দ্য ওয়াল ব্যুরো: আর্থ্রাইটিসের ওষুধে সংক্রমণ কমছে করোনা রোগীদের, দাবি করলেন ইনদওরের
শ্রী অরবিন্দ ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্স (SAIMS)-এর ডাক্তাররা৷ দেশে প্রথমবার আর্থ্রাইটিসের ওষুধ
টোসিলিজুমাব (TCZ) দিয়ে করোনা রোগীদের চিকিৎসা করা হচ্ছে ইনদওরের হাসপাতালে৷ ডাক্তাররা দাবি করেছেন, পাঁচজন সঙ্কটাপন্ন রোগীকে এই ওষুধ খাওয়ানো হয়েছিল৷ দেখা গেছে, তাঁদের মধ্যে দু’জন রোগীর শরীরে এই ওষুধের প্রভাব দারুণভাবে কার্যকরি৷ তাঁদের সংক্রমণও অনেকটাই কমের দিকে৷
ইনদওরের শ্রী অরবিন্দ ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সে এই মুহূর্তে ৩৫০ জন করোনা রোগীর চিকিৎসা চলছে৷ তাঁদের চিকিৎসার দায়িত্বে রয়েছেন ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, প্যারামেডিক্যাল স্টাফ মিলিছে ১০০ জনের একটি টিম৷ করোনা রোগীদের উপরে আর্থ্রাইটিসের ড্রাগ টোসিলিজুমাব থেরাপির প্রথম প্রয়োগ করেন পালমোনোলজিস্ট ডাক্তার রবি দোসি৷ তিনি বলেছেন, “চিন, ইতালিতে এই ড্রাগের প্রয়োগ অনেকটাই সফল৷ দেশে প্রথমবার এই ওষুধ করোনা রোগীদের উপর প্রয়োগ করা হল৷ দু’জন সঙ্কটাপন্ন রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার পথে৷ তাছাড়াও কয়েকজন মধ্যবয়স্ক রোগীর উপরেও এই ওষুধের ভাল ফল দেখা গেছে৷”
তাহলে কি সব রোগীদের উপরেই এই থেরাপির প্রয়োগ করা যাবে? ডাক্তার রবি দোসি বলেছেন, এই ওষুধের নির্দিষ্ট ডোজ আছে৷ সেটা সব রোগীর উপরে সমান কার্যকরি কিনা সেটা আগে দেখতে হবে৷ ডাক্তার বলেছেন, যেসব রোগীর উপরে সংক্রমণ রোখার গতানুগতিক চিকিৎসাপদ্ধতিগুলি আর কাজ করেনি তাদেরই দেওয়া হয়েছে এই ওষুধ৷ মধ্যবয়স্ক কিছু রোগীর উপরে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন, স্টেরয়েড, অসেল্টামিভির, অ্যান্টিবায়োটিক ঠিকমতো কাজ করেনি, ভেন্টিলেটর সাপোর্টেও বাঁচানো যাচ্ছিল না রোগীদের৷ তাদের উপরেই এই ওষুধ প্রয়োগ করে কিছুক্ষেত্রে ভাল ফল পাওয়া গেছে৷
কীভাবে কাজ করে এই ওষুধ?
