ইডি (ED) যে নথি আদালতে জমা দিয়েছে, সেখানে জীবনকৃষ্ণ সাহার (Jibankrishna Saha) বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ও প্রমাণের উল্লেখ রয়েছে। সেগুলি কী কী?

জীবনকৃষ্ণ সাহা ও মায়ারানি সাহা।
শেষ আপডেট: 28 August 2025 15:06
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি কাণ্ডের (Recruitment Case) তদন্তে বড় পদক্ষেপ করল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)। তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক জীবনকৃষ্ণ সাহাকে (Jibankrishna Saha) গ্রেফতার করেছে ইডি। একই সঙ্গে তাঁর স্ত্রী টগরী সাহা (Tagari Saha) এবং পিসি মায়ারানি সাহাকেও (Mayarani Saha) জেরা করা হয়েছে।
ইডি যে নথি আদালতে জমা দিয়েছে, সেখানে জীবনকৃষ্ণ সাহার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ও প্রমাণের উল্লেখ রয়েছে। সেগুলি কী কী?
ইডির নথি অনুযায়ী, তদন্ত এড়াতে জীবনকৃষ্ণ সাহা তাঁর মোবাইল ফোন নর্দমায় ফেলে দেন। দীর্ঘ তল্লাশির পর ফোনটি উদ্ধার করা হয় তাঁর বাড়ির পিছনের নালা Lsks। ইডির দাবি, এটি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে তদন্তে সহযোগিতা করছেন না এবং প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা করছেন।
নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, একাধিক প্রার্থীর কাছ থেকে চাকরির নামে টাকা নেন জীবনকৃষ্ণ সাহা। সেই টাকা দিয়ে তিনি বিভিন্ন জমি ও বাড়ি কিনেছেন এবং স্ত্রী টগরী সাহার অ্যাকাউন্টেও নগদ টাকা জমা করেছেন।
২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে টগরীর বন্ধন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে একাধিক টাকা জমার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তদন্তে জানা যায়, জীবনকৃষ্ণ ও তাঁর স্ত্রী দু’জনেই সরকারি কর্মচারী এবং তাঁদের অন্য কোনও আয়ের উৎস নেই। ফলে এত টাকার উৎস নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
জিজ্ঞাসাবাদে টগরী স্বীকারও করেছেন যে, স্বামীই তাঁর অ্যাকাউন্টে ওই টাকা জমা করেছিলেন।
এছাড়াও জীবনকৃষ্ণ সাহা নিজের পাশাপাশি স্ত্রীর নাম ও একাধিক সহযোগীর নাম ব্যবহার করে বহু সম্পত্তি কিনেছেন। সহযোগীদের মধ্যে রয়েছেন— মায়া রানি, নিতাই সাহা, রাজেশ ঘোষ এবং গৌর সাহা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্যাশে টাকা দেওয়া হয়েছিল।
জীবনকৃষ্ণ সাহা দাবি করেছিলেন যে, জমি কেনার টাকা এসেছে তাঁর ব্যক্তিগত সঞ্চয় ও বাবার উপহার থেকে। কিন্তু তাঁর বাবা বিশ্বনাথ সাহা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি কখনও ছেলেকে টাকা দেননি এবং তাঁর ব্যবসার সঙ্গে জীবনকৃষ্ণ সাহার কোনও যোগও ছিল না। বরং তিনি স্বীকার করেন যে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অযোগ্য প্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করেছিল তাঁর ছেলে।
ইডি-র তদন্তে একাধিক প্রার্থীর বয়ান নথিভুক্ত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে নবীন মণ্ডল জানিয়েছেন, তিনি ১ লাখ টাকা নগদ দিয়েছেন। রানা মণ্ডল ৮ লাখ টাকা দিয়েছেন দু’দফায়। অমিত বিশ্বাস ও আরিফ ইকবাল যথাক্রমে ১ লাখ ও ৯৫ হাজার টাকা দিয়েছেন। প্রণয়েশচন্দ্র মণ্ডল ১২ লাখ টাকা দিয়েছেন তিন দফায়। সঞ্জিত মণ্ডল জানিয়েছেন, তিনি মোট ১১.৫ লাখ টাকা দিয়েছেন (ব্যাঙ্ক ও নগদ মিলিয়ে)। দীপক দাস ১২ লাখ ও পরে আরও ৫ লাখ টাকা দেন চাকরির জন্য।
এই সমস্ত লেনদেনের প্রমাণ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাওয়া গেছে। ইডি জানিয়েছে, জীবনকৃষ্ণ সাহার অ্যাকাউন্টে ৪৬ লাখ টাকারও বেশি সন্দেহজনক নগদ জমা পাওয়া গিয়েছে।
ইডির দাবি, তল্লাশির সময় তদন্তকারী দল দেখে ছাদ থেকে ঝাঁপিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন জীবনকৃষ্ণ সাহা এবং দু’টি মোবাইল ফোনই লুকোতে যান। একাধিকবার তাঁকে নথি জমা দিতে ডাকা হলেও তিনি হাজিরা দেননি। ২০২৪ সালের ২৩ জুলাই তিনি ইডির কাছে স্বীকার করেছিলেন যে ৫ অগস্ট হাজির হবেন, কিন্তু আর আসেননি।
ইডি-র সহকারী পরিচালক সুমিত রায় জানিয়েছেন, জীবনকৃষ্ণ সাহা জেনে শুনে অপরাধমূলক অর্থ লেনদেনে জড়িত। তিনি অপরাধমূলক উপায়ে অর্জিত অর্থ লুকিয়েছেন, ব্যবহার করেছেন এবং বৈধ আয় হিসেবেও দেখানোর চেষ্টা করেছেন।
তাঁর বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন (PMLA)-এর ধারা অনুযায়ী অপরাধ প্রমাণিত হয়, যা শাস্তিযোগ্য। প্রমাণ নষ্ট করা আটকাতে, অপরাধমূলক অর্থ উদ্ধারের জন্য এবং কাস্টডিয়াল জেরা নিশ্চিত করতে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে।