দ্য ওয়াল ব্যুরো: দেশের উত্তর-পূর্ব প্রান্তের একটা ছোট্ট গ্রাম থেকে অস্ট্রেলিয়ার কমনওয়েল্থ গেমসের আসরে সোনা জয় করা স্প্রিন্টার কন্যা হিমা দাসের নাম এখন কে না জানে! তাঁর কঠিন লড়াইয়ের কথাও সামনে এসেছে একাধিক বার। হবে না-ই বা কেন। আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাবড় প্রতিযোগীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, মাত্র ১৫ দিনে পরপর চারটি সোনা জয় করে এনেছে যে মেয়ে, তার গল্প যে বহু মানুষের অনুপ্রেরণা হবে, তা বলাই বাহুল্য।
তাঁর সেই লড়াইয়ের গল্পই এবার উঠে এল তাঁর নিজের মুখে, একটি ফেসবুক পোস্টে। ফেসবুকের জনপ্রিয় পেজ 'হিউম্যানস অফ বম্বে' থেকে প্রকাশিত হয়েছে এই পোস্ট। এবং তার কিছুক্ষণের মধ্যেই রীতিমতো ভাইরাল হয়ে গিয়েছে পোস্টটি। বহু মানুষের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দনে ভরে গিয়েছেন হিমা।
"আমার মা-বাবা দু'জনেই ধানখেতের চাষি। একটা বড় পরিবারে ছোটবেলা কেটেছে আমার। টাকাপয়সার মুখ দেখিনি কোনও দিনই। কিন্তু আমার মা-বাবা সব সময় বলতেন, যতটুকু আছে ততটুকু দিয়েই সেরা কাজটা করার কথা।"-- এভাবেই নিজের কথা বলতে শুরু করেছেন হিমা। পরে বলেছেন, তাঁর মা-বাবা জানতেনই না, কমনওয়েল্থ গেমস কী। বুঝতেনই না, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার অর্থ। কিন্তু টিভিতে মেয়েকে দেখেই খুশি হতেন তাঁরা। গর্বিত হতেন।
স্কুলজীবনের কথাও বলেছেন হিমা। জানিয়েছেন, ছোটবেলায় স্কুলে পড়ার সময়ে তাঁর প্রিয় খেলা ছিল ফুটবল। কিন্তু খেলার জুতোও ছিল না একজোড়া। খালি পায়েই খেলতেন। ফুটবল খেলার সময়ে তাঁর দৌড়নো দেখে অবাক হয়েছিলেন স্কুলের পিটি শিক্ষক। তিনিই প্রথম হিমাকে বলেছিলেন, জেলা স্তরের অ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতায় নামতে। সেখানে যোগ দেওয়া এবং জিতে যাওয়াই হিমার জীবনের মোড় এক বিশেষ দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিল। তিনি যে দৌড়তে পারেন, তা তখনই জানা হয়েছিল হিমার।
"ওই প্রতিযোগিতার সময়েই আমার দিকে নজর পড়েছিল দু'জন কোচের। ওঁরা আমায় অসমে একটা রানিং ক্যাম্পে যোগ দিতে বলেছিলেন। প্রথমে ভেবেছিলাম বাড়ি থেকে আপত্তি করবে, কিন্তু পরে বাবাই উৎসাহ দিলেন।"-- বলেন হিমা। সেই ক্যাম্পেই সূর্যের আলো ফোটার আগে ঘুম থেকে উঠে শুরু হতো অনুশীলন। সারাদিন ধরে চলত অমানুষিক পরিশ্রম। স্প্রিন্টার হওয়া সহজ নয়, তখনই বুঝেছিলেন হিমা। কিন্তু এ কঠিন কাজ রপ্ত করতেও বেশি সময় লাগেনি তাঁর।
হিমা বলেন, "কঠিন পরিশ্রম, হাড়ভাঙা অনুশীলনের ফল পেয়েছিলাম। এশিয়ান ইউথ চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করার জন্য কোয়ালিফায়েড হলাম এবং সেখানে সপ্তম হলাম। এর পরে ওয়ার্ল্ড ইউথ চ্যাম্পিয়নশিপে পঞ্চম হলাম। এর পরেই তো এশিয়ান গেমসের আন্ডার ২০ বিভাগে ভারতীয় হিসেবে প্রথম সোনা জয় করলাম।"
দেখুন হিমার সেই পোস্ট।
https://www.facebook.com/humansofbombay/photos/a.253147214894263/1202636709945304/?type=3&theater
২০১৮ সালের এই চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতীয় হিসেবে সোনা আনা স্পোর্টস দুনিয়ায় একটি ইতিহাস তৈরি করেছিল। এর পরে আর বাধা পেতে হয়নি হিমাকে।
"আজ আমার অপ্রাপ্তি বলতে কিছু নেই। রাষ্ট্রপতির হাত থেকে অর্জুন পুরস্কার পেয়েছি। দেশের জন্য এত এত পদক এনেছি। তার চেয়েও বড় কথা, লক্ষ লক্ষ মানুষকে গর্বিত করতে পেরেছি আমি, তাঁদের ভালবাসা পেয়েছি।"-- বলেন হিমা।
এই পোস্টটি প্রকাশিত হওয়ার পরেই লাইক-কমেন্টের বন্যা বয়ে যায় ফেসবুকে। বহু বহু মানুষ অভিনন্দন জানিয়ে শেয়ার করেছেন হিমার পোস্ট। কেউ কেউ বলেছেন, দেশের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপুজোর সময়ে, এ যেন এক রক্তমাংসের দুর্গার গল্প। যে দুর্গা একদিন খেলার জন্য জুতোটুকুও কেনার সামর্থ্য ছিল না, আজ তাঁরই নামে করা হয়েছে নামী-দামি ব্র্যান্ডের জুতো। তাই হিমা বলেছেন, "আপনার স্বপ্নের প্রতি আপনি বিশ্বস্ত হলে, সাফল্য আসবেই।"