
শেষ আপডেট: 13 May 2023 15:38

শনিবার কর্নাটকে বিধানসভা ভোটের (Karnataka Assembly Election) ফলফল প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রতিবেদন যখন লেখা হচ্ছে, তখন দেখা যাচ্ছে বিজেপিকে (BJP) ধরাশায়ী করে বিপুল জয়ের দিকে এগোচ্ছে কংগ্রেস। সাবেক জাতীয় দলের কাছে নিঃসন্দেহে এটা একটা বড় সাফল্য। গত প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে কংগ্রেসের (Congress) নির্বাচনী সাফল্যে যে খরা দেখা যাচ্ছে, তাতে মরুভূমির মধ্যে এক ঘড়া জল। কারণ, কংগ্রেস শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেনি, বিজেপির দ্বিগুণেরও বেশি আসনে জিততে চলেছে।
খুব স্বাভাবিকভাবেই এই পরিস্থিতিতে বড় প্রশ্ন উঠে গিয়েছে, বিজেপির এই পরাজয় কি স্রেফ ইয়েদুরাপ্পা বা বোম্মাইদের হার? নাকি এটা নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদীরও (Narendra Modi) বড় পরাজয় (defeat)? কারণ, এই কর্নাটক নির্বাচনে আমরা দেখেছি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভোট প্রচারকে কতটা অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কম বেশি প্রায় ২০টি জনসভা করেছেন তিনি, রোড শো করেছেন। শুধু তা নয়, এই প্রথম বার কোনও রাজ্যের ভোটের প্রচারের জন্য সেখানে গিয়ে টানা তিন দিন পড়ে থেকেছেন। মণিপুরে যখন জাতি দাঙ্গার ঘটনা ঘটছে তখন বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছেন, প্রধানমন্ত্রী সেদিকেও একবার তাকাচ্ছেন না। শুধু কর্নাটক আর কর্নাটক!
ফলে এদিন ভোটের ফল প্রকাশ হতেই কংগ্রেস, তৃণমূল, এনসিপি, ডিএমকে, উদ্ধব ঠাকরের মতো দল বলতে শুরু করে দিয়েছে মোদীর পতন শুরু। চব্বিশের ভোটে দিল্লি থেকে উৎখাত হওয়া স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। মানুষ নরেন্দ্র মোদীর অপশাসন, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও উগ্র হিন্দুত্বের রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করতে শুরু করেছে।
এটা ঠিক যে, কর্নাটকে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা তৈরি হয়েছিল। পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতির অভিযোগ ছিল গেরুয়া সরকারের বিরুদ্ধে। ডবল ইঞ্জিন সেখানে কার্যত ফেল করেছে। নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহরা শাক দিয়ে সেই মাছ ঢাকার চেষ্টা করেছিলেন। গত এক বছরের কর্নাটকের রাজনীতি দেখলে স্পষ্ট নজরে পড়বে হিজাব, হালাল, বোরখা, আজান, বজরংবলি নিয়ে বিতর্ক। অর্থাৎ উগ্র হিন্দুত্বের ন্যারেটিভ তৈরি করতে চেয়েছিল বিজেপি। কিন্তু দেখা গেল, প্রশাসনিক ব্যর্থতা সে সব দিয়ে ঢাকা গেল না। অনেকের মতে, মানুষকে আর বোকা বানানো গেল না।

এমন নয় যে এই ন্যারেটিভ বিজেপি শুধু কর্নাটকে তৈরি করতে চেয়েছে। চব্বিশ সালে লোকসভা ভোট আসছে। তার আগে বিরোধীরা যখন রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম, বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি, গ্রামে ক্রয় ক্ষমতা কমে যাওয়া, সামাজিক ক্ষেত্রে বরাদ্দ কমানোর মতো বিষয় উত্থাপন করছে, তখন বিজেপি রয়েছে ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ বা দ্য ‘কেরালা স্টোরি’তে। অর্থাৎ উগ্র হিন্দুত্ব ও জাতীয়তাবাদের ন্যারেটিভে। দশ বছর আগে নরেন্দ্র মোদী যে আচ্ছে দিনের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, কৃষকদের আয় দ্বিগুণ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, দেশে পরিকাঠামো ক্ষেত্রে বিপ্লব আনার কথা বলেছিলেন বা মেকিং ইন্ডিয়া করে ভারতে উৎপাদন ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আনার কথা বলেছিলেন, তা নিয়ে বিতর্কে ঢুকতে চাইছেন না নরেন্দ্র মোদী বা অমিত শাহ। কিংবা এও বলছেন না, তাঁদের জমানায় গৌতম আদানির মতো সংস্থার উল্কার মতো উত্থানের রহস্য কী? তাঁদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তুলেছে হিন্ডেনবার্গ, তা সত্যি না মিথ্যে।
বরং এ সব প্রশ্ন তুললেই বিজেপি বলছে, ভারতকে আক্রমণ করা হচ্ছে। দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। নরেন্দ্র মোদীকে অপমান করা হচ্ছে। শুধু তা নয়, এই ব্যর্থতার বিষয়গুলি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ভারতের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদীকে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ মোদী আক্রান্ত মানে ভারত আক্রান্ত।
এখন সেই কোটি টাকার প্রশ্ন। তা হল, ২০২৪ সালে কী হতে পারে?
