
রামকৃষ্ণ দেবের ছবি এবং স্বামী বিবেকানন্দের ছবি
শেষ আপডেট: 13 March 2024 21:07
শ্রীরামকৃষ্ণকে কেন্দ্র করে ত্যাগী সন্ন্যাসীরা একটি ধর্মসঙ্ঘ গড়ে তুলতে সক্রিয় ছিলেন। তখন মূর্তি পূজা নিন্দনীয় , কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণ সেই মূর্তিপূজার মধ্য দিয়ে অদ্বৈতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। এইখানে বসে তাঁরা আলোচনা করতেন , শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন`, ` বেদান্ত যে নিরাকার বা নির্গুণের কথা বলিতেছে সেতো ঠিক কথা , কিন্তু তা বলে বিগ্রহ পূজা করে মুক্তি হবে না কেন? পথ কি একটা গণ্ডীর ভিতর? পথের ঝগড়া করতে গেলে আসল জিনিস হারিয়ে যায় । এই তো চোখের সামনে তাঁকে দেখলুম , মূর্তি পূজা করে এত উচ্চ অবস্থায় উঠেছিলেন।` এই সর্ব পথের সত্যতাকে স্বীকার করা বরাহনগর মঠের মধ্যে ছোট অঙ্কুরের জন্ম দিয়েছিল । তা আজ মহীরূহে পরিণত।
যত মত তত পথের বাণীর সঙ্গে ছিল অসামান্য ত্যাগের অভ্যাস। স্বামী প্রেমানন্দ বা বাবুরাম মহারাজ শ্রীরামকৃষ্ণ সম্বন্ধে একটি ছোট্ট পুস্তিকায় জানিয়েছেন , যখন দক্ষিণেশ্বরে সাধনা করছেন শ্রীরামকৃষ্ণ তখন বারো বছর তাঁর চোখের পাতা পড়েনি।কেবল তাই নয় , মাথায় এমন ধুলোর আস্তারণ জমে ছিল তার মধ্যে ছোট ছোট ঘাস জাতীয় অঙ্কুর গজিয়েছিল , পাখিরা সেই মাথায় বসে সেই মাথায় বসা মাটি থেকে বীজ তুলে খেত! এই দেহবোধহীন সাধনার প্রতিফলন দেখলাম বরাহনগর মঠে। একদিন নরেন্দ্র আর তারকনাথ সিমলের বাড়িতে এসে উপস্থিত। উড়োখুড়ো চুল , কতদিন তাতে তেল দেওয়া হয়নি। স্বামী শিবাননন্দ স্বামীজির ভাই মহেন্দ্রনাথের কাছ থেকে একটু মাজন চাইলেন , শেষ কবে দাঁত মেজেছেন তা মনে নেই। দুজনের অবস্থা দেখে মহেন্দ্রনাথ দত্ত আর স্বামীজির চেলা গুপ্ত মহারাজ দুজনে মিলে দুই শ্রীরামকৃষ্ণ সন্তানকে স্নান করাতে শুরু করলেন। জল ঢালেন আর গা দিয়ে কাদামাটি বের হয়। কেবল জলে হল না। দুজনে মিলে ভাল করে গা ডলতে শুরু করলেন। এ যে কাদার আস্তরণ ! বহুক্ষণ পর দুজনের স্বাভাবিক ত্বকের দেখা মিলল ।
খাদ্যাভ্যাসকে শুদ্ধতা ব্যতীত আর কিছু দিয়ে বাঁধেননি শ্রীরামকৃষ্ণ। তিনি তাঁর যুবক সন্তান গঙ্গাধর বা অখণ্ডানন্দকে বলেছিলেন , ` দেখ , নরেন দিনে একশোটি পান খায়, মাছমাংস সব খায়। কিন্তু পথ দিয়ে যখন চলে তখন সবই ব্রহ্মময় দেখে। ভগবানকে প্রত্যক্ষ করাই আসল ধর্ম।` অখণ্ডানন্দকে তিনি বলেছিলেন বটে কিন্তু তার নিরামিষে নিষ্ঠা তিনি ঘোচাতে পারেননি। বরাহনগর মঠে একদিন স্বপ্ন দেখলেন গঙ্গাধর , ঠাকুর তাঁকে বলছেন , ‘-নিজেকে খুব বড় ভাব তাই না ! যারা মাছ খায় তাদের প্রতি বিদ্বেষ কর!` শ্রীরামকৃষ্ণের ক্রোধ দেখে গঙ্গাধর ধড়ফড় করে উঠলেন, সেই রাতেই মাছকাটার আঁশবটি জিবে ছুঁইয়ে সকলের কাছে ক্ষমা চাইলেন।সকলের প্রতি সেবার ভাবেরও জন্ম হয়েছিল বরাহনগর মঠে, পরস্পরের সেবার মধ্য দিয়ে।
সে যুগে সাকার নিরাকার , আমিষ-নিরামিষের দ্বন্দ্বই ধর্মপ্রসঙ্গে প্রধান ছিল । শিব জ্ঞানে জীব সেবার ধারণা ধারণ করা তো দূরের প্রসঙ্গ । শ্রীরামকৃষ্ণ ধর্মচেতনাকে তুচ্ছ আচারের উর্ধ্বে স্থাপন করেছিলেন। সৃষ্টি করেছিলেন কয়েকজন সন্ন্যাসী সৈনিক,যাঁদের জীবনসঙ্গীতের মূল রাগ ছিল শ্রীরামকৃষ্ণ। তার সুর গাঁথা ছিল বৈরাগ্যের তানে। জীবনসঙ্গীত ছিল শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি আনুগত্যপূর্ণ, ` তু দেওয়ান তু দেওয়ান তু দেওয়ান মেরা `। প্রভুর গোলাম ছিলেন তাঁরা । বিবেকানন্দ শুধু তাঁর প্রিয় এই সঙ্গীতটি গাইতেনই না, তা জীবনে প্রস্ফুটিতও করেছিলেন। তাই তাঁর প্রতিষ্ঠিত আন্দোলন হয়ে উঠেছিল শ্রীরামকৃষ্ণ আন্দোলন। রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনে যা বর্তমানেও পরিস্ফুট।