দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতের সরকারি বেসরকারি সাইবার নেটওয়ার্কে চিনের আড়িপাতার ঘটনা নতুন নয়। এ ব্যাপারে বেজিংয়ে সরকারি মদতপুষ্ট হ্যাকাররা প্রতিনিয়ত সক্রিয় বলে অভিযোগ। সম্প্রতি চিনের ১০০ টির উপর মোবাইল অ্যাপ ভারতে নিষিদ্ধ হওয়ার পর সেই বেয়াদপি আরও বেড়েছে বলেই সাইবার বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন। শুধু তা নয়, এ দেশে ব্যাঙ্কিং নেটওয়ার্কের উপরেও সাইবার অ্যাটাকের আশঙ্কা রয়েছে।
পরিস্থিতি যখন এমনই তখন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের দীর্ঘদিনের সময়োত্তীর্ণ বন্ধু জাপানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার পথে হাঁটল নয়াদিল্লি। দুদিনের জন্য টোকিও সফরে গিয়েছেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। বুধবার জাপানের বিদেশমন্ত্রী তোশিমিৎস্যু মোটেগির সঙ্গে তাঁর বৈঠকের পর ৫ জি প্রযুক্তি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টালিজেন্স, সাইবার সিকিউরিটি, ‘ইন্টারনেট অব থিংস’ নিয়ে দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা চুক্তি সাক্ষর হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় কূটনৈতিক ভাবে এই সমঝোতা যেমন প্রাসঙ্গিক, সাউথ ব্লক জানাচ্ছে, তেমনই এ দেশে ৫ জি প্রযুক্তির প্রসার ও মজবুত সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই বোঝাপড়া ইতিবাচক ভূমিকা নেবে।
৫জি নেটওয়ার্ক আসলে কী?
পঞ্চম প্রজন্মের মোবাইল নেটওয়ার্ক। ৪জি নেটওয়ার্কের থেকে ১০০ গুণ বেশি উন্নত ও দ্রুত গতির। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ৫জি প্রযুক্তি বহু যোজন পিছনে ফেলবে ৪জি-কেও। ইন্টারনেটের স্পিড হবে দুরন্ত। ওয়ারলেস নেটওয়ার্কে একসঙ্গে বহু ডিভাইসকে যুক্ত করা যাবে। অনেক বেশি পরিমাণ ফাইল ট্রান্সফার করা যাবে নিমেষের মধ্যে। বাফারিং শব্দটাই মুছে যাবে ডিজিটাল দুনিয়া থেকে। ডিজিটাল নেটওয়ার্কে এক নতুন যুগের সূচনা হবে।
এই ৫জি টেকনোলজি পাঁচটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে—
মিলিমিটার ওয়েভ— মোবাইলে কল করার সময় বা ইন্টারনেট ব্যবহার করার সময় মোবাইল একটি মাধ্যম ব্যবহার করে যাকে বলে তরঙ্গ মাধ্যম। এই তরঙ্গের নির্দিষ্ট কম্পাঙ্ক থাকে। যখন ট্রাফিক বেশি থাকে অর্থাৎ একসঙ্গে অনেকে ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন, তখন হামেশাই সিগন্যাল ড্রপ হয়। তাই প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা চেষ্টা করেন এই তরঙ্গের দৈর্ঘ্য আরও বাড়ানোর। ৫জি-তে পরীক্ষামূলকভাবে মিলিমিটার তরঙ্গ বা ৩০-৩০০ গিগাহার্টজ কম্পাঙ্কের তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ব্যবহার করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই তরঙ্গ দৈর্ঘ্যে অনেক বেশি গতিতে ও দ্রুত নেটওয়ার্ক পরিষেবা পাওয়া সম্ভব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভেরিজ়ন, এটিঅ্যান্ডটি টেলিকম অপারেটরা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