গোড়াতেই বলে রাখা ভাল যে, আমি গণৎকার নই। রাজনীতি নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন, তাঁরা দেশ কাল পরিস্থিতি বিচার করে কিছু আন্দাজ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু দ্য ওয়াল-এর নিরপেক্ষতা বজায় রাখার বিষয়টি আমার কাছে বহুমূল্যবান। তাই কোনও আন্দাজের মধ্যে যাওয়ার বাসনাও নেই।
একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, রাজ্যের ভোটের সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনের তুলনা করা যাবে না। গত দশ বছরে একটা ধারা বার বার প্রমাণিত হয়েছে যে, নরেন্দ্র মোদীর মুখ দিয়ে রাজ্যের ভোটে জেতা যাচ্ছে না। ২০১৫ সালে তা বিহারে হয়েছে, পরে ঝাড়খণ্ডে, পশ্চিমবঙ্গে, দিল্লিতে, হিমাচলে, পাঞ্জাবে, তেলঙ্গনায়, অন্ধ্রপ্রদেশেও তা হয়েছে। আবার রাজ্যের ভোটে নরেন্দ্র মোদী ম্যাজিক কাজ করেনি মানে, সর্বভারতীয় স্তরে মোদীর ক্যারিশ্মা দুর্বল হয়ে গিয়েছে, ভাবলেও ভুল হবে। কারণ, ওই সব ভোট ব্যর্থতার পরেও উনিশের লোকসভা ভোটে মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি ড্যাং ড্যাং করে জিতেছে।
২০১৮ সালেও কর্নাটকে ভোটের পর সেখানে কংগ্রেস-জেডিএস সরকার গঠন করেছিল। বিজেপির আগ্রাসনের সামনে সেই সরকার টিকতে পারেনি ঠিকই। কিন্তু উনিশের লোকসভা ভোটের আগে হিন্দিবলয়ের তিনটে মুখ্য রাজ্য রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তীসগড়ে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিকে পরাস্ত করেছিল রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে থাকা কংগ্রেস। কিন্তু দেখা যায়, লোকসভা ভোটে সেই সব রাজ্যেই উল্টো ফল হয়। বিজেপি ফের স্যুইপ করে।
সুতরাং শনিবার কর্নাটকে যে ভোটের ফল ঘোষণা হয়েছে তা দিয়ে চব্বিশের অনুমান এখনই করা ঠিক হবে না। তবে হ্যাঁ, বিজেপি অবশ্যই একটা ধাক্কা খেয়েছে। আর কংগ্রেস প্রবল উৎসাহ পেয়েছে। চব্বিশের ভাল করতে হলে এই উৎসাহকে তথা এই গতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে কংগ্রেস মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তীসগড়ে জিততে পারে কিনা তা দেখতে হবে। ২০১৪ সালে লোকসভা ভোটের পর একপ্রকার দিশাহীনতা কাজ করছিল কংগ্রেসের মধ্যে। কারণ, কংগ্রেস নেতৃত্ব তথা রাহুল গান্ধী দলের কর্মীদের কোনও কর্মসূচি দিতে পারেননি। প্রায় ৮ বছর পর রাহুল ভারত জোড়ে যাত্রা নামে প্রথম কোনও কর্মসূচি দিতে পেরেছিলেন দলকে। কর্নাটক ভোটে সেই যাত্রার প্রভাব অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু ঠিক যে কর্নাটক রাহুলের সামনে চ্যালেঞ্জ আরও বাড়িয়ে দিল। বাড়াল প্রত্যাশাও। এই দক্ষিণী জয়ের কেতন নিয়ে তাঁকে ও কংগ্রেসকে আরও সাফল্য দেখাতে হবে। পারলে ছুটা হলেও উত্তরপ্রদেশে জমি পুনরুদ্ধার করতে হবে। কারণ মনে রাখতে হবে, লোকসভার অর্ধেক আসনে বিজেপির লড়াইটা সরাসরি কংগ্রেসের সঙ্গে।
শুধু তা নয়, বিজেপি যে কর্নাটকে হেরেছে তা কমবেশি শক্তি দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস, এনসিপি, উদ্ধব ঠাকরে, চন্দ্রশেখর রাও, এমকে স্ট্যালিন, অখিলেশ যাদব, অরবিন্দ কেজরিওয়ালদেরও। চব্বিশের ভোটে বিজেপির বিরুদ্ধে তাঁরা কতটা প্রাচীর গড়ে তুলতে পারেন, তাঁদের নিজ নিজ রাজ্যে কতটা সাফল্য দেখাতে পারবেন সেটাও দেখার।
এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই যে কর্নাটকের পরাজয়ের পর নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহরা ফের ড্রয়িং বোর্ডে বসবেন। কোথায় ভুল হল, কী কৌশল নিতে হবে তা স্থির করতে মাথা লাগাবেন। হতে পারে চব্বিশের ভোটের আগে মেরুকরণ তথা উগ্র হিন্দুত্ব ও জাতীয়তাবাদের রাজনীতি আরও তীব্র করতে চাইবে বিজেপি। কংগ্রেস ও বিরোধীরা সেই ফাঁদে পা দিয়ে কোনও ভুল করে বসে কিনা সেও দেখার।
আরও একটা ব্যাপার এর পরেও থেকে যায়। তা হল নরেন্দ্র মোদী। এটা ঠিক যে দশ বছর দেশ শাসন করার পর তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এও ঠিক বিজেপি যে মজবুত নেতৃত্ব তথা ডিসাইসিভ লিডারশিপের কথা বলে নরেন্দ্র মোদীকে সামনে রাখে, তার বিকল্প এখনও বিরোধী শিবির দেখাতে পারেনি। সেদিক থেকে এখনও অ্যাডভান্টেজেই রয়েছেন তিনি।
সব মিলিয়ে আজ শুধু এটুকুই বলা যেতে পারে যে, চব্বিশের লড়াই হয়তো আর এক পেশে হবে না। তার রসায়ন হবে জমজমাট। যাঁরা রাজনীতির এই ওঠানামায় প্রতিমুহূর্তে নজর রাখেন, তাতে মজা পান, তাঁরা আগামী এক বছর অনেক রসদ পাবেন।