দ্য ওয়াল ব্যুরো: মারণ ক্যানসার রুখতে হাত মিলিয়েছিলেন। গবেষণার মাঝেই ভালবাসা। চারহাত এক হয়েছিল অচিরেই। অঙ্কোলজির গবেষক ডক্টর উগার সাহিন এবং তাঁর স্ত্রী ওজ়লেম তুরেসির নাম এখন গোটা বিশ্বই জেনে ফেলেছে। জার্মান বায়োটেকনোলজি কোম্পানি বায়োএনটেকের প্রতিষ্ঠাতা উগার সাহিনই বানিয়েছেন করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক আরএনএ ভ্যাকসিন যা ৯০ শতাংশ কার্যকরি হয়েছে বলে গতকালই দাবি করেছে মার্কিন ফার্মা জায়ান্ট ফাইজার।
বার্তাবহ আরএনএ বা
মেসেঞ্জার আরএনএ (mRNA) সিকুয়েন্সকে কাজে লাগিয়ে ক্যানসারের ওষুধ তৈরির চেষ্টা করছে বায়োএনটেক। ক্যানসার ইমিউনোথেরাপি, প্রোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপির জন্য নাম রয়েছে এই জার্মান রিসার্চ সেন্টারের। ২০০৮ সালে এই গবেষণা সংস্থা তৈরি করেন উগার সাহিন, তাঁর স্ত্রী ওজ়লেম এবং ক্রিস্টোফ হুবার। যে কোনও সংক্রামক ও জটিল রোগের থেরাপি নিয়ে গবেষণা হয় এই রিসার্চ সেন্টারে। করোনা অতিমহামারী ছড়িয়ে পড়ার পরে ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই সার্স-কভ-২ ভাইরাস নিয়ে গবেষণা শুরু করেন বিজ্ঞানী উগার। বার্তাবহ আরএনএ সিকুয়েন্সকে কাজে লাগিয়েই করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক তৈরির চেষ্টা শুরু করেন বিজ্ঞানী। সঙ্গ দেন স্ত্রী ওজ়লেম।
তুরস্ক থেকে জার্মানিতে, ক্যানসার গবেষণার মাঝেই জমে ওঠে প্রেম
তুরস্কে জন্ম উগার সাহিনের। যখন চার বছর বয়স তাঁর পরিবার চলে আসে জার্মানিতে। বাবা কাজ করতেন ফোর্ড কার ফ্যাক্টরিতে। কোলন ইউনিভার্সিটিতে মেডিক্যাল সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনা করেন উগার। ১৯৯৩ সালে ওই ইউনিভার্সিটি থেকেই পিএইচডি করেন। এরপর আট বছর কাজ করেছেন সারল্যান্ড ইউনিভার্সিটিতে। পরে মাইনজ় ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা শুরু করেন। ২০০১ সালে গ্যানিমেড ফার্মাসিউটিক্যাল নামে একটি কোম্পানি খুলেছিলেন উগার সাহিন। সেখানে ক্যানসার নিয়ে রিসার্চ শুরু করেছিলেন তিনি। এই গবেষণার সময়েই আলাপ হয় ওজ়লেমের সঙ্গে। ওজ়লেমের পরিবারও তুরস্ক থেকে চলে এসেছিলেন জার্মানিতে। তিনিও ক্যানসারের গবেষণায় উৎসাহী ছিলেন। লক্ষ্যের পথ মিলে যায় দু’জনের। চার হাত এক হতে দেরি হয় না।
[caption id="attachment_275116" align="aligncenter" width="698"]
স্ত্রী ওজ়লেমের সঙ্গে গবেষক উগার সাহিন[/caption]
গ্যানিমেড ফার্মাসিউটিক্যাল পরে একটি জার্মান সংস্থার কাছে বিক্রি করে দেন উগার সাহিন। তবে ক্যানসারের গবেষণা থামাননি তিনি। বায়োএনটেক তৈরি হয় ক্যানসার রিসার্চের জন্যই। পরে এইচআইভি, টিউবারকিউলোসিস ও অন্যান্য রোগের প্রতিষেধক নিয়েও গবেষণা শুরু করেন উগার ও ওজ়লেম।
কোভিড লড়াইয়ে সাফল্যের পথে গবেষক দম্পতির টিম
