দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইনফ্লুয়েঞ্জায় বড় হাতিয়ার হয়েছিল এই ড্রাগ। আশ্চর্যের বিষয় করোনা আক্রান্ত রোগীদের উপরেও নাকি এই ড্রাগের প্রভাব সন্তোষজনক। এমনই দাবি করেছেন জাপানের বিজ্ঞানীরা। জাপানি ড্রাগ ‘ফ্যাভিপিরাভির’ (Favipiravir) বা টি–৭০৫ নিয়ে জোরদার গবেষণা চলছে চিন, ইতালিতেও। এই ড্রাগের ব্র্যান্ড নাম হল ‘অ্যাভিগান’ ।
উহান ও শেনঝেনের করোনা আক্রান্ত রোগীরা এই জাপানি ড্রাগের সুফলের কথা বলেছেন। চিনের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রকের শীর্ষ আধিকারিক ঝ্যাং জিনমিন বলেছেন, “এই ড্রাগের সংক্রমণ-প্রতিরোধী ক্ষমতা পরীক্ষায় প্রমাণিত। মানুষের উপর ৩৪০ বার ট্রায়াল হয়েছে এই ড্রাগের। সুরক্ষা ও নিরাপত্তা উচ্চপর্যায়ের। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এখনও ধরা পড়েনি।”
চিন এই ড্রাগের সুফলের কথা বললেও এখনও অ্যাভিগানকে সম্পূর্ণ অনুমোদন করেনি মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। চিন, জাপান, ইতালিতে এই ড্রাগের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে। ম্যাসাচুসেটসের তিনটি হাসপাতালে রোগীদের উপরে এই ড্রাগ প্রয়োগ করা হয়েছে। এই ড্রাগের নির্মাতা সংস্থা ফুজিফিল্ম বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, ম্যাসাচুসেটসের জেনারেল হাসপাতাল, ব্রিঘাম ও ওমেন’স হাসপাতাল এবং ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস মেডিক্যাল স্কুলের ৫০ জন করোনা আক্রান্ত রোগীর উপরে এই ড্রাগের ট্রায়াল হয়েছে।
জাপানের ফুজিফিল্ম টোয়ামা কেমিক্যাল ২০১৪ সালে এই ড্রাগ বানিয়েছিল। নাম ‘ফ্যাভিপিরাভির’ (Favipiravir) বা টি–৭০৫। এই অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগ আরএনএ ভাইরাসের সংক্রমণ কমাতে পারে। ২০১৪ সালে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের প্রকোপ যখন মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছিল, এই ড্রাগ সেই সময় বিজ্ঞানীদের বড় অস্ত্র হয়ে উঠেছিল। এখন বিশ্বজোড়া মহামারী নভেল করোনাভাইরাস। সিওভিডি ১৯ এর সংক্রমণ কমাতেও নাকি অনেকটাই একইভাবে কাজ করছে ফ্যাভিপারিভির। এমনটাই দাবি জাপানি বিজ্ঞানীদের।
কীভাবে কাজ করছে এই অ্যান্টি-ভাইরাল ড্রাগ
বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্যারাজাইকার্বোক্সামাইডের ডেরিভেটিভ হল এই ড্রাগ। পশুদের উপর পরীক্ষা করে এই ড্রাগের সুফল মিলেছে। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস, হলুদ জ্বর, হাত ও পায়ের যে কোনও ভাইরাল ইনফেকশন কমাতে পারে এই ওষুধ। মূলত এই ড্রাগের রাসায়নিক ফর্মুলা আরএনএ (RNA) ভাইরাসের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে পারে। করোনাভাইরাসের বিটা-পরিবারের এই ভাইরাল স্ট্রেন সার্স-সিওভি-২ (SARS-COV-2)সিঙ্গল-স্ট্র্যান্ডেড আরএনএ ভাইরাস। এর স্পাইক প্রোটিন হোস্ট সেল বা বাহক কোষের প্রোটিনের সঙ্গে জোট বেঁধেই কোষে প্রবেশ করছে।

বহুবার জিনের গঠন বদলে বা জেনেটিক মিউটেশনের কারণে এই ভাইরাল স্ট্রেন অনেক বেশি প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। এতবার তার মধ্যে রাসায়নিক বদল হচ্ছে যে এই ভাইরাসকে রোখা সম্ভব হচ্ছে না। আর পাঁচটা সাধারণ ফ্লু ভাইরাসের থেকে তাই অনেক বেশি সংক্রামক হয়ে উঠেছে বিটাকরোনার এই বিশেষ স্ট্রেন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই অ্যান্টিভাইরাল-ড্রাগ ফ্যাভিপিরাভির এই জেনেটিক মিউটেশনটাকেই বন্ধ করে দেবে। জিনের গঠন বদলাতে না পারলে ভাইরাসের আক্রমণাত্মক ক্ষমতাও ধীরে ধীরে কমে যাবে। মানুষের কোষে এই ড্রাগের কোনও টক্সিক-প্রভাব এখনও দেখা যায়নি। আরএনএ বা ডিএনএ সিন্থেসিসেও এই ড্রাগ বাধা দেয় না বলে দাবি বিজ্ঞানীদের। তাই এর ক্ষতিকর কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এখনও দেখা যায়নি।
বস্টন ইউনিভার্সিটির ন্যাশনাল ইমার্জিং ইনফেকশিয়াস ডিজিজ ল্যাবের ভাইরোলজিস্ট জন কোন্নর বলেছেন, এই অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগ আরএনএ ভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করতে পারে এমন দাবি করেছেন জাপান ও চিনের বিজ্ঞানীরা। ক্লিনিকাল ট্রায়াল এখনও চলছে। ভাইরাসের প্রতিলিপি গঠনে কীভাবে বাধা দিচ্ছে এই ড্রাগ, সেটা গবেষণা শেষ হলেই আরও ভালভাবে বোঝা যাবে।
অ্যাভিগানের আবিষ্কর্তা ফুজিফিল্ম জানিয়েছে, ৩১ মার্চ থেকে এই ড্রাগের ট্রায়াল শুরু হয়েছে। এখনও অবধি এর খারাপ প্রভাব দেখা যায়নি। সংক্রামিত রোগীদের উপরেও নাকি কাজ করছে এই ড্রাগ। বুলগেরিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, মায়ানমার, সৌদি আরব, তুরস্ক-সহ ২০টি দেশে এই ড্রাগের ক্লিনিকাল ট্রায়াল চলছে বলে জানিয়েছে জাপান।