দ্য ওয়াল ব্যুরো: এ যেন হঠাৎ দেখা। এত বছর পরে। এত অপেক্ষার পরে। কোনও প্ল্যান-প্রোগ্রাম করে নয় কিন্তু। আচমকাই এক মহি-সন্ধিক্ষণে মিলবে দু’জনায়।
[caption id="attachment_140085" align="alignleft" width="145"]
সন্দীপ চক্রবর্তী[/caption]
‘আরও কাছাকাছি, আরও কাছে এসো’…
কাছেই আসছে দু’জনে। পাশাপাশি, ঘেঁষাঘেঁষি। গায়ে গায়ে দুই গ্রহের মহা-সংযোগ ঘটতে চলেছে দীর্ঘ ৩৯৭ বছর পরে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘গ্রেট কংজাংশন’ । বিরল থেকে অতি বিরলতম ঘটনা ঘটতে চলেছে পৃথিবীর সৌর-পরিবারে। যেন কত বছর পরে পরিবারের দুই সদস্য একে অপরের কাছে আসছে। কিন্তু মিলন ঠিক হবে কি? কলকাতার
ইন্ডিয়ান সেন্টার ফর স্পেস ফিজিক্সের ডিরেক্টর, বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী সন্দীপ চক্রবর্তী দ্য ওয়ালকে বললেন, দুই গ্রহের সাক্ষাৎকার বলা যাবে না এই ঘটনাকে। বরং বলা যেতে পারে সৌর-পরিবারের দুই সদস্য নিজেদের মধ্যে লুকোচুরি খেলবে। কখনও গায়ে গায়ে, কখনও একটু দূরে। দুর্লভ এই মহাজাগতিক ব্যাপার স্যাপার খালি চোখে দেখলে মনে হবে সৌর-পরিবারের কর্তা গুরু গ্রহ বৃহস্পতি আর শনি মিলেমিশে এক হয়ে গেছে। তবে টেলিস্কোপে সামান্য ফারাক চোখে পড়বে।
যেন বড় মাঠের দুই প্রান্ত ঘুরে এল দু’জনে
মহা-সংযোগ আসলে কী? সৌরমণ্ডলের দুই জাঁদরেল গ্রহকে একই সঙ্গে প্রায় একই সরলরেখায় দেখা চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানী সন্দীপবাবু বললেন, খুব সহজে ব্যাপারটা বোঝানো যায়। ধরা যাক, বড় মাঠ। ক্রিকেট খেলার মাঠের মতো সমান নয় কিন্তু। এবড়ো খেবড়ো, অসমান, উঁচু নিচু মাঠ। এই মাঠের দুই দিক দিয়ে দু’জন খেলোয়াড় ছুটছে। গোল গোল ঘুরে আসছে। একজনের সময় লাগছে ১২ মিনিট, অন্যজনের ২৯ মিনিট। এবার ধরা যাক ক্যামেরায় একটা ফিল্ম রয়েছে। দুজনের ছবি তুলতে হবে। কিন্তু দুজনকে কিছুতেই এক ফ্রেমে ধরা যাচ্ছে না। কারণ দুজনের ছোটার বেগ আলাদা। কখনও একজন উত্তরে, তো অন্যজন দক্ষিণে। একজনে পূর্বে তো অন্যজন পশ্চিমে। পর পর একই ফ্রেমে পেতে গেলে অন্তত ১২-১৩ ঘণ্টা অপেক্ষা করতেই হবে। এমন একটা সময় আসবে যখন দুজনকে একই ফ্রেমে ক্যামেরাতে ধরা যাবে।