স্পিড সেল—মিলিমিটার ওয়েভের ক্ষমতা যেখানে শেষ, সেখান থেকেই শুরু স্পিড সেল। উচ্চ কম্পাঙ্কের মিলিমিটার তরঙ্গ কোনও বাধা অতিক্রম করতে পারে না। এই ঘাটতি মেটানোর জন্যই স্পিড সেল। ছোট ছোট টাওয়ার বসানো হবে খুব কাছাকাছি। তাদের মাঝে দূরত্ব এতটাই কম থাকবে যে একটি টাওয়ারে সিগন্যালের সমস্যা হলে অন্য টাওয়ার থেকে সিগন্যাল চলে আসবে। বিস্তৃত এলাকাজুড়ে নেটওয়ার্ক পরিষেবা ছড়িয়ে দিতে পারবে স্পিড সেল।
ম্যাক্সিমাম মিমো—মিমো (MIMO) অর্থাৎ ম্যাক্সিমাম ইনপুট ও ম্যাক্সিমাম আউটপুট টেকলোনজি। ৫জি-র এই প্রযুক্তিতে বিরাট সেল টাওয়ার ব্যবহার করা হয়। যে কোনও প্রতিকূল অবস্থাতেও কোনওরকম বাফারিং ছাড়াই একইরকম স্পিডে নেটওয়ার্ক পরিষেবা ছড়িয়ে দিতে পারে এই মিমো।
বিমফর্মিং— এই প্রযুক্তি হল অনেকটা ট্রাফিক সিগন্যাল সিস্টেমের মতো। একটা নির্দিষ্ট দিকে ব্যবহারকারীদের কাছেই সিগন্যাল পাঠাবে। চারদিকে নয়। যার কারণেই একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক গ্রাহকের কাছে উচ্চগতির ইন্টারনেট পরিষেবা পৌঁছে যাবে।
ফুল ডুপ্লেক্স—ডেটা ট্রান্সফার হবে নিরবচ্ছিন্নভাবে। ল্যান্ডলাইন ফোন, শর্ট-ওয়েভ রেডিওতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।
৫জি পরিষেবার স্পিডে যে কোনও এইচডি সিনেমা মাত্র ৩ সেকেন্ডে ডাউনলোড হবে। বহু সংখ্যক ডিভাইসকে যুক্ত করতে পারবে এই পরিষেবা। চালকবিহীন গাড়ি চলাচল কিংবা বাড়ির বাইরে থেকে ভিতরের বৈদ্যুতিন পণ্য নিয়ন্ত্রণ করা যাবে ৫জি-তে। বিশষজ্ঞরা বলছেন, ৫জি পরিষেবায় দূরে থেকেই চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দিতে পারবেন ডাক্তাররা। অস্ত্রোপচার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে বহু দূর থেকেই। প্রত্যন্ত এলাকা বা অতি দুর্গম এলাকা থেকেও নেটওয়ার্ক পরিষেবা পাওয়া যাবে।
কিন্তু ৫জি পরিষেবা নিয়ে সমস্যাও রয়েছে। প্রথমত, এই ৫জি টেকনোলজির খরচ অনেক বেশি। দ্বিতীয়ত, এই পরিষেবা পেতে হলে নেটওয়ার্ক অপারেটরদের প্রযুক্তিতে আরও বেশি আধুনিকীকরণ করতে হবে। ৫জি-তে ব্যান্ডউইথ স্পিড অনেক বেশি। এমনতিতে ৩.৫ গিগাহার্টজের বেশি কম্পাঙ্গ লাগে যা ৩জি ও ৪জির থেকে অনেক বেশি। ভারতের মতো দেশে যেখানে ৪জি পরিষেবা নিয়েই বিস্তর অভিযোগ রয়েছে সেখানে ৫জি পরিষেবা দেওয়া কতটা সম্ভব সেই নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিদেশ মন্ত্রক জানাচ্ছে, জাপানের সঙ্গে এ ব্যাপারে সমঝোতার প্রাসঙ্গিকতা এখানেই। ভারতে ৫জি রোল-আউট করতে সহায়ক ভূমিকা নেবে প্রশান্ত মহাসাহগরীয় অঞ্চলের এই বন্ধু দেশ।