
শেষ আপডেট: 13 May 2023 08:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দৃশ্য-১. খোলা মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তিনবার ঝুঁকে প্রণাম করলেন প্রবীণকে। বারে বারে বললেন, ‘উনি দলের সম্পদ, রাজ্যের গর্ব।’
দৃশ-২. মোদীর ভাষণের মধ্যে ঘন ঘন স্লোগান উঠল ‘গেল্লালু ইয়েদুরাপ্পা’। দু-তিনবার ভাষণ থামাতে হয় মোদীকে। মুখে হাসি ধরে রেখে ফের শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী।
কর্নাটকের (Karnataka Election) বিজেপিকে ক্ষমতায় আনা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুকানাকেরে সিদ্দালিঙ্গাপ্পা ইয়েদুরাপ্পা ‘বিএসওয়াই’ (B. S. Yediyurappa) নামেই বেশি পরিচিত। আর কন্নড়ে ‘গেল্লালু’ অর্থ জয় হো। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) ভাষণের মাঝে স্থানীয় নেতার নামে ঘন ঘন জয়ধ্বনীর দ্বিতীয় নজির কেউ মনে করতে পারছেন না।
ঘটনাটি গত ফেব্রুয়ারির। ভোটের দিন নির্ঘণ্ট ঘোষণার বেশ কিছু দিন আগেই বেঙ্গালুরুর সেই সভায় ইয়েদুরাপ্পার নামে জয়ধ্বনী বিজেপি তো বটেই গোটা রাজনৈতিক মহলে সাড়া ফেলেছিল। বিজেপির ঘরের লোকেরা বার্তা দিয়েছিল বিএসওয়াইকেই কর্নাটকে তারা এক নম্বর নেতা মানেন, এক বছর আগে মোদী-শাহ-নাড্ডা জুটি যাঁকে আচমকাই মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে সরিয়ে বাতিলের খাতায় নাম নাম লিখেছিলেন।
যদিও বছর ঘোরার আগেই বিজেপির দিল্লির হাইকমান্ড টের পেয়েছিল যুদ্ধ জয়ের জন্য সিদ্ধান্তটা নির্ভূল ছিল না। তাই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর আশিতম জন্মদিনটিই প্রধানমন্ত্রী বেছে নিয়েছিলেন কর্নাটকের শিবমোগ্গা বিমানবন্দর উদ্ধোধনের জন্য। ২৭ ফেব্রুয়ারি সরকারি অনুষ্ঠান মঞ্চটি হয়ে উঠেছিল প্রবীণ নেতার সংবর্ধনা সভা। আর দর্শকাসন থেকে বারে বারে স্লোগান উঠেছে ‘গেল্লালু বিএসওয়াই’।
সেই অনুষ্ঠানের নজির টেনে আর এক নেতা অমিত শাহ সভার পর সভায় বলেছেন, সব দলের শেখা উচিত কীভাবে একজন প্রবীণ নেতাকে সম্মান জানাতে হয়। শাহের ভাষণেও ছিল ইয়েদুরাপ্পার ভূয়সী প্রশংসা। বলেছেন, ‘বিজেপিতে ওঁর মতো অবদান কম নেতার আছে।’
অথচ, চারবারের মুখ্যমন্ত্রী, দু’বারের বিরোধী দলনেতা তথা প্রভাবশালী লিঙ্গায়েত সম্প্রদায়ের মুখ বিএসওয়াইকে আচমকাই রাজনৈতিক সন্ন্যাসে পাঠিয়ে দেন মোদী-শাহরাই। মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে বসিয়ে দেন বাসবরাজ বোম্মাইকে। শনিবারের নির্বাচনী ফলাফল দেখে বিজেপির বহু নেতা একান্তে মানছেন ভোটের ময়দানে বিএসওয়াইয়ের পরিবর্তে মোদীকে প্রধান মুখ করেই দল মস্ত ভুল করেছে। ফেব্রুয়ারির সেই সভা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাতিল বিএসওয়াই-কেই ভোট বৈতরণী পেরতে একেবারে অগ্রভাগে রাখা উচিৎ ছিল রাজ্যের বাস্তবতা মেনে। কিন্তু মোদী সরকার রাজ্যে রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী পাঠানোর মতো ভোটের লড়াইয়েও বিজেপিও কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনের সারিতে এগিয়ে দেয়। ফলে বাংলার মতো পরিণতি হল দক্ষিণে দলের একমাত্র ক্ষমতায় থাকা রাজ্যটিতে।
