দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘শুনতে পাই হাজার হাজার বছর আগে নাকি রাম নামের এক দেবতা ছিল। তাঁর তৈরি সেতুকে স্পর্শ করা যাবে না। আমি জিজ্ঞাসা করছি কে এই রাম? সে কোন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে পাশ করেছিল?’
দক্ষিণ হোক বা উত্তর ভারত, শ্রী রামকে নিয়ে এমন মন্তব্য করার দুঃসাহস কি কোনওদিনও দেখাতে পারবেন কোনও নেতা? যতই ধর্মনিরপেক্ষতার ভান করুন না কেন। যতই রামের রাজনীতির বিরোধিতা করুন না কেন।
ভারতের একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর সঙ্গে নাকি যোগাযোগ ছিল শ্রীলঙ্কার তামিল জঙ্গি সংগঠন এলটিটিই-র। শোনা যায় রাজীব গান্ধীর হত্যা নিয়ে জৈন কমিশনের অন্তর্বর্তিকালীন রিপোর্টেই বলা হয়েছিল এমন কথা। যদিও শেষ অবধি চূড়ান্ত রিপোর্টে সে কথা আর ছিল না। সেই মুখ্যমন্ত্রীই হঠাৎ টেলিভিশন চ্যানেলের সাক্ষাৎকারে বসে বলে বসলেন, ‘এলটিটিই’র প্রভাকরণ আমার বন্ধু।’
তামিলনাড়ুর পাঁচবারের এই মুখ্যমন্ত্রীর নাম জড়িয়েছে দুর্নীতি মামলায়। টু জি কেলেংকারীতে উঠে এসেছে মেয়ে কানিমোজির নাম।
তামিলনাড়ুতে আবার এই পুরো সময়ের রাজনীতিককে পরিচিত ‘কালাইঙ্গার’ বলে। তামিলে এই শব্দটার মানে শিল্পী।
বাংলার মানুষ কোনওদিনও বুঝতেই পারেনি সব সময় সাদা পোশাক আর কালো চশমা পরা এই নেতার জনপ্রিয়তার রহস্য।
মুথুভেল করুণানিধির জন্ম তামিলনাড়ুর থিরুক্কুভালাই গ্রামে ১৯২৪ সালে। ছোটবেলা থেকেই আকর্ষণ শিল্প-সাহিত্যে। ১৪ বছর বয়সে জড়িয়ে পড়েন তামিল ভাষা ও জাতিসত্তার কথা বলা জাস্টিস পার্টির সঙ্গে।
সেই সময় জাস্টিস পার্টির প্রাণ তামিল সংস্কৃতির প্রবাদপুরুষ, সমাজসংস্কারক ই ভি রামস্বামী। তামিল সমাজ যাকে চেনে ‘পেরিয়ার’ বলে। পেরিয়ার ব্রাহ্মণ্যবাদকেও দেখতেন দক্ষিণভারতীয় সমাজে উত্তর ভারতের চাপিয়ে দেওয়া সংস্কার হিসাবে।
তাঁর বক্তব্য ছিল, যদি কোনও ঈশ্বর মানুষের অধঃপতনের কারণ হয় তাহলে সেই ঈশ্বরকেও ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া উচিত। জাস্টিস পার্টির নাম পরে বদলে পেরিয়ার রাখেন দ্রাবিদার কাজাঘম।
১৮ বছর বয়সে সাহিত্যপ্রেমী তরুণ করুণানিধি শুরু করেন মুরাসোলি সংবাদপত্র। সেই সংবাদপত্র আজও বর্তমান।
পরে হয়ে ওঠেন দ্রাবিদার কাজাঘমের মুখপত্র কুডিয়ারাসু’র সম্পাদক। ১৯৪৪ সালে পেরিয়ারের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে সেই পত্রিকার কাজ ছেড়ে দেন কালাইঙ্গার। তিনি তখন সিনেমার স্ক্রিপ্ট লেখার কাজ পেয়েছেন।
আর এইসময়েই তাঁর সঙ্গে আলাপ হয় এক তরুণ অভিনেতার। যাঁর নাম মারুদার গোপালন রামচন্দ্র। জনমানসে যিনি পরে বিখ্যাত হবেন এমজিআর বলে। সব সময় খাদির পোশাক আর গলায় রুদ্রাক্ষের মালা এমজিআর ছিলেন গান্ধীভক্ত।
