দ্য ওয়াল ব্যুরো: পেগাসাস স্পাইওয়্যারের মাধ্যমে ফোনে আড়িপাতা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার নিরাপত্তা নিয়ে দেশজুড়ে যে প্রশ্ন উঠছে, তার জন্য অভিযুক্ত সংস্থা যতটা দায়ী, ততটাই দায় রয়েছে সরকারেরও। এটা তথ্য-নিরাপত্তা আইনের আওতায় ঘটা অসঙ্গতি। এমনটাই জানালেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি বিএন শ্রীকৃষ্ণ। তিনিই দেশের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা বিলের জনক।
জাতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে বিচারপতি শ্রীকৃষ্ণ বলেন, "তথ্য-নিরাপত্তা আইনের আওতায় যেমন সমস্ত বেসরকারি সংস্থাগুলি পড়ে, তেমনই সরকারও এই আইন মেনে চলতে বাধ্য। সেই আইন বিঘ্নিত হলে সরকারকে উত্তর দিতে হবে। বিশেষ প্রয়োজনের ভিত্তিতে কোনও তথ্য যদি সরকারও পেতে চায়, তাহলেও সংসদে বিধি আনতে হয় নিয়ম অনুযায়ী।"
রবিবার রাতের দিকে একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের জেরে দেশজুড়ে শুরু হয় তোলপাড়। জানা যায়. দেশের তাবড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও একাধিক দাপুটে সাংবাদিকের তথ্য নিজেদের করায়ত্ত করেছে পেগাসাস স্পাইওয়্যার। প্রতিবেদনে বলা হয়, আইন বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, সরকারি আমলা, বিজ্ঞানী-সহ প্রায় ৩০০টি ভেরিফায়েড ভারতীয় টেলিফোন নম্বরে আড়ি পাতছে এই ইজরায়েলি স্পাইওয়ার। ৪০ জন সাংবাদিকও রয়েছেন তালিকায়। রয়েছে দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর ফোন নম্বরও।
সরকারের তরফে অবশ্য পাল্টা বলা হয়, ভারত একটি মজবুত গণতান্ত্রিক দেশ। এখানে সব নাগরিকের গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টি সুনিশ্চিত করা হয়। এই প্রতিশ্রুতি বজায় রাখতে ২০১৯-এ পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন বিল আনা হয়েছে। ২০২১-আনা হয়েছে তথ্যসুরক্ষা আইন, যাতে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত থাকে।
এইখানেই বিচারপতি শ্রীকৃষ্ণ প্রশ্ন তুলেছে, মজবুত তথ্যসুরক্ষা আইন থাকা সত্ত্বেও পেগাসাস-কেলেঙ্কারি হয় কী করে! তাঁর কথায়, "যদি আইনি সক্রিয়তা থেকে থাকে, তাহলে এই ঘটনার দায় সরকারেরই। কারণ সরকারের আগ্রহ ছাড়া এই ফোন হ্যাকিং সম্ভব নয় কোনও সংস্থার পক্ষে। আমার মনে হয় এই বিষয়টির যাঁরা ভুক্তভোগী তাঁদের সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে মামলা দায়ের করা উচিত। অন্তত মানুষকে জানানো উচিত এ বিষয়ে। কারণ তথ্যের গোপনীয়তা নাগরিকদের মৌলিক অধিকার।"
সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০১৯ সালে এই পেগাসাস সফটওয়্যার তৈরি হয়। তখন হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিও কলের মাধ্যমে ম্যালওয়্যার ঢোকানো হয়েছিল মোবাইলে। ১৪০০ জনের নম্বর হ্যাক করে গোপন তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হয়েছিল। হোয়াটসঅ্যাপে মিসড ভয়েস কল দিয়ে এই ম্যালওয়্যার ইনস্টল করে দেওয়া হত ফোনে। আর এখন হ্যাকারদের মূল নিশানা হল অ্যাপলের মেসেজিং অ্যাপ্লিকেশন। আইফোনের আইমেসেজকেই টার্গেট করা হচ্ছে। গ্রাহকের আইফোনে ম্যালওয়্যার যুক্ত করে মেসেজ পাঠানো হচ্ছে। সেই আইমেসেজ ক্লিক না করলেও ম্যালওয়্যার ইনস্টল হয়ে যাচ্ছে ফোনে। যদি গ্রাহক মেসেজ না খুলে ডিলিটও করে দেন, তাহলেও এই সাঙ্ঘাতিক ম্যালওয়্যার ফোনের সিস্টেমে ঘুরতে থাকবে। হাতিয়ে নেবে ছবি, ভিডিও, অডিও, কললিস্ট, মেসেজ সহ যাবতীয় তথ্য, এমনকি পাসওয়ার্ডও।
প্রসঙ্গত, ইজরায়েলের স্পাইওয়ার পেগাসাস ব্যবহার করে ফোনে আড়ি পাতা হয়েছে ফ্রান্সেও। ফরাসি সরকারের মুখপাত্র গ্যাব্রিয়েল অট্টল বৃহস্পতিবারই বলেন, প্রেসিডেন্ট ইম্যানুয়েল মাকরঁ বিষয়টি মোটেই হালকাভাবে নিচ্ছেন না। তিনি পেগাসাস কেলেংকারি নিয়ে আলোচনার জন্য জাতীয় নিরাপত্তা বৈঠক ডেকেছেন। ঠিক এমন সক্রিয়তা ও তৎপরতা কেন নেই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে, সে প্রশ্নও তুলেছেন বিচারপতি শ্রীকৃষ্ণ।
ইতিমধ্যেই ইজরায়ের এক সাংবাদিক ওমের কবির দাবি করেছেন, পেগাসাসের নির্মাতা এনএসও মোটেই নিরীহ কোম্পানি নয়। এনএসও-র দাবি, তারা অপরাধী ও সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে লড়াই করার জন্য ওই স্পাইওয়ার তৈরি করেছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশের নেতাদের ওপরে নজর রাখার জন্য ওই স্পাইওয়ার ব্যবহৃত হত। এনএসও জেনেশুনেই সৌদি আরবকে মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক ও প্রতিবাদীদের খুঁজে বার করতে সাহায্য করেছে। এর ফলে জামাল খাসোগির মতো কোনও কোনও সাংবাদিককে খুনও হতে হয়েছে বলে অভিযোগ।
তবে দেশ তথা বিশ্বজুড়ে আলোচনা শুরু হওয়ার পরে এনএসও গ্রুপ সাফাই দিয়ে বলেছে, পেগাসাসের অপব্যবহার হয়েছে কিনা তার তদন্ত করা হবে। প্রয়োজনে এই সফটওয়্যার সিস্টেম বন্ধ করে দেওয়াও হতে পারে।