দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাত পোহালেই দেশে ফিরছেন মীরাবাই চানু। গতকালই অলিম্পিক্সে ভারোত্তোলনে রুপো জয় করে গোটা দেশকে আনন্দে মাতিয়েছেন তিনি। এর পরে প্রতীক্ষা বাড়ি ফেরার। সব ঠিক থাকলে সোমবারই বিকেল পৌনে পাঁচটা নাগাদ দিল্লির ইন্দিরা গাঁধী বিমানবন্দরে নামবেন, সেখান থেকে ইম্ফলের উড়ান ধরে ফিরবেন বাড়ি।
এদিকে, একে তো মেয়ে ফিরছে এতদিন পরে, তায় আবার সারা বিশ্বের কাছে মুখ উজ্জ্বল করেছে সে। তাই ইম্ফলের নংপক কাকচিং গ্রামে সাজোসাজো রব। মীরাবাইয়ের বাড়িতে তো বটেই, গোটা এলাকাজুড়ে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে চানুকে অভিনন্দন জানানোর। পরিবার, প্রতিবেশীদের যেন আর তর সইছে না, আদরের মেয়েকে বরণ করবেন বলে।
মীরাবাইয়ের মা সাইখোম অংবি টমবি লেইমা বলছেন, 'অনেক দিন দেখিনি ওকে। কাল ফোনে কথা বলার সুযোগ পেলাম যখন, বলেছি, আমরা কতটা গর্বিত।' গর্ব যেন ধরছে না মীরাবাইয়ের বাবা এবং ভাইবোনদেরও। পাড়া-প্রতিবেশীরাও পিছিয়ে নেই।
গতকাল, শনিবার যখন টোকিওর মাটিতে শেষদফার লড়াই করছিলেন চানু, তখনই তাঁর গ্রামের বাড়িতে ভিড় জমিয়েছিলেন গ্রামবাসীরা। গ্রামের মেয়ের অলিম্পিক্সে পদক জয় বলে কথা! সকলে একসঙ্গে টিভিতে দেখেছেন তাঁর ভারোত্তোলন। সে এক হইহই কাণ্ড। সে হইহইয়ের রেশ কাটেনি এখনও, বরং আরও বেড়েছে কাল চানুর বাড়ি ফেরার খবরে।
মণিপুরের ইম্ফল শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে মীরাবাই চানুর গ্রাম নংপক কাকচিং। পাহাড়ি গ্রাম। কোথাও যেতে হলে পায়ে হাঁটাই ভরসা। ছোট্ট চানুর জেদ ছিল জীবনে কিছু করে দেখানোর। তার ওপর বাবা-মায়ের উৎসাহে ভারত্তোলনে আগ্রহও তৈরি হয়। এই উৎসাহকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন কুঞ্জরানি দেবী। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে সাত বারের রুপো জয়ী কুঞ্জরানিই ভারত্তোলনের নেশা ধরিয়ে দিয়েছিলেন চানুকে। তাঁকে দেখেই ১৪ বছরের মেয়েটার জীবনের লক্ষ্যও বদলে যায়।
লক্ষ্যপূরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক শীর্ষ ছোঁয়া হয়েছে সদ্য। এবার একটু বিশ্রামের পালা।
এসবেরই মধ্যেই বিরাট আর্থিক পুরস্কারের কথা ঘোষণা করেছেন মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিংহ। তিনি জানিয়েছেন, অলিম্পিক্সে রুপো জেতার জন্য ১ কোটি টাকা আর্থিক পুরস্কার দেওয়া হবে চানুকে। পাশাপাশি রেলের চাকরিতেও পদোন্নতি হচ্ছে তাঁর।
তবে এসব নিয়ে এখুনি ভাবছেন না চানু। তাঁর আপাতত ইচ্ছে, কতক্ষণে বাড়ি গিয়ে একটিবার জড়িয়ে ধরবেন মাকে। অনুশীলন, টুর্নামেন্ট, অলিম্পিক্স-- সব মিলিয়ে প্রায় দুটো বছর ঘরছাড়া তিনি। আর মন মানছে না ২৬ বছরের তরুণীর। পরিবারের সঙ্গেই আপাতত খানিকটা সময় কাটাতে চান তিনি। খেতে চান মায়ের হাতের রান্না, গল্প করতে চান পরিবারের সকলের সঙ্গে।
তবে কোলাহলের মাঝে চানুর পরিবারের, গ্রামের মানুষদের আজ মনে পড়ছে, পাঁচ বছরের সেই ছোট্ট মেয়েটার কথা। সে যখন ভারী জলের ড্রাম মাথায় করে এক কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে আসত, অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতেন মা-বাবা। হাত কাঁপত না, পা টলমল করত না। ছোট্ট শিশু ভারী ভারী জলের ড্রাম মাথায় তুলে নিত অবলীলায়। বয়স যখন ১২ বছর, বন থেকে ভারী কাঠের বোঝা মাথায় নিয়ে পাহাড়ি এবড়োখেবড়ো রাস্তা বেয়ে বাড়ি নিয়ে আসত সেই কিশোরী। দাদারাও যে কাঠের ভার বইতে পারতেন না, ছোট বোন তা করে ফেলত খুব সহজেই। বাবা-মায়ের দূরদৃষ্টি বুঝেছিল বুঝেছিল এই মেয়ের মধ্যে এমন এক সহজাত ক্ষমতা আছে যা তাকে সাফল্যের শিখরে নিয়ে যেতে পারে। আর হলও তাই।
কাঠকুড়ানি সেই মেয়েই এখন ভারোত্তোলক সাইখোম মীরাবাই চানু, টোকিও অলিম্পিকে রুপোর পদক এনে দিয়েছে ভারতকে।