
শেষ আপডেট: 27 May 2023 09:35
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আগামীকালই সংসদ ভবনের উল্টোদিকে নরেন্দ্র মোদী-সরকারের বানানো নতুন সংসদ ভবনের উদ্বোধন হবে (Indian Parliament House retires)। ইতিমধ্যে সেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে ঘিরে জল যথেষ্টই ঘোলা হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে দিয়ে উদ্বোধন না করিয়ে কৃতিত্বের সবটাই নিয়ে নিতে চাইছেন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর পারিষদবর্গ। কংগ্রেস-সহ একাধিক বিরোধী দল এই অনুষ্ঠানকে বয়কটের ডাক দিয়েছে।
ভারতের বর্তমান সংসদ ভবনের বয়স একশো-ও পেরোয়নি। স্যার এডুইন লুটিয়েন্স এবং হার্বার্ট বেকারের নেতৃত্বে এই ভবন গড়ার কাজ শুরু হয়েছিল ১৯২১ সালে। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন রানি ভিক্টোরিয়ার পুত্র প্রিন্স আর্থার। প্রায় পাঁচ বছর ধরে কাজ চলেছিল। শোনা যায়, লুটিয়েন্সের নেতৃত্বাধীন ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়াররা মধ্যপ্রদেশের উত্তরে মোরেনা জেলার দশম শতকের বিখ্যাত চৌষট্টি যোগিনী মন্দিরের আদলে সংসদ ভবনের নকশা বানিয়েছিলেন। যদিও তার সপক্ষে কোনও লিখিত প্রমাণ নেই।

১৯২৭ সালে ভবনটির উদ্বোধন করেন বড়লাট লর্ড আরউইন। তখন অবশ্য এই ভবনের নাম ছিল 'কাউন্সিল হাউস'। ভেতরে বসত কেন্দ্রীয় আইনসভা। মাত্র দুই বছর পরেই, ১৯২৯ সালের ৮ এপ্রিল এই ভবনের ভেতরেই দুই তরুণ বিপ্লবী বিভিন্ন অত্যাচারী ব্রিটিশ আইনের বিরুদ্ধে স্লোগান তুলে বোমা নিক্ষেপ করেন। গোটা ভবন কেঁপে যায় তাঁদের 'ইনকিলাব জিন্দাবাদ' ধ্বনিতে। স্বেচ্ছায় ধরা দিয়েছিলেন তাঁরা। ফাঁসির দড়িতে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন তাঁদের একজন। ভারতীয় মননের দুই অবিস্মরণীয় প্রেরণা—ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত।
স্বাধীনতার পরে এই কাউন্সিল হাউসেরই নাম পাল্টে রাখা হয় সংসদ ভবন। শুরুতে তার সেন্ট্রাল হলে বসত সুপ্রিম কোর্টের আদালত। পরে তা সরে যায় নতুন ভবনে। বহু ইতিহাস, বহু আন্দোলন, বহু স্লোগান, বহু বিতর্ক, মন্তব্য, ধাক্কাধাক্কি, এমনকি নানা সরস ঘটনারও সাক্ষী এই সংসদ ভবন।
কিন্তু মাত্র ৯৬ বছরেই তাকে 'ভিআরএস' দিয়ে অবসর গ্রহণ করানো হল। সত্যিই কি সংসদ ভবনের জন্য ৯৬ বছরই যথেষ্ট সময়?
