
শেষ আপডেট: 2 October 2020 18:30
কিসকা নামে একটি তিমির ঘটনা খবরের শিরোনামে উঠেছিল ২০১ সালে। তিমিটিকে আইসল্যান্ডের উপকূল থেকে ধরে কানাডার মেরিল্যান্ডের একটি বিনোদন পার্কের পুলে রাখা হয়েছিল। একটি বড় অ্যাকোয়ারিয়াম ট্যাঙ্কে একাই রাখা হয়েছিল কিসকাকে। কয়েকমাস পর থেকে দেখা যায় তার স্বাভাবিক আচরণ বদলে গেছে। নানা রোগ দেখা দিচ্ছে। নিউমোনিয়ায় আক্রান্তও হয়েছিল কিসকা। যে পাঁচটি সন্তানের জন্ম দিয়েছিল তারাও ছিল কমজোরি এবং কম দিনের মধ্যেই মৃত্যু হয়েছিল তাদের। প্রাণীবিদরা বলেছিলেন, এই জাতীয় তিমি দলবদ্ধভাবে সমুদ্রে থাকতেই পছন্দ করে। মানুষের সংস্পর্শে ছোট ট্যাঙ্কে বন্দি করে রাখার কারণে চূড়ান্ত অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল কিসকা। মস্তিষ্কের রোগ দেখা দিয়েছিল তার।
গবেষকরা বলছেন, এমন উদাহরণ অজস্র। নিউরোসায়েন্সের একটি গবেষণাপত্রে বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, বন্দি প্রাণীদের মস্তিষ্কের গঠনে বদল আসে। মানসিক রোগ দেখা দিতে থাকে। স্ট্রেস হরমোন বেড়ে যায়। হাতি, বাঘ তো বটেই বিড়াল, খরগোশ বা রডেন্ট জাতীয় ছোট প্রাণীদের মধ্যেও রোগ বাসা বাঁধতে থাকে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বুনো হাতিকে দীর্ঘদিন বন্দি করে রাখলে তার আর্থ্রাইটিসের সমস্যা দেখা দেয়। এমনও দেখা গেছে, চিড়িয়াখানায় বন্দি হাতির ওবেসিটি ধরা পড়েছে, কিডনির রোগ হয়েছে বা ত্বকের সংক্রমণজনিত রোগে আক্রান্ত হয়েছে।
প্রাণীবিদরা বলছেন, বন্দি অবস্থায় থাকলে হাতিরা নিজেদের দাঁত ঘষতে থাকে, অনেকে দাঁত ভেঙেও ফেলে। ক্রমাগত মাথা নাড়াতে থাকে, ব্রেন কাজ করে না ঠিকমতো। একই রকম রোগ দেখা গেছে বাঘ, সিংহের মতো শিকারি প্রাণীদের ক্ষেত্রেও। বন্দি অবস্থায় স্নায়ুর রোগে আক্রান্ত হতে দেখা গেছে। অনেককেই দেখা গেছে খাঁচার দেওয়ালে মাথা ঘষতে, লোহার গ্রিল কামড়াতে। প্রাণীবিদরা বলছেন, এগুলো অস্বাভাবিক আচরণ যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, স্ট্রেস হরমোন সাঙ্ঘাতিকভাবে বেড়ে গেছে প্রাণীদের। ভেতরে ভেতরে অবসাদ গ্রাস করেছে। যে কারণে মৃত্যুও হতে দেখা গেছে প্রাণীদের।
খাঁচায় বন্দি প্রাণীরা সবচেয়ে বেশি ভোগে স্নায়ুর রোগে, নতুন গবেষণায় এমনটাই দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। কর্টিকাল নিউরোনে সমস্যা দেখা দেয় প্রাণীদের। নিউরনের আকার ছোট হয়ে যায়। স্নায়ুকোষ তার কার্যকারিতা হারায়। ফলে মস্তিষ্কে বার্তা পৌঁছতে পারে না। অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে প্রাণীরা। গবেষকরা বলছেন, জঙ্গলের পরিবেশে হাতিরা দিনে ১৫০ থেকে ২০০ মাইল হাঁটে। কিন্তু চিড়িয়াখানায় দিনে তিন মাইলের বেশি হাঁটা হয় না তাদের। অনেকক্ষেত্রেই পায়ে চেন বেঁধে রাখার কারণে সারাদিন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না প্রাণীরা। এর ফলে তাদের মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায়। বাঘ, সিংহ বা অন্যান্য প্রাণীদের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা দেয়। অধিক উত্তেজনা, অবসাদ, মুড-ডিসঅর্ডার, পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হয় প্রাণীরা। গবেষকরা বলছেন, বন্যপ্রাণীদের রাখতে হলে খোলামেলা পরিবেশে বড় জাতীয় উদ্যান বা অভয়ারণ্যে রাখাই ভাল। যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে প্রাণীরা। টেনেসি, ব্রাজিল, উত্তর ক্যারোলিনায় চিড়িয়াখানার প্রাণীদের জন্য এখন এই ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে।