপলার দেখেছে, হোয়াইট ডোয়ার্ফ ও ব্রাউন ডোয়ার্ফের মধ্যেই ঝামেলা শুরু হয়েছে দীর্ঘসময় ধরে।
দুই তারাই যেন ভ্যাম্পায়ার, শুষে নিচ্ছে একে অপরের রক্ত
হোয়াইট ডোয়ার্ফ অনেকটা সূর্যের মতো উজ্জ্বল যদিও আঁচ কম। আকারে পৃথিবীর মতোই। ব্রাউন ডোয়ার্ফের ভর প্রায় ৮০টি বৃহস্পতি গ্রহের ভরের কাছাকাছি। এদের মাঝে দূরত্ব আগে ভালই ছিল। কিন্তু ক্রমশ এই দূরত্ব তারা কমিয়ে আনছে। সেই সঙ্গে লড়াইও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।
এই ঝগড়ার আসল কারণ যদিও এখনও অজানা, তবে কেপলারের পাঠানো তথ্যের উপর ভিত্তি করে এই লড়াইয়ের বিবরণ দিয়েছে নাসা।
বাল্টিমোর, মেরিল্যান্ডের স্পেস টেলিস্কোপ সায়েন্স ইনস্টিটিউট (STScI),
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটির বিজ্ঞানীরা বলছেন, হঠাৎ করেই উজ্জবলতা বেড়ে গেছে দুই নক্ষত্রের। আগের চেয়ে প্রায় ১০০০ গুণ বেশি আলো বিকিরণ করছে তারা। হোয়াইট ডোয়ার্ফ বা সাদা বামনকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করছে ব্রাউন ডোয়ার্ফ বা খয়েরি রঙা বামন নক্ষত্র। প্যাঁচ যত চেপে বসছে, আত্মরক্ষার জন্য ছোবল মেরে যাচ্ছে হোয়াইট ডোয়ার্ফ। শুষে নিচ্ছে খয়েরি বামনের অস্থি-মজ্জা।
https://www.youtube.com/watch?v=_V7J05fK5e0&feature=emb_logo
কেপলার জানিয়েছে, দুই তারা মধ্যে এখন দূরত্ব মাত্র ২৫০,০০০ মাইল বা চার লক্ষ কিলোমিটার। তার উপর ক্রমেই তারা এত আগ্রাসী ভঙ্গিতে একে অপরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে যে দু’জনের মাধ্যাকর্ষণ শক্তিই একে অপরের উপর ক্রিয়াশীল হয়ে পড়ছে। ব্রাউন ডোয়ার্ফের চেয়ে আকারে ছোট হলেও তার শরীর ছিঁড়েখুঁড়ে নিচ্ছে হোয়াইট ডোয়ার্ফ। হার মানতে রাজি নয় খয়েরি বামনও। সেও দিচ্ছে মারণ প্যাঁচ। প্রতি ৮৩ মিনিটে এই দূরত্ব কমছে হুহু করে। এই সংঘাতের ফলে প্রচণ্ড মহাজাগতিক রশ্মির বিকিরণ হচ্ছে মহাশূন্যে।
স্পেস টেলিস্কোপ সায়েন্স ইনস্টিটিউটের গবেষক রিডেন হারপার বলেছেন, দুই তারা মধ্যে আকর্ষণের শক্তি এতটাই প্রবল হয়ে উঠছে যে তাদের মাঝে রিঙের মতো ডিস্ক তৈরি হচ্ছে। যার তাপমাত্রা বাড়ছে চড়চড়িয়ে। ৫০০০-৭০০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (২,৭০০-৫,৩০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) থেকে বর্তমানে তাপমাত্রা বেড়ে হয়েছে ১৭,০০০-২১,০০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৯.৭০০-১১,৭০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) ।
কেপলারের দেখা মাল্টি-প্ল্যানেট-সিস্টেম
https://www.youtube.com/watch?time_continue=6&v=5I_FOEh47RY&feature=emb_logo
নাসার
‘ট্রানসিটিং এক্সোপ্ল্যানেট সার্ভে স্যাটেলাইট’ বা টেস (TESS) গত কয়েকবছর ধরে ভিন্ গ্রহের খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছে। ২০০৯-এ কেপলার অভিযান শুরু হলে মাত্র চার বছরেই আরও সাড়ে তিন হাজার গ্রহের হদিশ দিয়েছিল কেপলার। এখনও পর্যন্ত পাঁচশোরও বেশি গ্রহ, বামন গ্রহ ও উপগ্রহের সন্ধান মিলেছে যাদের সঙ্গে পৃথিবীর নানা বিষয়ে মিল পাওয়া যায়। এই গ্রহের খোঁজ এখনও জারি। এরই মধ্যে প্রায় ৪০০০ গ্রহের মাটি-আবহাওয়া নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চালাচ্ছে নাসা। সুপারকম্পিউটারের মাধ্যমে দেখা হচ্ছে এইসব গ্রহ বসবাসের উপযোগী কি না, অথবা এদের মধ্যে প্রাণের সম্ভাবনা কতটা। এই গ্রহের খোঁজ করতে গিয়েই বিবাদমান দুই তারার সংসারে আড়ি পেতে যুদ্ধ দেখে ফেলেছে নাসার কেপলার। এই যুদ্ধ নিয়ে এখন মাথা ঘামাচ্ছে বিশ্বের তাবড় বিজ্ঞানীমহলও।