এক বছর আগেও বায়োএনটেকের বাজারদর ছিল ৪৬০ কোটি ডলার। গত শুক্রবার থেকে তাই পৌঁছেছে ২৬০০ কোটি ডলারে। জার্মানির প্রথম ১০০ জন ধনী ব্যক্তির তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন গবেষক দম্পতি। গত বছরই বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন এইচআইভি ও টিউবারকিউলোসিসের গবেষণার জন্য প্রায় ৫কোটি ডলার অনুদান দিয়েছে বায়োএনটেককে।

গবেষক উগার সাহিন জানিয়েছেন, বার্তাবহ আরএনএ-র বিন্যাসকে কাজে লাগিয়েই ভ্যাকসিন ক্যানডিডেট
BNT162 তৈরি করেছেন তাঁরা। বার্তাবহ আরএনএ-র কাজ হল কোষে কোষে খবর পৌঁছে দেওয়া। তাই আএনএ সিকুযেন্সকে কাজে লাগিয়ে তৈরি ভ্যাকসিন যে কোনও সংক্রামক প্যাথোজেনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করতে পারবে বলেই দাবি গবেষকের। বলেছেন, এই ভ্যাকসিন ক্যানডিডেট তৈরির জন্য সার্স-কভ-২ ভাইরাসের সংক্রামক আরএনএ স্ট্রেন স্ক্রিনিং করে আলাদা করে প্রথমে ল্যাবরেটরিতে বিশেষ উপায় পিউরিফাই করা হয়েছে। এই পর্যায়ে ভাইরাল স্ট্রেনকে এমনভাবে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয় যাতে শরীরে ঢুকলে তার সংক্রামক ক্ষমতা কমে যায়। এই নিষ্ক্রিয় বা দুর্বল আরএনএ স্ট্রেন তখন কোষে ঢুকে প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে না। অথচ এই জাতীয় ভাইরাল স্ট্রেনের খোঁজ পেলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে বি লিম্ফোসাইট কোষ বা বি-কোষ। নিজেদের অজস্র ক্লোন তৈরি করে রক্তরসে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে শুরু করে। পাশাপাশি, ভাইরাল অ্যান্টিজেনকে ভাল করে চিনেও রাখে। ফের যদি এমন অ্যান্টিজেনের খোঁজ পায় তাহলে খুব দ্রুত যাতে রোগ প্রতিরোধ বা ইমিউনিটি পাওয়ার গড়ে তুলতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে বলে
অ্যান্টিবডি বেসড ইমিউন রেসপন্স বা
অ্যাডাপটিভ ইমিউন রেসপন্স (Adaptive Immune Response)।
বি-কোষ শুধু নয়, আরএনএ ভ্যাকসিন কোষে ঢুকে ভাইরাসের নকল করতে থাকে। ফলে প্যাসিভ ইমিউনিটি তৈরির রাস্তা আরও পরিষ্কার হয়ে যায়। কোষের টি-লিম্ফোসাইট কোষ বা ঘাতক টি-কোষ সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই ঘাতক কোষের বিশেষ রিসেপটর তখন ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের (S) সঙ্গে আটকে গিয়ে তাকে নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে। আরও একটা বৈশিষ্ট্য আছে এই ঘাতক টি-কোষের। ভ্যাকসিনের ডোজে একে জাগিয়ে তুলতে পারলে ভাইরাল প্রোটিন শুধু নয়, ভাইরাস সমেত গোটা সংক্রামিত কোষকেই নষ্ট করে দিতে পারে। দাবি, ট্রায়ালে এমন কার্যকারিতাই দেখিয়েছে এই ভ্যাকসিন। তাই ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠেছে।
মার্কিন ফার্মা ফাইজারের সঙ্গে চুক্তি করে এই ভ্যাকসিনেরই বিপুল উৎপাদন করতে চলেছে বায়োএনটেক। ফাইজারের সিইও অ্যালবার্ট বোরলা বলেছেন, কুড়ি সালের শেষেই অন্তত চার কোটি ভ্যাকসিনের ডোজ নিয়ে আসতে পারবে ফাইজার। বিপুল পরিমাণ টিকার ডোজ উৎপাদনের পরিকাঠামো তাদের রয়েছে। আগামী বছর মার্চের মধ্যে আরও ১০ কোটি টিকার ডোজ তৈরি করে ফেলবে ফাইজার।