দ্য ওয়াল ব্যুরো: "আমরা তো ভেবেছিলাম পড়ুয়াদের জন্যে সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা দিল্লি! আমি তো ভেবেছিলাম আমার বিশ্ববিদ্যালয়েই আমি সবচেয়ে নিরাপদ, আমাদের কিছুই হবে না। কিন্তু কী হচ্ছে এইসব! আমরা সারা রাত ধরে কেঁদেছিলাম কাল..."—বলতে বলতে আবারও কেঁদে ফেলেন তরুণী। রবিবার জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন আক্রমণ করেছে পুলিশ, তখন সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে মার খেয়েছেন তিনি।
কেন করেছেন এমন? কোন তাগিদ থেকে নেমেছেন পথে? তরুণীর উত্তর, "আমি কিন্তু মুসলিম নই। তবুও আমি প্রথম দিন থেকে এই প্রতিবাদ-বিক্ষোভের সামনে রয়েছি। আমার পরিবারের কিছু হয়েছে কিনা তা নিয়ে কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন, কিন্তু আমি মনে করি, আমরা ন্যায়ের পথে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারলে আমাদের পড়াশোনা অর্থহীন!"
তরুণীর এই বক্তব্যের ভিডিও ভাইরাল হয়ে যায় সোমবার সকালে। নেটিজেনদের একটা বড় অংশ কুর্নিশ জানিয়েছেনন এই লড়াকু মানসিকতাকে, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সদিচ্ছাকে। ঝাড়খণ্ডের রাঁচি থেকে জামিয়া মিলিয়ায় পড়তে এসেছেন ওই তরুণী। জন্মগত ভাবে হিন্দু পরিবারের সন্তান হলেও, ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে বিভাজনে বিশ্বাস করেন না তিনি। তাই ছাত্রদের বিরুদ্ধে নেমে আসা এই আক্রমণের প্রতিবাদে মাথা তুলে দাঁড়াতে দু’বার ভাবেননি।
তিন দিন আগে থেকেই এই অশান্তির সূত্রপাত। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা ক্যাবের বিরোধিতায় শুক্রবার থেকে আন্দোলনে নামেন জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার পড়ুয়ারা। রবিবার তা চরম আকার ধারণ করে। এদিন নিউ ফ্রেন্ডস কলোনিতে প্রথমে পড়ুয়ারা বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। মথুরা রোড-সহ একাধিক রাস্তা অবরূদ্ধ হয়ে যায় বিক্ষোভের জেরে। যান চলাচলের উপরে তীব্র প্রভাব পড়ে। কয়েক হাজার মানুষের বিক্ষোভে প্রায় স্তব্ধ হয়ে যায় রাজধানী। প্রভাব পড়ে মেট্রোর উপরেও। পরিস্থিতি সামাল দিতে নাকানিচোবানি খেতে হয় পুলিশকে।
রবিবার সন্ধেয় বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে দেশের রাজধানী। রীতিমতো সহিংস রূপ পায় গোটা আন্দোলন। শেষমেশ লাঠিচার্জ থেকে কাঁদানে গ্যাস— বাদ পড়েনি কিছুই। রাস্তায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তিও শুরু হয়ে যায় পুলিশের। এর পরে উত্তেজনা আরও বাড়ে। বেশ কয়েকটি গাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে। বিকেলে, পুলিশের তাড়া খেয়ে ছাত্ররা ঢুকে পড়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে।
এর পরেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছয় পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কিছু ‘বহিরাগত’কে এদিন গ্রেফতার করে পুলিশ। অভিযোগ, এদিন বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে প্রথমেই প্রধান ফটকগুলি বন্ধ করে দেয় পুলিশ। এই সময়েই দেখা যায়, প্রাণভয়ে পালাচ্ছেন পড়ুয়ারা। লাইব্রেরিতে গিয়ে লুকোলেও পুলিশের হামলা থেকে বাঁচেননি অনেকে। অনেকে ঝোপে লুকিয়ে পড়েন। এদিক-ওদিক রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায় বহু ছাত্রছাত্রীকে। ১০০ জন শিক্ষার্থীকে আটক করে পুলিশ।
চোখের সামনে নিজের সহপাঠীদের এমন অবস্থা দেখে আরও অনেকের মতোই আতঙ্কে সিঁটিয়ে যান তিনিও। হস্টেল ছেড়ে চলে যেতে হবে বলে ঠিক করতে বাধ্য হন।
কিন্তু তাতেও কি আতঙ্ক পিছু ছাড়ে! "আমি তো এই গোটা দেশের কোথাও নিরাপদ বোধ করছি না। কোথায় যাব, কোথায় থাকব তা আমি জানি না। আমার বন্ধুরা আগামী কাল আমার দেশের মাটিতে থাকবে কিনা, আমি তাও জানি না। এই অনিশ্চয়তা কখনও জীবন হতে পারে না। হস্টেলের ভিতরে পুলিশ ঢুকে পড়চে, এটা কোন গণতন্ত্র!"—ক্ষোভ ও হতাশা উপচে পড়ে তরুণী ছাত্রীর গলায়।
তিনি আরও বলেন, "এই ঝামেলা শুরু হওয়ার সময় আমরা লাইব্রেরিতে ছিলাম। সুপারভাইজার আমাদের ফোন করে জানান, পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে ক্যাম্পাসে। আমি সবে বেরোতে যাব, তখনই একটি ভিড় ছুটে আসে লাইব্রেরির দিকে। গোটা লাইব্রেরি চত্বর ভরে যায়। অনেকেই তাদের মধ্যে রক্তাক্ত। কিছু বুঝে ওঠার আগেই লাইব্রেরিতে ঢুকে পড়ে পুলিশ। অকথ্য ভাষায় গালি দিতে শুরু করে। ক্রিমিনালের মতো মাথার ওপর হাত তুলে আমাদের নিয়ে যায় ভেতরে।"
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তরফে চিফ প্রোক্টর ওয়াসিম আহমেদ খানের অভিযোগ, “পুলিশ বাহিনী ক্যাম্পাসে ঢুকে পড়ে কোনও অনুমতি ছাড়াই। আমাদের কর্মী এবং ছাত্রদের মারধর করা হচ্ছে। তাদের ক্যাম্পাস ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।” পুলিশ যদিও এই অভিযোগ অস্বীকার করে। তাদের দাবি, ভেতর থেকে ছাত্রছাত্রীরা পাথর ছুড়ছিলেন বলে তারা দেখতে ঢুকেছিল, কোথা থেকে হিংসা ছড়াচ্ছে।