মোদী সরকারের তরফে সরকারিভাবে যুক্তি রাখা হয়েছে, এই পুরনো সংসদ ভবন তৈরিই হয়েছিল ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার জন্য। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের দ্বিকক্ষ আইনসভার কথা তখন কোনও দিক দিয়েই ভাবা হয়নি। ফলে স্থান সংকুলান হওয়াটাই এখন সমস্যার। লোকসভার আসন বাড়লে সেই আসন দেওয়ার মত জায়গা নেই। সেন্ট্রাল হলে ৪৪০ জন মাত্র বসতে পারে। ফলে যৌথ অধিবেশন হলে আসন দেওয়া নিয়ে নিদারুণ সমস্যা তৈরি হয়।
ভবনটির বৈদ্যুতিন ব্যবস্থাও সন্তোষজনক নয়। আধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থার ছিটেফোঁটাও তাতে নেই। জলের লাইন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের লাইন, কেবল ইত্যাদি সবই বিপজ্জনকভাবে যোগ করা হয়েছে। লোকসভা ও রাজ্যসভার মাইক, স্পিকার, মনিটর সবই সেকেলে। লোকসভা ও রাজ্যসভার সচিবালয়ের বিভিন্ন কক্ষে আধুনিক 'অফিস' বানানোর মত কিছুই নেই। কাঠের পার্টিশন দিয়ে কাজ সারা। এমনকি ভূতাত্ত্বিকভাবেও দিল্লি এখন অনেক বেশি বিপজ্জনক 'সিসমিক জোনে' রয়েছে। ফলে ভূমিকম্প হলেও বিপদ বাড়তে পারে।
কিন্তু একবার যদি পৃথিবীর নানা দেশে, বিশেষ করে পশ্চিমী দুনিয়ার নানা উন্নত দেশে আমরা চোখ বোলাই, দেখা যাবে, ৯৬ বছর সংসদ ভবনের জন্য নেহাতই কৈশোর বয়স।

যেমন ধরা যাক, ফ্রান্স। আজও ফরাসি সংসদের উচ্চকক্ষ সেনেটের সভা হয় প্যারিসের লুক্সেমবার্গ প্রাসাদে। ভবনটি বানানো শুরু হয়েছিল ১৬১৫ খ্রিস্টাব্দে, শেষ হয় ১৬৪৫ খ্রিস্টাব্দে। ভারতের অধীশ্বর তখন মুঘল সম্রাট শাহজাহান। ফরাসি সংসদের নিম্নকক্ষ 'ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি'-র সভা বসে সেইন নদীর ধারে, বুরবোঁ প্রাসাদে। সম্রাট পঞ্চদশ লুইয়ের আমলে ১৭২৮ সালে এটি বানানোর কাজ শেষ হয়।
ফ্রান্সের পাশের দেশ বেলজিয়ামের সংসদ বসে ব্রাসেলসের 'প্যালেস অফ দ্য নেশন' ভবনে। নিওক্লাসিক ধাঁচের এই ভবন তৈরি হয়েছিল ১৭৮৩ সালে। চেক প্রজাতন্ত্রের সংসদের উচ্চকক্ষ সেনেটের সভা বসে প্রাগের ঐতিহাসিক ওয়ালেস্টেইন প্রাসাদে। শোনা যায়, এই প্রাসাদ তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল ১৬২৩ সালে, লেগেছিল সাত থেকে আট বছর। নিম্নকক্ষ 'চেম্বার অফ ডেপুটিজ'-র সদস্যদের সভা হল 'থুন প্রাসাদ'। সেও ১৭২৩ সাল নাগাদ বানানো। দুই ভবনই আজ 'জাতীয় সাংস্কৃতিক সৌধ' বলে স্বীকৃত।
