
শেষ আপডেট: 28 July 2022 08:33
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্টকে (Everest) নিয়ে যতটা প্রচারের আলো, ততটা নেই দ্বিতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ গডউইন অস্টিন বা কেটু (K2) নিয়ে। অথচ পর্বতারোহণ মহলের মতে, উচ্চতায় দ্বিতীয় হলেও আরোহণের চ্যালেঞ্জের দিক থেকে কয়েকগুণ এগিয়ে এই শৃঙ্গ। ব্যর্থতা, দুর্ঘটনা, মৃত্যুর ঘটনাও ভূরিভূরি। তাই প্রতি বছর বিশ্বের নানা প্রান্তের কয়েকশো পর্বতারোহী এভারেস্ট আরোহণের খেতাব পেলেও, বহু পর্বতারোহী একাধিক বার এভারেস্ট আরোহণের রেকর্ড গড়লেও, কেটু শৃঙ্গে আরোহণের সংখ্যা এখনও হাতেগোনা।
এরই মধ্যে আশ্চর্য রেকর্ড করেছেন নেপালের মিংমা গ্যাবু শেরপা। এই কঠিন কেটু শৃঙ্গে পাঁচ-পাঁচ বার আরোহণ করে ফেলেছেন তিনি। পর্বতারোহণ মহলে অবশ্য তিনি মিংমা ডেভিড শেরপা (Mingma David Sherpa) নামেই বেশি পরিচিত।

আজ, বৃহস্পতিবার সকালে পর্বতারোহী নির্মল পুর্জা সোশ্যাল মিডিয়ায় এ কথা জানিয়েছেন। তিনি লেখেন, 'আমার ভাই মিংমা ডেভিড শেরপাকে বিপুল অভিনন্দন! স্যাভেজ মাউন্টেন কেটু শৃঙ্গ ৫ বার সামিট করেছেন তিনি। এই প্রথম এবং একমাত্র রেকর্ড তাঁরই। তাঁর লাস্ট আরোহণে বেসক্যাম্প থেকে চুড়োয় পৌঁছতে সময় লেগেছে ১৪ ঘণ্টা ২২ মিনিট। মিংমা শুধু ব্যতিক্রমী ও সেরা পর্বতারোহী নন, তিনি হাই অল্টিটিউডের একজন সেরা ফোটোগ্রাফারও।'
১৯৮৯ সালের ১৬ মে নেপালের খুম্বু গ্রামে জন্ম মিংমা ডেভিড শেরপার। নেপালি ভাষায় মিংমা শব্দের অর্থ মঙ্গলবার। সপ্তাহের যেদিন সন্তানের জন্ম হয়, সেই দিনের নাম অনুযায়ীই হয় নামকরণ। কিশোর বয়স থেকেই তুখোড় পর্বতারোহী মিংমা ডেভিড। ২০১০ সালে আরোহণ করে ফেলেন এভারেস্ট। এর পরে একের পর এক আটহাজারি শৃঙ্গে অভিযান শুরু। ২০২০ সালের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সে বিশ্বের ১৪টি আট-হাজারি শৃঙ্গই স্পর্শ করে রেকর্ড গড়ে ফেলেন তিনি।

অন্যতম কঠিন শৃঙ্গ কেটু-তে তাঁর প্রথম পা পড়ে ২০১৪ সালে। এভারেস্ট এবং কেটু শৃঙ্গ সবচেয়ে কম সময়ে আরোহণের রেকর্ডও রয়েছে তাঁর, ৬১ দিনে। এর পরে ২০১৮ সালে এই শৃঙ্গে ফের আরোহণ করেন তিনি। শুধু তাই নয়, গত বছর শীতে অর্থাৎ ২০২১ সালের ১৬ জানুয়ারি শীতকালীন কেটু অভিযানে যে রেকর্ড আরোহণ হয়, সেই ইতিহাসেরও সাক্ষী এই মিংমা। এর পরে এই বছর, ২০২২ সালে জুলাই মাসে আরও দু'বার আরোহণ করে ফেললেন কেটু।
বিশ্বের দ্বিতীয় উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ কারাকোরাম-২ বা K2 পাকিস্তান এবং চিনের সীমান্তে অবস্থিত। ৮ হাজার ৬১১ মিটারের এই শৃঙ্গে আরোহণ পর্বতারোহীদের কাছে প্রায় দুঃসাধ্য একটা অভিযান। তথ্য বলছে, এই শৃঙ্গে এখনও পর্যন্ত পা রাখতে পেরেছেন মাত্র ৩৭৭ জন। যেখানে এভারেস্টের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটা প্রায় ৭ হাজার! কেটু অভিযানে এ যাবত মারা গিয়েছেন ৯১ জন আরোহী। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা দুর্ঘটনা বাদ দিয়েও, দীর্ঘ সামিট পথের ক্লান্তিই সহ্য করতে পারেননি কত জন! তাই কেটু-কে পর্বতারোহীরা চেনেন ‘স্যাভেজ মাউন্টেন’ নামেও। এই পাহাড়েই পাঁচ-পাঁচ বার পা রাখলেন মিংমা ডেভিড শেরপা!

