
শেষ আপডেট: 6 August 2023 05:50
দ্য ওয়াল ব্যুরো: জুলাই মাসেই ভয়ঙ্কর সৌরঝড় আছড়ে পড়ার সতর্কবার্তা শুনিয়েছিল ন্যাশনাল ওশিয়ানিক এন্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (NOAA)। সেই ধাক্কা অল্পের উপর দিয়ে গেছে। তবে বিপদ কাটেনি। ২০২৫ সালে নাকি সূর্যের করোনায় ভয়ঙ্কর ঝড় (solar storm) উঠবে। আর সেই সৌরঝড়ের রেশ এসে পড়বে পৃথিবী, চাঁদ ও মঙ্গলে। এমনিতেও সৌরবায়ুর ঝাপটায় জেরবার চাঁদ। বায়ুমণ্ডল না থাকায় সরাসরি সৌরকণারা আছড়ে পড়ে চাঁদে। পৃথিবী সেখানে অনেক সুরক্ষিত। পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র সৌরঝড়কে কাছে ঘেঁষতেই দেয় না। তবে পঁচিশ সালটা নাকি ব্যতিক্রমী হতে পারে বলে দাবি করেছে ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি (ESA)।
বিজ্ঞানীদের দাবি, পঁচিশে যে সৌরঝড়ের (solar storm) ঝাপটা আসবে তা নাকি পৃথিবী, চাঁদ, মঙ্গলে সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দেবে। প্রায় সাড়ে ৯ কোটি মাইল দূরে সূর্য থেকে ছুটে এসে পৃথিবীতে আছড়ে পড়বে গনগনে সৌররশ্মিরা। কেঁপে উঠবে পৃথিবীর চারপাশে থাকা চৌম্বক ক্ষেত্র। দুই মেরুতে ঘনঘন উজ্জ্বল হয়ে উঠবে মেরুজ্যোতি। পৃথিবীতে হামলা চালাতে পারে সূর্যের প্লাজমা থেকে আসা ‘করোনাল মাস ইজেকশান (সিএমই)’-ও।

কিছুদিন আগেই ন্যাশনাল ওশিয়ানিক অ্যান্ড অ্যাটমস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (NOAA) জানিয়েছিল, সূর্যের পরিমণ্ডলে একটি ছিদ্র লক্ষ্য করা গেছে। সেই ফাটল পথেই প্রবল বেগে সৌরবায়ু ছিটকে পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসবে। এর প্রভাব পড়তে পারে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রে। সৌরপদার্থবিজ্ঞানীরা বলেন, অসম্ভব শক্তিশালী সৌরকণারা (solar storm) যদি কোনওভাবে পৃথিবীর অনেক কাছাকাছি চলে আসে তাহলে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের সঙ্গে তাদের ধাক্কাধাক্কি শুরু হবে। সৌরকণাদের সম্মিলিত শক্তি যদি বেশি হয়, তাহলে পৃথিবীর রেডিও বা টেলি যোগাযোগ ব্যবস্থাকে তছনছ করে দিতে পারে।
আমাদের পৃথিবীর যেমন অ্যাটমস্ফিয়ার আছে, সূর্যের তেমন অ্যাটমস্ফিয়ার আছে। সূর্যের পিঠ (সারফেস) ও তার উপরের স্তর যাকে বলে সোলার করোনা। সারফেসের গড় তাপমাত্রা ৫৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। কোথাও ৫৮০০ ডিগ্রি আবার কোথাও ৫২০০ ডিগ্রি সেলসিয়ারের কাছাকাছি। করোনার তাপমাত্রা সেখানে প্রায় ২ লক্ষ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। কখনও তারও বেশি। এই তাপমাত্রার তারতম্য হতে থাকে সবসময়।