টোসিলিজুমাব ড্রাগকে বলা হয়
‘ইমিউনোসাপ্রেস্যান্ট’ ( immunosuppressant)৷ রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয় এই ওষুধ৷ এটি মূলত একপ্রকার মোনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি যা সিস্টেমিক জুভেনাইল ইডিয়োপ্যাথিক আর্থ্রাইটিস (এসজেআইএ) অর্থাৎ শিশুদের যে ধরনের আর্থ্রাইটিস দেখা যায় এবং পলিআর্টিকুলার জুভেনাইল ইডিয়োপ্যাথিক আর্থ্রাইটিস (পিজেআইএ) চিকিৎসায় কাজে লাগে। ডাক্তার বি দোসি বলছেন, এই ওষুধের প্রধান কাজ হল ‘সাইটোকাইন স্টর্ম’ কে আটকে দেওয়া৷ সাইটোকাইন এমন একটা প্রোটিন যার কাজ ঝড়ের বেগে কোষে কোষে বিপদের সংকেত পৌঁছে দেওয়া, যাতে তারা প্রস্তুত থাকে৷ অর্থাৎ এই প্রোটিন রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়াতে বিশেষ ভূমিকা নিয়ে থাকে। এবার সাইটোকাইনের উৎপাদন যদি কোনওভাবে কমে যায় বা অনেকবেশি বেড়ে যায়, তাহলে ক্ষতি হয় দেহকোষেরই। ডাক্তারের দাবি, কোভিড-১৯ সংক্রমণে অনেকটা এমনই হচ্ছে। মারণ ভাইরাসের সংক্রমণে দেহকোষের উত্তেজনা অনেকটাই বাড়ছে। সাইটোকাইনের মাত্রা বাড়ছে হুহু করে। সংক্রামক জীবাণুকে আটকাতে গিয়ে অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ছে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা। যার কারণে ক্ষতি হচ্ছে দেহকোষেরই। এই সাইটোকাইন ঝড়কে আটকাতেই এই ওষুধ প্রয়োগ করা হচ্ছে এবং তাতে কিছুটা হলেও ভাল ফল পাওয়া গেছে।
ডাক্তার দোসি বলেছেন, গত ১০ এপ্রিল থেকে করোনা রোগীদের উপরে এই ওষুধ প্রয়োগ করা হচ্ছে। প্রথম এই থেরাপি শুরু হয় চল্লিশোর্ধ্ব এক রোগীর উপরে। দেখা গেছে এক সপ্তাহে তাঁর সংক্রমণ অনেক কমে গেছে। দ্বিতীয় রোগী যিনি সুস্থ হওয়ার পথে তাঁর বয়স ৫০ বছরের কাছাকাছি। আরও তিনজন রোগীর উপরে এই ওষুধ ভাল কাজ করছে। তবে তাঁরা এখনও পর্যবেক্ষণে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন ডাক্তার দোসি।
আমেরিকা, চিন, ইতালিতে করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়েছে টোসিলিজুমাব
‘দ্য ল্যানসেট’ মেডিক্যাল জার্নাল বলেছে, সাইটোকাইন ঝড়ের কারণে শরীরে
হাইপারইনফ্ল্যামেশন (hyperinflammation) ঠেকাতে এই ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। সঙ্কটাপন্ন রোগীদের উপরেই এই ওষুধ বেশি কার্যকরি হতে পারে।
মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন
(FDA)-এর অনুমোদনে টোসিলিজুমাবের ব্র্যান্ড Actemra নিয়ে তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল চলছে আমেরিকায়। মার্কিন বায়োমেডিক্যাল অ্যাডভান্সড রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটির সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিশ্বের অন্যতম বড় হেলথকেয়ার কোম্পানি রোচে ফার্মা এই ওষুধের প্রয়োগ করছে কোভিড-১৯ পজিটিভ রোগীদের উপরে।
চিনে ইতিমধ্যেই এই ড্রাগ নিয়ে গবেষণা শুরু হযেছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ১৫ জন সঙ্কটাপন্ন করোনা আক্রান্ত রোগীর উপরে এই ওষুধ প্রয়োগ করা হযেছিল, তাতে নাকি ভাল ফল পাওয়া গেছে।
ইতালির নেপলস শহরে এই ওষুধ নিয়ে গবেষণা করছে চিন ও ইতালীয় বিজ্ঞানীদের একটি টিম। তাঁরা দাবি করেছেন, এই ওষুধ ব্যবহার করায় দু’জন সঙ্কটাপন্ন রোগীর মধ্যে ভাল প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। আরও অনেক রোগীর উপরে এই ওষুধের ট্রায়াল চলছে।