এবার এই মিনিটের হিসেবকে যদি বছরে পরিবর্তিত করা যায় তাহলেই ব্যাপারাটা সহজ করে বোঝা যাবে। বৃহস্পতি সূর্যের চারদিকে পাক খেয়ে আসে ১২ বছরে। সূর্যের থেকে গুরু গ্রহের দূরত্ব প্রায় ৭৭ কোটি কিলোমিটারের মতো। সূর্যের থেকে শনির দূরত্ব অনেক বেশি, প্রায় ১.৪৯ বিলিয়ন কিলোমিটার। সূর্যের চারদিকে পাক খেতেও তাই শনির অনেক বেশি সময় লাগে। তার কক্ষপথের পরিধিও বৃহস্পতির থেকে বেশি। একবার প্রদক্ষিণে সময় লেগে যায় প্রায় ২৯ বছর। বৃহস্পতির সময়ের প্রায় দ্বিগুণ। শুধু তাই নয়, এই দুই গ্রহ কিন্তু একই লাইন ধরে ঘুরছে না। তাদের কক্ষপথের অবস্থান আলাদা। দুজনকে তাই একসঙ্গে পাওয়া কার্যত অসম্ভব ব্যাপার। এই মহা-সংযোগকে তাই বিরলতম মহাজাগতিক ঘটনা বলা হচ্ছে।
[caption id="attachment_288746" align="aligncenter" width="970"]
ছবি সৌজন্যে: নাসা[/caption]
সন্দীপবাবু বলছেন, দুই গ্রহকে একই সরলরেখায় দেখা সত্যিই অসম্ভব ব্যাপার। আজ, ২১ ডিসেম্বর দুই গ্রহ পরস্পরের থেকে ০.১ ডিগ্রি বা ৬ মিনিটের ব্যবধানে থাকবে। সূর্যাস্তের ২০ মিনিটের মাথায় সেই মহা-সন্ধিক্ষণ আসবে। শীতের সময় যেহেতু দিন ছোট ও রাত বড়, তাই স্পষ্টভাবে এই সংযোগ খালি চোখেই দেখা যাবে। কিন্তু আজ থেকে ৩৯৭ বছর আগে গ্যালিলিও যে মহা-সংযোগ দেখেছিলেন তা অতটা স্পষ্ট ছিল না। টেলিস্কোপ আবিষ্কারের ১৩ বছর পরে বৃহস্পতি-শনির এই মহা-সংযোগ ধরা পড়েছিল দূরবীক্ষণে। সেটা ছিল ১৬২৩ সালের ১৬ জুলাই। দুই গ্রহ পরস্পরের থেকে ৫ মিনিট ১০ সেকেন্ডের ব্যবধানে ছিল। যেহেতু জুলাই মাস ছিল, দিন বড়, তাই স্পষ্টত সেই সংযোগ বোঝা যায়নি। তারও ৮০০ বছর আগে ১২২৬ সালে এই মহা-সংযোগ ঘটেছিল। তবে তখন টেলিস্কোপ না থাকায় মানুষের চোখে ধরা পড়েনি। কিন্তু সেবারও ১ ডিগ্রি কৌণিক দূরত্বে দুই গ্রহ পরস্পরের কাছে এসেছিল। সেই সংযোগও ছিল এবারের মতোই দুর্লভ।
আজকের মহামিলনের ৬০ বছর পরে ২০৮০ সালে ফের এই মহা-সংযোগ ঘটবে। তবে তখন বৃহস্পতি আর শনি এত কাছাকাছি আসবে না।
বিকেল ৫.২০ তে মহা-সন্ধিক্ষণ, গ্রহ-উপগ্রহ পুঞ্জ ফুটে উঠবে আকাশে
আজ শুধু বৃহস্পতি আর শনি নয়, বৃহস্পতির চার চাঁদ অর্থাৎ চারটি উপগ্রহ এবং শনির চাঁদ অর্থাৎ টাইটান উপগ্রহকেও আকাশে দেখা যাবে। যার মানে হল, বৃহস্পতি, বৃহস্পতির উপগ্রহ, শনি ও তার বলয় এবং শনির উপগ্রহ—সব মিলেমিশে গ্রহ-উপগ্রহ পুঞ্জ দেখা যাবে আকাশে। বিজ্ঞানী সন্দীপবাবু বলছেন, আজ সূর্যও অস্ত যাবে তাড়াতাড়ি। বিকেল ৪.৫৮ মিনিটে। মহা-সন্ধিক্ষণের ক্ষেত্র তৈরি হবে মহাকাশে। গোধুলিবেলায় সূর্যাস্তের ২০ মিনিট পরে কাছাকাছি আসবে বৃহস্পতি আর শনি। খালি চোখে দেখলে মনে হবে দুই গ্রহের মিলন হয়ে একটাই গ্রহ ফুটে উঠেছে আকাশে। তবে টেলিস্কোপে সূক্ষ্ম ফারাকটা ধরা পড়বে। ইন্ডিয়ান সেন্টার ফর স্পেস ফিজিক্সে সাতটা টেলিস্কোপ বসানো হয়েছে বলে জানালেন সন্দীপবাবু। এই টেলিস্কোপগুলিতে দেখা যাবে এই বিরল মহাজাগতিক ঘটনা। সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টা অবধি দেখা যাবে এই সংযোগ। এর পরে দুই গ্রহ দিগন্তের এত কাছাকাছি চলে যাবে যে খালি চোখে আর স্পষ্ট করে দেখা যাবে না। তাছাড়া কলকাতার আকাশে মেঘ, কুয়াশায় ঢাকা পড়ে যাবে এই মহাজাগতিক ঘটনা।