প্রথম আলাপ থেকেই শুরু হয় প্রগাঢ় বন্ধুত্ব।
১৯৪৯ সালে পেরিয়ারের সঙ্গে তীব্র বিরোধ শুরু হল তাঁরই ভাবশিষ্য ও দ্রাবিদার কাজাঘমের প্রথম সারির নেতা আন্নাদুরাইয়ের। সেই সময় ৩২ বছর বয়সী মণিআম্মাইকে বিয়ে করেছেন ৭০ বছরের পেরিয়ার। অন্য গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের অতিক্রম করে তিনি দলের ভার তুলে দিতে চান তাঁর হাতেই।
ভেঙে গেল দ্রাবিদার কাজাঘম। আন্নাদুরাইয়ের নেতৃত্ব শুরু হল নতুন দল দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজাঘম। অনেকে অবশ্য বলেন, মণিআম্মাই ছাড়াও আরও অনেক কারণ ছিল এই দলভাগের। পেরিয়ার চাইতেন আলাদা তামিল রাজ্য। আর আন্নাদুরাই তখন কেন্দ্রের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বলছেন তৎকালীন মাদ্রাজ রাজ্যের আরও স্বাধীকারের কথা।
করুণানিধি চলে গেলেন আন্নাদুরাইয়ের নতুন দলে। তিনি ততদিনে তামিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির নাম করা স্ক্রিপ্ট রাইটার।
১৯৫০ সালে করুণানিধির জন্যই তামিল ছবি ‘মনথিরি কুমারী’তে হিরোর রোল পেলেন এমজিআর। আর এই ছবির বক্স অফিস সাফল্য তাঁকে রাতারাতি বানিয়ে দিল তামিল সিনেমার নতুন সুপারস্টার।
১৯৫৩ সালে কালাক্কুড়ি শহরের নাম বদলে ‘ডালমিয়াপুরম’ করায় আন্দোলন শুরু করেন করুণানিধিও তাঁর সঙ্গীরা। তাঁদের মতে এই নাম বদলানো আসলে তামিল সংস্কৃতির ওপর উত্তরভারতীয় আগ্রাসন। রেল স্টেশনের বোর্ড ঢেকে দিয়েছিলেন তাঁরা। শুরু করেছিলেন রেল অবরোধ। সেই সময় পুলিশের গুলিতে মারা যান দু’জন। আর এই আন্দোলনের ফলেই নেতা হিসেবে উঠে আসেন করুণানিধি। অবশ্য ততদিনে বিধায়ক হয়ে গিয়েছেন তিনি।
১৯৫৯ সাল। আন্নাদুরাই বক্তৃতা দিচ্ছেন তৎকালীন মাদ্রাজের বিখ্যাত মেরিনা বিচে। কিছুদিন আগেই আঞ্চলিক ভোটে জিতেছেন তাঁরা। স্টেজে দাঁড়িয়ে তিনি করুণানিধির আঙুলে পরিয়ে দিলে সোনার আঙটি। তিনিও নাকি বিশ্বাস করতে পারেননি যে করুণা তাদের ভোটে জেতাতে পারে। ‘জিতলে কী দেবেন?’ সে সময় করুণা জিজ্ঞেস করেছিলেন তাঁকে। সেইদিন দেওয়া আংটির প্রতিশ্রুতিই আজ রাখছেন তিনি।
মেরিনা বিচের এই ঘটনার পরেই সবার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় আন্নাদুরাইয়ের উত্তরাধিকারী হতে চলেছেন করুণাই।
তামিল রাজনৈতিক মহলের অনেকে অবশ্য আজও মনে করে, উচ্চাকাঙ্খী করুণাই সাংবাদিকদের মাধ্যমে কলকাঠি নেড়ে আন্নাদুরাইকে দিয়ে ওই নাটক করেয়েছিলেন।
