দ্য ওয়াল ব্যুরো: মাঝে দূরত্ব হাতকয়েক। দাউদাউ করে জ্বলছে একটা এসইউভি। তার থেকে কিছু দূরে প্রায় পুড়ে ছাই আর একটা গাড়ি। ভাঙা জানলার কাচের ভিতর দিয়ে বেরিয়ে আছে একটা হাত। রক্তাক্ত। ছাইয়ে মাখামাখি। ফ্যাকাশে হাতটার আঙুলে একটা বড় লাল আংটি। এই আংটি অতি পরিচিত। ছোটখাটো চেহারার, শক্তপোক্ত গড়নের সেই মানুষটার হাতে বরাবর দেখা গিয়েছে। তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা কাসেম সোলেমানি। ভারতীয় সময় শুক্রবার ভোররাতে বাগদাদ বিমানবন্দরের বাইরে মার্কিন ড্রোন হামলায় উড়ে গিয়েছিল যে দুটি গাড়ি, তার একটির ভিতর ছিলেন জেনারেল কাসেম সোলেমানি ও ইরাকি জঙ্গি সংগঠনের উপ-প্রধান আবু মহদি আল-মুহান্দিস। অন্য গাড়ির ভিতরে সোলেমানির দেহরক্ষীরা।
বাগদাদ বিমানবন্দরের বাইরে ড্রোন হামলার পরেই জাতীয় পতাকার ছবি টুইট করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কাসেম সোলেমানির মৃত্যুর খবর পেন্টাগন সামনে আনার আগেই ইরাকের সেনাবাহিনী ও ইরাকি টিভি চ্যানেলগুলিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর খবর জানিয়ে দেওয়া হয়। পেন্টাগনের তরফে ঘোষণা করা হয় মার্কিন নাগরিকদের উপর লাগাতার নির্যাতন বন্ধ করতেই ‘জঙ্গি নেতা’ সোলেমানিকে ট্রাম্পের নির্দেশে হত্যা করা হয়েছে। ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ড কোরের মেজর জেনারেল তথা কুদস বাহিনীর প্রধানের এমন নির্মম মৃত্যু ততক্ষণে ক্ষোভের গনগনে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে গোটা ইরানে। সেইসঙ্গে চেপে বসেছে ফের মার্কিন ড্রোন হামলার আশঙ্কাও। একদিকে সোলেমানির মৃত্যুশোক, অন্যদিকে ইরানের জায়গায় জায়গায় তখন জারি হয়েছে চূড়ান্ত সতর্কতা।
আল-মুহান্দিসকে নিয়ে দামাস্কাসে বৈঠকে ব্যস্ত সোলেমানি, চুপি চুপি হামলার ছক কষল পেন্টাগন
বৃহস্পতিবার রাত। দামাস্কাসে তখন জরুরি বৈঠক চলছে। সোলেমানির সঙ্গে গোপন আলোচনায় ইরানের মদতপুষ্ট ইরাকের ভাড়াটে সেনাবাহিনীর প্রধান আবু মহদি আল-মুহান্দিস। ইরানে বারবারই মার্কিন সেনার অতর্কিত ড্রোন হামলার মোকাবিলা, ইরানের অর্থনৈতিক বিপর্যয়, বাড়তে থাকা বেকারত্ব—একাধিক বিষয় উঠে এসেছিল সেই বৈঠকে। সূত্রের খবর, মার্কিন আধিপত্য খর্ব করার প্রসঙ্গই ছিল সেই বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয়। অত্যন্ত গোপন এই বৈঠকের খবর কীভাবে পেন্টাগনের অন্দরে পৌঁছেছিল সেটা এখনও রহস্য।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, ইরানের পরমাণু-চুক্তি ছেড়ে বেরিয়ে আসা, পশ্চিম এশিয়ার সোলেমানি বাহিনীর আধিপত্য বাড়ানোর চেষ্টা, সব কিছুই ক্রমশ চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিল আমেরিকার। ইরাক, আরব, প্যালেস্তাইন, ইজরায়েল—গোটা পশ্চিম এশিয়াতেই চষে বেড়াতেন সোলেমানি। বাগদাদে ইরানপন্থী বিক্ষোভকারীরা মার্কিন দূতাবাস ঘেরাও করার পর থেকেই সোলেমানির গতিবিধি নজরবন্দি করা শুরু হয়। বৃহস্পতিবার প্রাইভেট চার্টার্ডে চেপে সোলেমানির দামাস্কাসে যাওয়া এবং শুক্রবার মাঝরাতে বাগদাদ বিমানবন্দরে ল্যান্ড করা—সবটাই ছিল আমেরিকান এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনের নজরদারিতে। হামলার ছক কষা হয়েছিল তার বহু আগে থেকেই। দেহরক্ষী পরিবেষ্টিত কাসেম সোলেমানি ও আল-মুহান্দিসের বিমানবন্দরের বাইরে পা রাখা শুধু সময়ের অপেক্ষা ছিল মাত্র।
এসইউভিতে উঠলেন ইরানের ‘শ্যাডো কম্যান্ডার’, পরপর ধেয়ে এল দু’টি মিসাইল
বাগদাদের বিমানবন্দরে সোলেমানির চার্টার্ড ল্যান্ড করে মাঝরাতে। বিমানবন্দরের ভিতরেই বেশ কিছুটা সময় কাটিয়েছিলেন সোলেমানি, মুহান্দিস ও তাঁর দেহরক্ষীরা। ভোরের আলো তখন সবে ফুটছে। বিমানবন্দরের বাইরে পা রাখলেন সোলেমানি। তাঁর পাশে মুহান্দিস। পিছনে দেহরক্ষীরা। এই অভিযানের পুরোটাই হয়েছিল খুবই গোপনে। বিমানবন্দরের বাইরে তাঁদের নিয়ে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল দু’টি এসইউভি। প্রথম এসইউভিতে ওঠেন সোলেমানি ও মুহান্দিস। অন্যটিতে তাঁর দেহরক্ষীরা।