আসলে, শেরপা শব্দটার সঙ্গে যেন জড়িয়ে আছে, রুটি-রুজির দায়ে পাহাড় চড়তে আর চড়াতে যাওয়ার ধারণাটুকু। শুধু তাই নয়, বছর-বছর পেটের দায়ে অভিযানে গিয়ে মৃত্যু যেন বাই-প্রোডাক্ট তাঁদের কাছে। মৃত্যুর পরেও আরোহণ ইতিহাসে ট্র্যাজিক হিরো ছাড়া অন্য পরিচয় জোটে না। এমনকী আরোহী হিসেবেও সেভাবে জোটে না খ্যাতির মুকুট। আজও তাই এডমন্ড হিলারির পরেই করা হয় তেনজিং নোরগের নাম।
অথচ, পৃথিবীর কোন কোন প্রান্ত থেকে একের পর এক পর্বতারোহী দল নিরন্তর ছুটে আসে হিমালয়ে, এই শেরপাদের ভরসাতেই। কিন্তু ‘অভিজাত’ আরোহী মহল এখনও শেরপাদের সহ-অভিযাত্রীর চোখে দেখতে শেখেনি অনেক ক্ষেত্রেই। তাঁরা যেন শুধুই উচ্চতার সঙ্গী, বিপদের উদ্ধারকর্তা। জিনগত ভাবে রক্তে অতিরিক্ত লোহিত কণিকা থাকায় যাঁদের শরীরে অক্সিজেন বেশি প্রবাহিত হয়। পাহাড় চড়াটা যাঁদের কাছে শারীরিক দিক থেকে খানিকটা সহজতর। পয়সার বিনিময়ে যাঁদের সঙ্গে নিয়ে, যাঁদের দিয়ে মালপত্র বইয়ে, প্রয়োজনে যাঁদের পিঠে চড়েও উঁচু থেকে আরও উঁচু শৃঙ্গ জয় করে ফেলা যায়।– এটুকুই।

কিন্তু এই হিসেব ওলোটপালোট হয়ে যেতে বসেছে বেশ কিছু দিন আগে থেকেই। গত বছরের শীতেই ১০ জন নেপালি আরোহী শেরপা কেটু সামিট করে দেখিয়ে দেন, পর্বতারোহণের কঠিনতম বাজিটা আসলে তাঁরাই জিতেছেন। তাবড় পর্বতারোহীরা যা করে দেখাতে পারেননি এত বছর ধরে, তাই করে দেখিয়েছিলেন তাঁরা। সেই দলে ছিলেন মিংমাও।
সেই ঐতিহাসিক সামিটের পরে এই বছর আরও দু'বার, সব মিলিয়ে পাঁচ বার কেটু শৃঙ্গ আরোহণ হয়ে গেল মিংমা ডেভিড শেরপার। পর্বতারোহণের ইতিহাসের পাতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন উজ্জ্বলতম অক্ষরে। এ অক্ষর শিখতে হয়তো এখনও বহু চড়াই-উতরাই পেরোতে হবে পর্বতারোহণ মহলকে।

মিংমার সফল আট-হাজারি আরোহণের তালিকা, একনজরে।
কেটু শীর্ষে বাঙালি কন্যা! ইতিহাস গড়লেন ওয়াসফিয়া, রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার শেষে উদ্বেল বাংলাদেশ
কঠিন কেটুতে আজ যেন নারীদিবস, পরপর সামিট আট কন্যার! তাক লাগালেন পাক মেয়েরাও
পাহাড় জয় করা যায় না, তবু শীতের অপরাজেয় কেটু শীর্ষে তাঁরাই ‘বিজয়ী’