১৯৬৯ সালে আন্নাদুরাইয়ের মৃত্যুর পর মুখ্যমন্ত্রী হলেন করুণানিধি। শোনা যায় সেই সময় মন্ত্রী হওয়ার জন্য তাঁর কাছে ছুটে গিয়েছিলেন এমজিআর। কিন্তু করুণা তাঁকে একটা শর্ত দেন। মন্ত্রী হতে গেলে ছাড়তে হবে ফিল্ম কেরিয়ার। করুণা জানতেন যে সিনেমাই হল সাধারণ মানুষের সঙ্গে এমজিআরের সম্পর্কের ভিত্তি। তাঁর পক্ষে কিছুতেই ছাড়া সম্ভব হবে না সেই পেশা।
তিন বছর পরে এই এমজিআরই ডিএমকের ট্রেজারার করুণার বিরুদ্ধে তহবিল তছরুপের অভিযোগ আনবেন। নতুন দল গড়বেন।
অথচ শোনা যায় তারপরেও করুণানিধির প্রতি কখনও অশ্রদ্ধা দেখাননি এমজিআর। একবার তাঁর এক সহচর নাকি করুণানিধি সম্পর্কে বলতে গিয়ে নাম ধরে বলেছিলেন। রেগে গিয়েছিলেন এমজিআর, বলেছিলেন তোমার এত স্পর্ধা তুমি ওকে নাম ধরে ডাকো?
আরও একবার তাঁর এক সঙ্গী করুণানিধি সম্পর্কে বিষেদগার করার পর তিনি নাকি রাগ করে গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে হাটতে শুরু করেছিলেন।
এমজিআরের মৃত্যুর পর গোটা দিন নাকি খাবারের একটা দানাও মুখে তোলেননি করুণানিধি।
পাঁচ বার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। সরকারে থাকার পরও জরুরী অবস্থার বিরোধিতা করেছিল একমাত্র তাঁর ডিএমকেই। তার জন্য বরখাস্তও হয়েছিল তাঁর সরকার। রাজীব হত্যার পরেও পড়ে গিয়েছিল তাঁর সরকার।
একবার প্রচুর ভোটে জিতে আসার পর, তার পরের ভোটেই পর্যুদস্ত হয়েছেন এমজিআরের শিষ্যা জয়ললিতার কাছে। অশীতিপর বৃদ্ধ আবার তার পরের ভোটেই জিতে এসেছেন জনতার রায়ে।
ছোটবেলায় ছোট জাত বলে স্কুলে পড়তে দেওয়া হবে না বলে জলে ডুবে মরার হুমকি দিয়ে স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। বারবার আন্দোলন করেছেন সমাজসংস্কারের জন্য। দলিত ও গরিবদের সপক্ষে। লেখায়, সিনেমার স্ক্রিপ্টে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন সিস্টেমের বিরুদ্ধে। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে চালু করেছেন একের পর এক জনদরদী নীতি। মহিলাদের জন্য ৩০ শতাংশ চাকরির সংরক্ষণও প্রথম তাঁরই করা।
আবার তাঁর বিরুদ্ধেই উঠেছে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ।
যে পেরিয়ারের বিরুদ্ধে অসমবয়সী স্ত্রীকে দলের ভার দেওয়ার অভিযোগে একদিন নতুন দল গড়েছিলেন আন্নাদুরাই, তাঁরই শিষ্য করুণা শেষ অবধি দলের ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছেন পরিবারতন্ত্র। পুত্র স্টালিনকে দলের উত্তরাধিকার দিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধেই।
গুরুগম্ভীর তামিল লেখক থেকে জনপ্রিয় সিনেমার স্ক্রিপ্ট রাইটার হয়ে উঠেছিলেন তিনি। তেমনই সমাজমনস্ক আদর্শবাদী থেকে পুরোদস্তুর রাজনৈতিক নেতাও হয়ে উঠেছিলেন মুথুভেল করুণানিধি।