বিমানবন্দর চত্বর পেরিয়ে গাড়ি এগোতে শুরু করে। অপেক্ষাকৃত নির্জন, যেখানে লোকজন কম, ইরাকি অফিসাররাও নেই এমন জায়গাই বেছে নেওয়া হয় ড্রোন হামলার জন্য। সোলেমানির এসইউভিতে পরপর হামলা চালায় দু’টি মার্কিন ড্রোন। বিকট বিস্ফোরণে উড়ে যায় গাড়ি। প্রথম বিস্ফোরণের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দ্বিতীয় বিস্ফোরণ। তৃতীয় মিসাইলটি সোলেমানির দেহরক্ষীদের গাড়ি লক্ষ্য করে ছোড়া হয়। দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে আগুন। কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় চারপাশ। জমা হয় ছাইয়ের পাহাড়। ছাইয়ের গাদায় মেলে লাল আংটি পরা সোলেমানির কাটা হাত, ছিন্নভিন্ন দেহ। সোলেমানি, তাঁর পরামর্শদাতা আল-মুহান্দিস ও মৃত্যু হয় আরও ন’জনের।
আমেরিকার কাছে যিনি ‘জঙ্গি নেতা’, তিনিই ছিলেন ইরানের সেকেন্ড-ইন কম্যান্ড
ইরান বিপ্লবের পরে ১৯৭৯ সালে আইআরজিসিতে যোগ দেন কাসেম সোলেমানি। একজন রক্ষী হিসেবেই সামরিক জীবন শুরু হয়েছিল তাঁর। পশ্চিম আজারবাইজান প্রদেশের কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহ দমনেও অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৮০ সালে সাদ্দাম হুসেনের সময়ে, ইরান-ইরাক যুদ্ধে কেরমানের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছিলেন তিনি। নব্বইয়ের দশকে তিনি কেরমান প্রদেশে আইআরজিসির কম্যান্ডার ছিলেন। ১৯৯৮ সাল থেকে কুদস বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়া শুরু করেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা, ধর্মগুরু আয়াতুল্লাহ আলি খোমেইনির পরে তাঁর স্থান ছিল বলে অনেকে মনে করেন। ইরানের পূর্ব সীমান্তে তালিবানি সন্ত্রাস দমন করেছিলেন শক্ত হাতে। ২০১১ সাল থেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হন কাসেম সোলেমানি। কুদস বাহিনীর প্রধান আড়ালে ইরানের সেনাপ্রধান হিসেবেই পশ্চিম এশিয়ায় শক্তি বাড়িয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর মদতেই সিরিয়ার বাশার আল আসাদ সরকার আইএস দমনে সফল হয়েছিল।

আমেরিকার অভিযোগ ছিল, মধ্যপ্রাচ্যে লেবাননের হিজবুল্লাহ অভিযান ও ফিলিস্তিনি ইসলামি জিহাদের মতো যুক্তরাষ্ট্রের চিহ্নিত সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা ও সমর্থন করে সোলেমানি পরিচালিত ইরানের কুদস বাহিনী। এইসব সংগঠনগুলিকে অর্থ, যুদ্ধের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করতেন সোলেমানি। সোলেমানি ও মুহান্দিসের বাহিনী ইরাকে সরকার-বিরোধী আন্দোলনকে বহু দিন ধরেই মার্কিন চক্রান্ত বলে চালানোর চেষ্টা করছিলেন। ড্রোন হামলার পরে তাই মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব মার্ক এস্পার বলেন, মার্কিন নাগরিকদের সোলেমানি বাহিনীর নির্যাতন থেকে রক্ষার জন্যই এই হামলা চালানো হয়েছে।
সোলেমানির মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয় শোক জারি হয়েছে ইরানে। পোস্টার, ব্যানার হাতে কয়েক লক্ষ মানুষ সামিল হয়েছেন পদযাত্রায়। মুখে আমেরিকা-বিরোধী স্লোগান। কুদস বাহিনীর পরবর্তী প্রধান হিসেবে সোলেমেনির ডেপুটি ইসমাইল কানির নাম ঘোষণাও হয়ে গেছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলা ছায়াযুদ্ধে টানটান উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যে। পশ্চিম এশিয়ায় অতিরিক্ত তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমেরিকা। হুমকি, পাল্টা-হুমকি চলছে দু’তরফেই। ইরান প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করলে ফের আক্রমণ চালানো হবে বলে হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার জন্য নাকি আমেরিকা বেছে নিয়েছে ইরানের ৫২টি জায়গা, যার মধ্যে রয়েছে ইরানের একাধিক সাংস্কৃতিক স্থানও। সোলেমানির মৃত্যুতেউ সব শেষ নয়, তার ইঙ্গিত এখনই পাওয়া যাচ্ছে।