সন্দীপবাবু বলছেন, এই মহাজাগতিক ঘটনায় বিজ্ঞানের থেকেও বেশি রয়েছে জ্যামিতিক সংযোগ। দশদিন আগেও বৃহস্পতি ছিল আকাশের পশ্চিমদিকে, তার একটু পূর্বে ছিল শনি। আজকের ঘটনায় দুই গ্রহ পরস্পর থেকে ৬-৮ মিনিট পিছনে থাকবে। শনি থাকবে ওপরে, বৃহস্পতি নিচে। আগামীকাল আবার এই অবস্থান বদলে যাবে। বিজ্ঞানীর কথায়, শনি আর বৃহস্পতির ক্রসিং চলছে। তাদের অবস্থান বদলাতে থাকবে। তাই এই মহাজাগতির ঘটনাকে দুই গ্রহের সাক্ষাৎকার না হলে লুকোচুরি খেলা বলা যেতে পারে।


ছবি সৌজন্যে: ইন্ডিয়ান সেন্টার ফর স্পেস ফিজিক্স অবজারভেটরি
পৃথিবীর ছাতা, রাগী উল্কা-ধূমকেতু থেকে রক্ষা করে পৃথিবীকে
মহাশূন্যে এক শীতলতম জায়গা আছে। এর দূরত্ব পৃথিবী থেকে প্রায় সাড়ে ৪০০ কোটি কিলোমিটার। সৌরমণ্ডলের বাইরে বলয়ের মতো সেই জায়গা প্রায়ে সাড়ে ৩০০ কোটি কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। একেই বলে কুইপার বেল্ট। এখানে ধুলো আর গ্যাসের ঘনত্ব খুব কম। পাথর আর বরফের টুকরোয় ভরা। নেপচুনের পরেই সৌরমণ্ডলের শেষপ্রান্তে আছে এই গ্যাস ও বরফের স্তর। বলা হয় প্লুটো আসলে এই কুইপার বেল্টের মধ্যেই রয়েছে। ধূমকেতুরা মূলত এই এলাকাতেই ঘাপটি মেরে থাকে। বছরে অন্তত একবার সূর্যকে সেলাম জানাতে আসে। তখনই সূর্যের তেজে এদের শরীরের কিছু অংশ ছিটকে উল্কা হয়ে ঝরে পড়ে পৃথিবীতে। নানা মহাজাগতিক বস্তুর আস্তানাও এই হিমশীতল বরফের রাজ্যে। এখান থেকে মহাজাগতিক বস্তরা তীব্র বেগে ছুটে আসে পৃথিবীর টানে। ধাক্কাধাক্কির উপক্রম হয়। তারা জোর করে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢুকতে চায়। এই রাগী মহাজাগতিক বস্তুদের আটকায় বৃহস্পতি ও শনি। ছাতার মতোই রক্ষা করে পৃথিবীকে। যদি এই দুই গ্রহের সুরক্ষা কবচ না থাকত, তাহলে উল্কা, ধূমকেতুদের সঙ্গে জোর টক্কর বেঁধে যেত পৃথিবীর। চরম সংঘাত হত। পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারত। সন্দীপবাবু বলছেন, এই মহিজাগতিক ঘটনা যেমন একদিকে দুর্লভ, তেমনি চিন্তার কারণও আছে। দুই গ্রহ যদি একই অবস্থানে থাকে তাহলে কিন্তু এই সুরক্ষার স্তরটা থাকবে না। যদি সৌরমণ্ডলের অন্যদিক দিয়ে কোনও উল্কা আছড়ে পড়তে চায়, তাহলে ছাতার মতো দুই গ্রহ সেই সুরক্ষা দিতে পারবে না।