দ্য ওয়াল ব্যুরো: "আমি চাই গাছ কাটা হলে শোকসভা হবে বিধানসভায়..." কবীর সুমন তাঁর গানে এ বাক্য লিখেছিলেন আজ থেকে বেশ কয়েক বছর আগে। বলাই বাহুল্য, এ এক নিছক কল্পনার লাইন। গাছেদের জন্য শোকসভা বাস্তবে হয় না। কিন্তু এ কথা সত্যি নয়। বিপুল এই পৃথিবীর সবটুকু আমাদের জানা হয় না। একটি গাছের মৃত্যুতে সত্যি করেই বিশাল এক শোকসভা আয়োজিত হল সুদূর ইকুয়েডরে। সেখানকার কিচওয়া বা কেচুয়া নামের আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষগুলির কাছে গাছটি ছিল ঈশ্বরসম।
প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক চিরকালই খুব নিবিড়। বলা চলে মানুষকে সন্তানের মতোই ধারণ করে ও রক্ষা করে রেখেছে প্রকৃতি মাতা। তবে সারা বিশ্বজুড়ে আমরা অর্থাৎ মনুষ্যপ্রজাতির প্রতিনিধিরা প্রকৃতিকে রক্ষা করতে পারিনি মোটেই। উপরন্তু মুনাফার লোভে নির্বিচারে ধ্বংস করেছি প্রকৃতি। তবে ইকুয়েডরের কেচুয়া সম্প্রদায় গাছ ও প্রকৃতিকে ভালবেসে রীতিমতো দৃষ্টান্ত গড়েছেন। একটি বিশেষ গাছের মৃত্যুতে গোটা অঞ্চল জুড়ে চলেছে শোক পালন। কান্নায় ভেঙে পড়েছেন মানুষজন। কারণ তাঁদের কথায়, "এই গাছই তো আমাদের মা ছিল, আমাদের ঈশ্বর ছিল।"

ইকুয়েডরের এক অখ্যাত পার্বত্য গ্রাম পুকারা অল্টো। সেখানে বসবাসকারী মানুষদের আরাধ্যা দেবতা ছিল একটি গাছ। শুধু দেবতা নয়, এ গাছ ছিল তাদের মায়ের মতো। তাদের অনেক সুখ-দুঃখ-লড়াইয়ের সঙ্গী ও সাক্ষী ছিল গাছটি। কেচুয়া মানুষদের বিশ্বাস, 'পিনকুল টায়টা' নামের সেই গাছটি নাকি হাজার হাজার বছর ধরে তাদের রক্ষা করে এসেছে।

শোনা যায়, গ্রামে কোনও শিশুর মৃত্যু ঘটলে তার দেহ সেই গাছের তলায় সমাহিত করা হতো। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, পিনকুল টায়টা সেই শিশুদের আত্মাকে রক্ষা করত। সম্প্রতি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গাছটি সম্পূর্ণ ভেঙে যায়। আর তাতেই স্থানীয় মানুষদের বিশ্বাস তাদের দেবতার মৃত্যু ঘটেছে।

'মিরাকল ট্রি' বা অলৌকিক গাছ নামে পরিচিত সেই গাছের মৃত্যুতে আয়োজিত হয় শোকসভা। ছোটখাটো জমায়েত নয়, কোনও গণ্যমান্য মানুষের জন্য যেমন আয়োজন করা হয়, তেমনই ছিল এ গাছের শোকসভার আয়োজনও। আশেপাশের গ্রাম থেকে প্রচুর মানুষ উপস্থিত হন সেখানে। এমনকি উপস্থিত ছিলেন সরকারি আমলারাও পর্যন্ত। একটি গাছে কীভাবে মানুষ ও পরিবেশের মাঝে সেতুবন্ধন করতে পারে তা ফুটে ওঠে সেই শোকসভায়।

বহু মানুষকেই কাঁদতে দেখা যায় সেখানে। তাঁরা বলেন, এতদিন রোদ, ঝড়, বৃষ্টি বা যে কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে তাঁদের রক্ষা করেছেন এই বৃক্ষ দেবতা। এই বিশ্বাসের তাগিদেই সেখানকার মানুষ যে কোনও প্রয়োজনে পিনকুল টায়টার শরণাপন্ন হতো।
তাঁরা এখন একটি গাছ নয়, যেন একজন অভিভাবককেই হারিয়ে ফেলেছেন। নিজেদের অনাথ মনে করছেন কেচুয়া সম্প্রদায়ের মানুষজন। স্থানীয় এক শিক্ষক আলবার্তো কাহুয়াস্কুয়ে জানালেন, এই গাছের মৃত্যুতে তিনি ও তাঁর পরিবার শোকাহত। গাছটি তাঁদের কাছে একটি উপাসনালয়ের মতো ছিল বলে তিনি জানান।
তবে এ গাছটির প্রকৃত বয়স কত ছিল, তা নিশ্চিত ভাবে জানা যায়নি। অনেকেই বলেন গাছটি হাজার হাজার বছর ধরে সেখানে ছিল। এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষেরা জানান, তাদের দাদু-ঠাকুমারাও ছোটবেলায় এই গাছটি দেখেছেন। এবং তাঁদের মুখে শোনা যেত, তাঁদের পূর্বপুরুষরাও বহু বিপদ থেকে বেঁচেছেন এই গাছের জন্যই।

আর এক স্থানীয় কেচুয়া মানুষের কাছ থেকে জানা যায়, ২০১৭ সালে গাছটি একটি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল। স্থানীয় মানুষজন সন্ধ্যার পুজোর সময়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে দিয়ে আসে গাছের তলায়। যে কোনও ভাবেই হোক, সেই মোমবাতির আগুন থেকে গাছটির একটি অংশ পুড়ে যায়। স্থানীয়দের মতে, তখনই গাছটি অগ্নিদগ্ধ হওয়ার কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে। সেই ঘটনার পরে গাছটির চারিদিকে একটি ব্যারিকেডও তৈরি করে দেওয়া হয়।
এখন চলে গেল তাঁদের প্রিয় দেবতা। তাঁর শোকসভার আয়োজনের পাশাপাশি গাছটির ডালপালা বিভিন্ন অঞ্চলে পোঁতা হয়েছে। বিশ্বাস আবারও নতুন করে জন্ম হবে গাছটির। শুধু দেবতাকে বাঁচানো নয়, গাছও বাঁচানো হবে এইভাবে। যেখানে যেখানে গাছের অংশ পোঁতা হয়েছে সেখানে সেখানে খাবার ও জলও দিচ্ছেন তাঁরা।

গোটা পৃথিবী জুড়ে ধ্বংস করা হচ্ছে জঙ্গল। নষ্ট করা হচ্ছে বন্য প্রাণীর বাসস্থান। যার ফলে ব্যাপকভাবে জলবায়ুর পরিবর্তন চোখে পড়ছে। সেই একই সময়ের বুকে দাঁড়িয়ে একটি গাছের প্রতি ইকুয়েডরের এই ছোট্ট গ্রামের মানুষগুলির ভালবাসা ও শ্রদ্ধা যেন গোটা পৃথিবীর কাছেই শিক্ষনীয় একটি বিষয়।