দ্য ওয়াল ব্যুরো: ৭০ বছরের বুড়ো হাতি তিকিরিকে বাঁচানো যায়নি। তবে ৬৫ বছরের রাজাকে বাঁচাতে কোনও কসুর করে না শ্রীলঙ্কার সরকার। তার মেজাজও রাজার মতোই। দু’পাশে দুই দেহরক্ষী ছাড়া এই হাতিকে কোনওদিন একা রাস্তায় দেখা যায়নি। শীতের রাতে তার একটু হাওয়া খাওয়ার ইচ্ছা হলে, তুরন্ত চলে আসে পুলিশ ফোর্স। পাহারা ২৪ ঘণ্টার।
নাদুঙ্গামুয়া রাজা। শ্রীলঙ্কার ক্যান্ডিতে ভগবান বুদ্ধের সবচেয়ে ঐতিহ্যশালী টুথের মন্দিরের (Temple Of Tooth) অন্যতম সম্পদ নাদুঙ্গামুয়া রাজা। মন্দিরের হাতিশালের সেরা হাতিও সে। উচ্চতায় সাড়ে ১০ ফুট এই দাঁতাল এখন দেশের ‘Tallest Tusker’। ক্যান্ডির
‘শ্রী ডালাডা পেরাহারা’ বা ‘এসালা পেরাহারা’ উৎসব তাকে ছাড়া ভাবাই যায় না।
কিন্তু দেহরক্ষী নিয়ে ঘোরে কেন রাজা?
মন্দির কর্তৃপক্ষ তো বটেই, সরকারি আধিকারিকরাও রাজার সুরক্ষায় সদাই তৎপর। হর্ষ ধর্মবিজয় নামে এক সরকারি আধিকারিক বলেছেন, প্রথমে এতটা নিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল না। এই দেহরক্ষীর ব্যাপারটা শুরু হয় ২০১৫ সালের পর থেকে। একটি মোটরবাইক প্রায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে হাতির মুখোমুখি এসে পড়ে। যে কোনও মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটতে পারত।
হর্ষ জানিয়েছেন, সরকারি ভাবে ঘোষণা না করা হলেও, বেসরকারি ভাবে রাজা দেশের জাতীয় সম্পদ। বৌদ্ধ ধর্মের সবচেয়ে বড় উৎসব ‘এসালা পেরাহারা’য় মুখ্য ভূমিকা থাকে রাজার। তার গায়ে আঁচ এলে, মন্দির কর্তৃপক্ষের রোষের মুখে পড়তে হবে সরকারকে। তাই এত নিরাপত্তার বাঁধুনী।
প্রতি বছর জুলাই এবং অগস্টে ক্যান্ডি সেজে ওঠে ‘এসালা পেরাহারা’ উৎসবে। টুথের মন্দির থেকে শোভাযাত্রা করে বের হয় বিরাট মিছিল। আলোয় সেজে ওঠে গোটা শহর। এই মিছিলের অন্যতম আকর্ষণ হাতি। রাজকীয় ঝলমলে পোশাকে সাজিয়ে তারা প্যারেড করে শহরজুড়ে। এই হাতিদের নেতৃত্ব দেয় নাদুঙ্গামুয়া রাজা। তার পিঠে বসানো থাকে বুদ্ধের মূর্তি। মন্দিরের পূজারীদের কাছে সে ঈশ্বরের দূত।
'এসালা পেরাহারা' নিয়ে বিতর্ক
শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম বড় উৎসব 'এসালা পেরাহারা' নিয়ে ইদানীং বিতর্ক শুরু হয়েছে নানা মহলে। বর্ষার দেবতাকে তুষ্ট করার জন্যই তৃতীয় শতকে শুরু হয়েছিল
‘শ্রী ডালাডা পেরাহারা’। তখন এই উৎসব ছিল বর্ষামঙ্গল। পরে তার নাম হয়
'এসালা পেরাহারা' । মনে করা হয় চতুর্থ শতকে ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় গিয়েছিলেন ভগবান বুদ্ধ। তাঁকে স্বাগত জানানোর জন্য বিরাট শোভাযাত্রা করে আগমনী উৎসব পালন করা হয়। সেই থেকেই এই রেওয়াজ চলে আসছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে।

এই উৎসবে হাতিদের প্যারেড করানোর রীতিও বহু প্রাচীন। শ্রীলঙ্কার যে কোনও উৎসবেই হাতির একটা বিশেষ ভূমিকা থাকে। তবে তিকিরির মৃত্যুর পরে এই হাতিদের পিঠে ভারী জিনিসপত্র চাপিয়ে তাদের দিয়ে মিছিল করানোর রীতির বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ মহল। অগস্টে উৎসব চলাকালীনই রুগ্ন, শীর্ণকায় তিকিরির ছবি সামনে এনেছিল ‘সেভ এলিফ্যান্ট ফাউন্ডেশন’। বলা হয়েছিল, শ্রীলঙ্কায় যেখানে হাতিদের বিশেষ নিরাপত্তা দেওয়া হয়, প্রতিপালন করা হয়, দলছুট বা অনাথ হাতিদের জন্য বিশেষ সংরক্ষণ কেন্দ্র
'পিন্নাওয়ালা এলিফ্যান্ট অরফ্যানেজ' Pinnawala Elephant Orphanage রয়েছে, সেখানে একটি ৭০ বছরের বুড়ো হাতির উপর এমন নির্যাতন কেন। ধর্মের দোহাই দিয়ে একটি বন্যপ্রাণকে ইচ্ছামতো নিজেদের কাজে লাগানো আইনত অপরাধ। “digestive ailment” নামে রোগের শিকার হয়ে তিকিরি মারা যাওয়ার পর সেই বিতর্ক তুঙ্গে ওঠে।
[caption id="attachment_145558" align="aligncenter" width="600"]
৭০ বছরের বুড়ো হাতি তিকিরি[/caption]
তর্ক-বিতর্কের মুখে ফেসবুক-সহ সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়ায় নাদুঙ্গামুয়া রাজার ছবি দিয়ে উৎসব কর্তৃপক্ষের তরফে জানানো হয়, তিকিরির মৃত্যু অনিচ্ছাকৃত। ঈশ্বরের কাজ করতে গিয়েই তার আত্মা মুক্তি পেয়েছে। তবে রাজার সুরক্ষা অনেক বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তার দেখভালও করা হচ্ছে যত্ন সহকারে। শ্রীলঙ্কায় হাতিদের সম্মান দেওয়া হয়, নাদুঙ্গামুয়া রাজাই তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ।
পড়তে ভুলবেন না
