দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রথম ভ্যাকসিনেই করোনা যাবে না। বিশ্বের বাজারে ভ্যাকসিন আসতে সময় লাগতে পারে আরও এক বছর বা তারও বেশি, এমন বক্তব্য ছিল মার্কিন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা এপিডেমোলজিস্ট অ্যান্থনি ফৌজির। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশিয়াস ডিজিজের প্রধান সম্প্রতি আমেরিকার করোনা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সে দেশের সরকারের বিরাগভাজন হয়েছেন। তবে ফৌজি একা নন, এই ভাইরাসের দাপট যে আরও বেশি সময় সহ্য করতে হতে পারে সে সম্ভাবনার কথা বলেছেন বিশ্বের নামীদামি বায়োটেকনোলজি, ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি, সায়েন্স রিসার্চ ফার্মের ভাইরোলজিস্ট, গবেষক, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও।
মে মাসের শেষ থেকে জুন অবধি ১৮৪ জন হেলথ একজিকিউটিভ, ৩৭ জন ইনভেস্টর তাছাড়া বিভিন্ন ফার্মাসিউটিক্যাল ও বায়োটেক কোম্পানির ভাইরোলজিস্ট ও গবেষকদের মতামত নিয়ে এই তথ্য সামনে এনেছে ল্যাজার্ড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট সংস্থা।
সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অ্যান্থনি ফৌজি দাবি করেছেন, হয় এই বছরের শেষে নয়তো আগামী বছরের শুরুতে করোনার ভ্যাকসিন আসতে পারে। তবে তিনি নিশ্চিত তথ্য দিতে পারেননি। বিশ্বের আরও চার স্বাস্থ্য উপদেষ্টা এবং ভ্যাকসিন নির্মাতা সংস্থার প্রধানদের দাবি, কোভিড ভ্যাকসিন বাজারে আসতে সময় লাগবে আরও এক বছর বা তারও বেশি।
গবেষকদের এমন ভাবনার পিছনে অনেক কারণ রয়েছে। ভাইরোলজিস্টরা বলছেন বৈজ্ঞানিক কারণ যেমন রয়েছে, তেমনি প্রযুক্তিগত কারণ, নীতি ও আদর্শগত কারণও রয়েছে। বৈজ্ঞানিক কারণ হিসেবে বলা যায়, এই ভাইরাস আর পাঁচটা সাধারণ ভাইরাসের মতো নয়। ফৌজি আগেই বলেছিলেন জিনের গঠন বিন্যাস খুব দ্রুত বদলে ফেলতে পারে সার্স-কভ-২। সিঙ্গল অ্যামাইনো অ্যাসিডের কোডে তারা এমনভাবে বদল ঘটাচ্ছে যে প্রতিবার বিভাজনের পরেই নতুন নতুন ভাইরাল স্ট্রেন তৈরি হচ্ছে। একটি স্ট্রেন অন্যটির থেকে আলাদা। প্রতিটি নতুন ভাইরাল স্ট্রেন হয়ে উঠছে আগেরটির থেকেও বেশি সংক্রামক। মানুষের শরীরে ঢোকার জন্য তারা নতুন রিসেপটর খুঁজে নিচ্ছে। তাই এই ভাইরাসকে আটকাতে গেলে আগে তার উৎসের খোঁজ করতে হবে যেখান থেকে বদলটা শুরু হয়েছিল। যেটা প্রায় অসম্ভব।
গবেষকরা বলছেন, এখনও অবধি সার্স-কভ-২ ভাইরাল স্ট্রেনের যতগুলি জিনোম পাওয়া গেছে তার থেকেও বেশি জিনোম রয়েছে এই ভাইরাসের। ভাইরোলজিস্টরা এমনও দেখেছেন যে পর পর প্রায় ২০০ বার জিনের গঠন বদলে ফেলতে পারে এই ভাইরাস। বিজ্ঞানীরা এর কিছু স্ট্রেন চিহ্নিত করে তার থেকে ভ্যাকসিন ক্যানডিডেট তৈরি করছেন। কিন্তু অন্যান্য সংক্রামক স্ট্রেনগুলো যদি টিকে যায় এবং রূপ বদলে আবার ফিরে আসে তাহলে এই ভ্যাকসিনে তাকে রোখা যাবে কিনা সে নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
প্রযুক্তিগত কারণ হল ভ্যাকসিন ক্যানডিডেট ডিজাইন করা এবং তার প্রিক্লিনিকাল স্টেজ পেরিয়ে সেফলটি ট্রায়াল করে তিন পর্যায়ের ক্নিনিকাল ট্রায়াল শেষ করতে অনেক বেশি সময় লাগে। এরপরেও মানুষের শরীরে ভ্যাকসিন দিলে একটা নির্দিষ্ট সময়ে পর্যবেক্ষণে রাখার দরকার হয়। ৪৯% সায়েন্স রিসার্চ ফার্মের দাবি, করোনার ভ্যাকসিন তৈরি করার মতো যে ধরনের বায়োসেফটি ল্যাবোরেটরির দরকার সেটা অনেক জায়গাতেই নেই। আবার বায়োসেফটি লেভেল-৩ ল্যাবোরেটরিতে সংক্রামক ভাইরাল স্ট্রেন নিয়ে গবেষণা চালানোর সমস্যাও রয়েছে। রাজনৈতিক ও নীতিগত নানা কারণ এসে পড়ে সেখানে। তাই এই ধরনের সংক্রামক ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াকে কাবু করার মতো ভ্যাকসিন গত ২৫ বছরে মাত্র সাতটি তৈরি হয়েছে।
দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও সরকারি উদ্যোগের উপরেও অনেক কিছু নির্ভর করে বলে বক্তব্য অনেক ড্রাগ ও ভ্যাকসিন নির্মাতা সংস্থারই। ওষুধ বা ভ্যাকসিনের উৎপাদন তার বিপণন, কত মানুষের মধ্যে তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে, প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতে ওষুধ বা ভ্যাকসিন পৌঁছচ্ছে কিনা এই সবকিছুর উপরেই নির্ভর করে মহামারী কতদিন থাকবে। যে কোনও দেশের একটা বড় সংখ্যক মানুষের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ শক্তি গড়ে না উঠলে বাকিরাও সংক্রমণ থেকে রেহাই পাবেন না। অর্থাৎ ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি হবে না। আর হার্ড ইমিউনিটি না এলে এই অতিমহামারীকে রোখাও প্রায় অসম্ভব। এই আশঙ্কাই করছে বিজ্ঞানীমহল।