প্রাচীন সভ্যতার পীঠস্থান বললেই সবার আগে আমাদের মনে আসে গ্রিসের নাম। ঈজীয় সাগরের তীরে এথেন্স, স্পার্টা, করিন্থ, ম্যাসিডনের গল্প শুনে আমাদের ইতিহাস পাঠ শুরু হয়। সেই গ্রিসের এককক্ষ সংসদ ভবন বসে এথেন্সের 'ওল্ড রয়্যাল প্যালেস' ভবনে। উদ্বোধন হয়েছিল ১৮৪৩ সালে। আইসল্যান্ডের সংসদ ভবন যখন তৈরি হয়, ভারতের জাতীয় কংগ্রেস দলেরও জন্ম হয়নি তখন। ১৮৮১ সালে তৈরির কাজ শেষ হয়। নরওয়ের সংসদ ভবনের উদ্বোধন হয়েছিল ১৮৬৬ সালে, নকশা করেছিলেন সুইডেনের বিখ্যাত স্থপতি এমিল ল্যাংলেট।
তবে এই ব্যাপারে বলতে গেলে সবার আগে যে নামটা নিতেই হয়— তা নিঃসন্দেহে নেদারল্যান্ডস। দ্য হেগ শহরের হোফেইভার হ্রদের তীরে তৈরি গথিক দুর্গের আদলে বানানো বিখ্যাত ডাচ সংসদ ভবন 'বিনেনহফ'-কে বলা হয় বিশ্বের প্রাচীনতম সংসদ ভবন, যাতে এখনও একইভাবে সভা হয়। ঠিক কবে এই বিখ্যাত দুর্গ তৈরির কাজ শুরু হয়, সঠিক জানা যায় না। সম্ভবত দ্বাদশ শতকে কাজ শেষ হয়। দিল্লির সুলতান তখন ইলতুৎমিস। আজও এই ভবনেই বসে ডাচ সংসদ।

ব্রিটিশ সংসদ ভবন 'প্যালেস অফ ওয়েস্টমিনস্টার'-ও কম পুরনো নয়। সম্ভবত এটি তৈরি হয়েছিল বিনেনহফেরও আগে। কিন্তু ১৮৩৪ সালে এক বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডে ভবনটির অনেকটাই পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ১৮৭৬ সালে আবার নতুনভাবে ঢেলে সাজিয়ে তাকে নির্মাণ করা হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জার্মান বোমারু বিমানের হামলার লক্ষ্য ছিল ওয়েস্টমিনস্টার। কিন্তু আজও এখানেই বসে 'হাউজ অফ কমনস'। আমাদের সংসদীয় রীতিনীতির অনেকটাই এই সংসদের ব্যবস্থা থেকে নেওয়া।
প্রায় একই গল্প মার্কিন সংসদ 'ক্যাপিটল হিল' নিয়েও। ১৮০০ সালে বানানোর কাজ শেষ হয়েছিল। নকশা করেছিলেন উইলিয়াম থর্নটন। পরে ১৮১৪ সালে ব্রিটিশ আক্রমণে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল এই ভবন। পরে আবার নতুন করে গড়ে তোলা হয়। ১৮৬৬ সালে এর বিখ্যাত গম্বুজটি বানানোর কাজ শেষ হয়। আজ যেটি ওয়াশিংটন ডিসির অন্যতম 'ল্যান্ডমার্ক' রূপে স্বীকৃত।
সারা পৃথিবীতে যেখানে দু'শো বা তিনশো বছরের পুরনো সংসদ ভবন চলছে, সেখানে মাত্র ৯৬ বছরেই নতুন সংসদের কি আদৌ দরকার ছিল? প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই। নীতিশ কুমার সরাসরিই বলেছেন, এত ইতিহাসে ঘেরা সংসদকে ছেড়ে নতুন সংসদ বানানোর দরকারই ছিল না। যদিও মোদী সরকার দিল্লির পুরো 'সেন্ট্রাল ভিস্তা'-কেই ঢেলে সাজাতে উদ্যোগী হয়েছে। কাজ চলেছে কোভিডের বিধ্বংসী দাপটের মাঝেও। নতুন সংসদেও রয়েছে 'গুজরাত মডেল', নকশা করেছেন গুজরাতি স্থপতি বিমল প্যাটেল। খরচ হয়েছে ৮৩৬ কোটি টাকা।
‘আরও অনেক মৃত্যু দেখতে হবে!’ কুনোয় চিতার মৃত্যুমিছিলে সতর্ক করলেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিশেষজ্ঞ