দ্য ওয়াল ব্যুরো: মেসেঞ্জার আরএনএ সিকুয়েন্স দিয়ে তৈরি ভ্যাকসিন মানুষের শরীরে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ও নিরাপদ। করোনাভাইরাস প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি করছে মানুষের শরীরে। প্রথম পর্যায়ের ফাইনাল রিপোর্ট সামনে এনে দাবি করল মার্কিন ফার্মা জায়ান্ট মোডার্না বায়োটেকনোলজি।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকসিয়াস ডিজিজের ডিরেক্টর এবং হোয়াইট হাউসের মুখ্য স্বাস্থ্য উপদেষ্টা এপিডেমোলজিস্ট অ্যান্থনি ফৌজির তত্ত্বাবধানে মেসেঞ্জার আরএনএ তথা এমআরএনএ (mRNA)সিকুয়েন্সকে কাজে লাগিয়ে আরএনএ টেকনোলজিতে করোনার টিকা তৈরি করেছে মোডার্না। প্রথম পর্যায়ের ট্রায়াল শুরু হয় মার্চ মাসে। প্রথম ভ্যাকসিন দেওয়া হয় দুই সন্তানের মা ৪৩ বছরের জেনিফার হ্যালারকে। এই ট্রায়ালের রিপোর্ট সন্তোষজনক ছিল বলেই দাবি করেছিলেন মোডার্নার ভাইরোলজিস্টরা। দ্বিতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল শুরু হয় মে মাসে। আগামী ২৭ জুলাই থেকে তৃতীয় পর্যায়ের ভ্যাকসিনের ট্রায়াল শুরু করবে মোডার্না।
https://twitter.com/moderna_tx/status/1283149692587708417
মোডার্নার চিফ একজিকিউটিভ অফিসার স্টিফেন ব্যানসেল বলেছেন, এমআরএনএ সিকুয়েন্সকে কাজে লাগিয়ে তৈরি এই ভ্যাকসিনের নাম
এমআরএনএ-১২৭৩ (mRNA-1273)। এই ভ্যাকসিন তৈরি হচ্ছে
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকসিয়াস ডিজিজ (NIAID)-এর
ভ্যাকসিন রিসার্চ সেন্টারের (VRC) বিজ্ঞানীদের তত্ত্বাবধানে।
মার্চ মাসে প্রথম ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছিল ৪৫ জন প্রাপ্তবয়স্ক স্বেচ্ছাসেবককে। তাঁরা এতদিন পর্যবেক্ষণে ছিলেন। স্টিফেন বলেছেন, প্রত্যেকের শরীরেই আরএনএ ভাইরাসের প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও আগের থেকে বেড়েছে। ‘নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন’-এ এই গবেষণার রিপোর্ট সামনে এনেছে মোডার্না।
https://twitter.com/moderna_tx/status/1283023812326563840
মোডার্নার এমআরএনএ-১২৭৩ ভ্যাকসিন ক্যানডিডেট
২০১০ সাল থেকে পথ চলা শুরু মোডার্নার। মার্কিন সরকারের ডিফেন্স অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রোজেক্ট এজেন্সি (DARPA)-র অনুমোদনপ্রাপ্ত এই সংস্থা জানিয়েছে, প্রথম আরএনএ টেকনোলজি ব্যবহার করে করোনার ভ্যাকসিন ক্যানডিডেট ডিজাইন করেছে মোডার্না। এমআরএনএ হল শরীরের বার্তাবাহক। এর কাজ কোন কোষে প্রোটিন তৈরি হচ্ছে, কোথায় কী রাসায়নিক বদল হচ্ছে সবকিছুর জিনগত তথ্য বা ‘জেনেটিক কোড’ জোগাড় করে সেটা শরীরের প্রয়োজনীয় জায়গায় পৌঁছে দেওয়া। এমন বার্তাবাহক এমআরআনএ-কেই ভ্যাকসিন তৈরির ভিত হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। এই ভ্যাকসিনের কাজ হবে শরীরের কোষগুলিকে অ্যান্টি-ভাইরাল প্রোটিন তৈরি করতে উৎসাহ দেওয়া।

বিজ্ঞানীরা বলেছেন, সার্স-কভ-২ ভাইরাল প্রোটিনের আরএনএ স্ট্রেন দিয়ে তৈরি হয়েছে এই ভ্যাকসিন ক্যানডিডেট mRNA-1273। এই ভ্যাকসিন মানুষের দেহকোষে ঢুকে করোনাভাইরাসের মতো প্রোটিন তৈরি করার নির্দেশ দেবে। সেই প্রোটিনের বাইরে খোলসটা হবে ঠিক সার্স-কভ-২ ভাইরাল স্ট্রেনের মতোই। অথচ করোনার মতো অতটা সংক্রামক নয়। দেহকোষ তখন এমন ধরনের প্রোটিন দেখে তার প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি করবে। শুধু তাই নয়, শরীরের মেমরি বি-সেল এই ধরনের প্রোটিনকে শনাক্ত করেও রাখবে।
কীভাবে এগিয়েছে ভ্যাকসিনের ট্রায়াল
মোডার্না জানিয়েছে, প্রথম পর্যায়ে (ফেজ-১) কম সংখ্যক মানুষের শরীরে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছিল। ৪৫ জন স্বেচ্ছাসেবককে তিনটি দলে ভাগ করে তিন রকমের ডোজে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। তাঁদের বয়স ১৮ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে।
২৫ মাইক্রোগ্রাম, ১০০ মাইক্রোগ্রাম ও ২৫০ মাইক্রোগ্রাম ডোজে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। ২৮ দিনের ব্যবধানে এই তিনরকমের ডোজের দুটি করে শট দেওয়া হয় স্বেচ্ছাসেবকদের। ২৫ মাইক্রোগ্রামের ভ্যাকসিনের ডোজ দেওয়া হয় ১৩ জনকে, ১০০ মাইক্রোগ্রামের ডোজ দেওয়া হয় ১৫ জনকে এবং ২৫০ মাইক্রোগ্রামের ভ্যাকসিনের ডোজ দেওয়া হয় ১৪ জনকে। বাকি তিন জনকে আরও বেশি ডোজের শট দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছিল। তাদের সামান্য জ্বর, মাথাব্যথা, ঝিমুনিভাব দেখা যায়।
ওয়াশিংটন হেলথ রিসার্চ ইনস্টিটিউটে এই ট্রায়ালের দায়িত্বে থাকা গবেষক ডক্টর লিজা জ্যাকশন জানিয়েছেন, ভ্যাকসিন দেওয়ার পর কারও শরীরেই মারাত্মক কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। এই ট্রায়ালের রিপোর্টের ভিত্তিতেই দ্বিতীয় পর্যায়ে ১০০ মাইক্রোগ্রাম ভ্যাকসিনের ডোজের ট্রায়াল চলছে। ১২০ জনকে দেওয়া হচ্ছে ভ্যাকসিন। তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়ালে প্রায় ৩০ হাজারজনকে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।