দ্য ওয়াল ব্যুরো: সামান্য বা মৃদু উপসর্গ থেকেও যদি করোনা সেরে যায়, তাহলেও শরীরে অ্যান্টিবডি বেশিদিন টিকে থাকছে না। রোগ সারানোর তিন মাস বা তার কম সময়েই অ্যান্টিবডির সংখ্যা ঝপ করে কমে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমছে। নতুন গবেষণায় এমনটাই দাবি করলেন বিজ্ঞানীরা। ‘নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন’-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এই গবেষণার রিপোর্ট সামনে এসেছে।
করোনার ভ্যাকসিন এখনও বাজারে আসেনি। কোভিড রোগীদের চিকিৎসার জন্য সলিডারিটি ট্রায়ালে বেছে নেওয়া কিছু ওষুধ এবং প্লাজমা থেরাপির মতো কয়েকটি থেরাপিতেই ভরসা। গবেষকরা বলছেন, ৩৪ জন করোনা রোগীকে বেছে নেওয়া হয়েছিল যাদের শরীরে সংক্রমণ মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছয়নি। মৃদু বা মাঝারি উপসর্গ দেখা দিয়েছে। এমন রোগীদের কয়েকজনকে শুধু অক্সিজেন সাপোর্ট দিতে হয়েছিল তবে মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দিতে হয়নি বা ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটেও ভর্তি করতে হয়নি। এই রোগীদের পর্যবেক্ষণে রেখেই এই তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
করোনার উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর থেকে ৩৭ দিন পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল এই রোগীদের। এই সময়ের মধ্যে তাদের শরীরে করোনাভাইরাস প্রতিরোধী অ্যান্টিবডিও তৈরি হয়েছিল। সেই অ্যান্টিবডির পরিমাণও মেপে রেখেছিলেন বিজ্ঞানীরা। এটা ছিল প্রথম পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ। দ্বিতীয় পর্যায়ে ফের সেই রোগীদের ৮৬ দিন পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। বিজ্ঞানীরা দেখেন এই দুই পর্যায়ের মাঝের সময়ে রোগীদের শরীরে অ্যান্টিবডির পরিমাণ এক ধাক্কায় কমে যাচ্ছে। হিসেব করলে দেখা যাচ্ছে ৭৩ দিন বা তার কম সময়ের মধ্যেই অ্যান্টিবডি কমছে রোগীদের শরীরে।
https://twitter.com/NEJM/status/1285616778379436036
করোনা সংক্রমণ কমলেও শরীরের রোগ প্রতিরোধ শক্তি কতটা গড়ে উঠছে বা করোনা প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি কতদিন টিকে থাকছে এই ব্যাপারে সুনিশ্চিত তথ্য পেতে আরও বেশি গবেষণার দরকার বলেই জানিয়েছেন ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী এফ জেভিয়ার ইবারোন্দো। তিনি বলেছেন, করোনার অ্যান্টিবডি মানুষের শরীরে থাকছে কম করে ৯০ দিন। তারপরেই অ্যান্টিবডির পরিমাণ কমতে শুরু করছে। একই দাবি করেছেন কিংস কলেজ লন্ডনের বিজ্ঞানীরা। ঠিক কী কারণে এমনটা হচ্ছে সেটা এখনও জানা যায়নি।
ভাইরাল প্রোটিন বা অ্যান্টিজনকে রুখে দেওয়ার মতো কী পরিমাণে অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে এবং সেই অ্যান্টিবডির স্থায়িত্ব ঠিক কতদিন এই সংক্রান্ত গবেষণার রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল ‘নেচার মেডিসিন’ জার্নালে। করোনার রিকভারি ট্রায়াল, ড্রাগের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ, সেরোলজিক্যাল সার্ভের সমীক্ষা অনুসারে সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই ওই রিপোর্ট তৈরি হয়েছিল। গবেষকরা বলছিলেনন, করোনাভাইরাসের মোকাবিলায় রোগীর শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা খুবই দুর্বল। অ্যান্টিবডি তৈরির পরিমাণও কম এবং সেই অ্যান্টিবডি ২-৩ মাসের বেশি স্থায়ী হচ্ছে না। বিজ্ঞানীদের শঙ্কা, জোরালো রোগ প্রতিরোধ গড়ে না উঠলে ভাইরাস কখনওই নিষ্ক্রিয় হবে না। রোগ সারলেও ভাইরাল স্ট্রেন সুপ্ত অবস্থায় থেকে যেতে পারে।
সুইডেনের বিজ্ঞানীরা বলছেন, সার্স ভাইরাসের সংক্রমণের সময় দেখা গিয়েছিল রোগীদের শরীরে যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছিল তার স্থায়িত্ব ছিল ২-৩ বছর, মার্স ভাইরাসের সময় কম করেও ৩১ মাস। কিন্তু করোনা সংক্রমণে এই অ্যান্টিবডির স্থায়িত্ব খুবই কম। কিছুদিন আগেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) প্রধান টেড্রস অ্যাডানাম ঘেব্রেইসাস জানিযেছিলেন, করোনাকে একেবারেই দমন করা এখনই সম্ভব হবে না। যার কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই ভাইরাস মানুষের শরীরে ঢোকা ও টিকে থাকার কৌশল শিখে ফেলেছে। জিনের গঠন বদলে বদলে মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নিজেদের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারছে। মার্কিন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা অ্যান্থনি ফৌজিও দাবি করেছেন, প্রথম ভ্যাকসিনেই ভাইরাস নির্মূল করা সম্ভব নয়। কারণ হার্ড ইমিউনিটি এখনও গড়ে ওঠেনি। এই হার্ড ইমিউনিটি তৈরি না হলে ভাইরাসকে জব্দ করা সম্ভব হবে না।