আসলে মুখ্যমন্ত্রী বদলের সিদ্ধান্ত প্রবীণ ইয়েদুরাপ্পার থেকেও বেশি অপমানজনক ঠেকেছে তাঁর অনুগামীদের কাছে। তাদের চাপেই মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সি ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিমানে ভোটের রাজনীতি থেকে অবসর ঘোষণা করেন অভিমানী ইয়েদুরাপ্পা। সেই সঙ্গে তাঁর অনুগামী বিধায়কদের বিদ্রোহে বিজেপি বুঝতে পারে, একা বিএসওয়াই সব অঙ্ক পাল্টে দিতে পারেন।
কালক্ষেপ না করে কর্নাটকের এই প্রবীণ নেতাকে দলের সংসদীয় বোর্ডের সদস্য করে নেন মোদী। দলের নির্বাচন সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ে শেষ কথা বলার অধিকারী ওই কমিটি। বিএসওয়াইকে সেই কমিটিতে নিয়ে মোদী আসলে কর্নাটকে দলকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার দায়িত্বটা কৌশলে এই প্রবীণ নেতার উপর চাপিয়ে রাখেন। কিন্তু ভোটে দেখা গেল বিজেপির প্রচার যাথারীতি মোদীময়। অনেক নেতাই বলছেন, মোদী নির্ভরতায় দুটি সমস্যা দেখা দেয় দলে। একদল মনে করতে থাকে বাকি রাজ্যগুলির মতো কর্নাটকেও প্রধানমন্ত্রী দলকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখবেন। আর ইয়েদুরাপ্পার অনুগামীরা অপেক্ষায় থাকে ‘কত ধানে কত চাল’ তা মাপতে।
প্রচারের একটা পর্ব পর্যন্ত এই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে সামনের সারিতে এনে বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হয় কর্নাটক বিজেপি চলবে এই প্রবীণের কথাতেই। সেই বার্তা জোরদার করতে বিজেপির সভামঞ্চ কার্যত বিএসওয়াইয়ের পূজার্চণায় পর্যবসিত হয়। কিন্তু সব থেমে যায় ভোটের দিন কুড়ি আগে মোদী-শাহ জুটি প্রচারে নামার পর।
কন্নড় রাজনীতিতে প্রভাবশালী লিঙ্গায়েত সম্প্রদায়ের মুখই শুধু নন, ইয়েদুরাপ্পা বলতে গেলে তাদের কাছে শেষ কথা। অশীতিপর নেতার ঈশারা ছাড়া লিঙ্গায়েত সম্প্রদায়ের ১৭ শতাংশ ভোট পদ্মের বাক্সে আসা কঠিন। কর্নাটকে প্রধানমন্ত্রীর সভা তাই ‘গেল্লালু বিএসওয়াই’ স্লোগানে সরগরম হয়ে ওঠা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। এখনও পর্যন্ত ভোটের ফলাফলের যে প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে তাতে বোঝা যাচ্ছে, দীর্ঘদিন সঙ্গে থাকা লিঙ্গায়েত ভোটব্যাঙ্কে ফাটল বিজেপির জন্য বড় ধাক্কার কারণ হয়েছে। মনে করা হচ্ছে, বিএসওয়াই-কে প্রাপ্য গুরুত্ব না দেওয়ার খেসারত দিতে হল বিজেপিকে। দলের হারেও বুড়ো হাড়ে হিরো তাই বিএসওয়াই।