এই করোনা স্তর যেখানে শেষ হচ্ছে সেখান থেকেই সৌরঝড়ের জন্ম হয়। এই করোনা উচ্চতাপমাত্রার প্লাজমা আবরণে ঢাকা। এখান থেকেই বেরিয়ে আসে তড়িদাহত কণার স্রোত। প্রচণ্ড গতিতে ছড়িয়ে পড়ে মহাকাশে। একেই বলে সৌরঝড়। সূর্যের চৌম্বকক্ষেত্রে বিশাল পরিমাণ শক্তি রয়েছে। মাঝে মাঝে সেখানে বিকট বিস্ফোরণ হয় ঠিক পরমাণু বোমা ফাটার মতো। সেই শক্তি বেরিয়ে আসে যাকে বলে ‘করোনাল মাস ইঞ্জেকশন।’ এর ফলেই প্রচণ্ড গতির সৌরকণা ও সৌরঝড় পৃথিবীর উপর দিয়েও বয়ে যায়।
ভয়েজারের 'হার্টবিট' শুনল নাসা, হারিয়ে যাওয়া স্যাটেলাইট আচমকা সিগন্যাল পাঠাচ্ছে
সৌরঝড় আছড়ে পড়লে তার শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র ও আয়নগুলো পৃথিবীর টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ও জিপিএস নেটওয়ার্ককে তছনছ করে দিতে পারে। সৌরঝড় (সোলার স্টর্ম) যার দ্বারা স্যাটেলাইটগুলো আক্রান্ত হয় ও টেলি যোগাযোগে বড় ব্যাঘাত ঘটায়। পাশাপাশি, বিশ্বের তাপমাত্রা বাড়ানোর জন্যও দায়ী এই সৌরবায়ু, সৌরঝড় এবং সৌর বিকিরণ। শক্তিশালী সৌরঝড়ের প্রভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে রেডিও ও টেলি যোগাযোগ, ইন্টারনেট ব্যবস্থা, এমনকী বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, সৌরঝড়ের হাত থেকে পৃথিবীকে কিছুটা হলেও রক্ষা করতে পারে ম্যাগনেটোস্ফিয়ার। এখান তড়িৎ-চুম্বকীয় কণার স্রোত ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। যদিও সৌড়ঝড়ের দাপট বেশি হলে পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটগুলি নষ্ট হয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দেয়। এর প্রভাব পড়ে পৃথিবীর মেরু অঞ্চলগুলিতেও। কিন্তু চাঁদে পৃথিবীর মতো এমন সুরক্ষার আবরণী নেই। তার ভরসা পৃথিবীর আঁচলই। কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে চাঁদ যখন পৃথিবীর পিছনে চলে যায় তখন তার সামনে একটা সুরক্ষার বর্ম তৈরি হয়। সেই সময় যদি মহাশূন্যে সৌরঝড় ধেয়ে আসে তাহলে চাঁদের খুব একটা ক্ষতি করতে পারে না। কিন্তু সবসময় তো আর পৃথিবীর আঁচলে ঢাকা থাকে না চাঁদ। তাই বিপদের একটা ঝুঁকি থেকেই যায়। নাসার বিজ্ঞানীরা বলছেন, ২৫% সময় পৃথিবীর পিছনে থাকে চাঁদ, সেই সময় পৃথিবীর ম্যাগনেটোস্ফিয়ারের ছত্রছায়ায় তার সুরক্ষার ব্যবস্থা হয়ে যায়। কিন্তু নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বলছেন, সবসময় এটা হয় না। পৃথিবীর ম্যাগনেটোস্ফিয়ার চাঁদকে সবসময় বাঁচাতে পারে না।
সৌরঝড় যদি দুরন্ত বেগে ধেয়ে আসে এবং এর মধ্যেকার তড়িদাহত কণার স্রোত যদি বেশি থাকে তাহলে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রও আহত হয়। চাঁদকে পুরোপুরি সুরক্ষা দিতে পারে না। এমনকি সৌরঝড়ের যদি প্রচন্ড শক্তিশালী হয় তাহলে এর আঘাতে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের আকার, গঠনও বদলে যেতে পারে।