দ্য ওয়াল ব্যুরো: এখনও পর্যন্ত এক শিশু-সহ আট জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে গ্যাসটি। হাসপাতালে অসুস্থ অবস্থায় ভর্তি হতে হয়েছে প্রায় হাজার মানুষকে। বৃহস্পতিবার ভোর রাতে বিশাখাপত্তনমের বেঙ্কটপুরম এলাকার কেমিক্যাল প্লান্ট থেকে গ্যাস লিক হওয়ার পরে এমনই অবস্থা সেখানে। জানা গেছে, যে গ্যাসটি লিক হওয়ায় এই বিপদ, তার নাম '
স্টাইরিন'।

এই স্টাইরিন কী, কীসে কাজে লাগে লাগে, তা নিয়ে কৌতূহল রয়েছে অনেকেরই। কিন্তু মানবদেহে এর প্রভাব কতটা এবং কেমন, তা পর্যালোচনা করে আঁতকে উঠছেন বিশেষজ্ঞরা। হাল্কা হলদে বা প্রায় বর্ণহীন এই গ্যাসটির একটি মিষ্টি গন্ধ রয়েছে। বেঞ্জিন থেকে উৎপাদিত এই অর্গানিক গ্যাসটিকে ইথানিলবেঞ্জিনও বলা হয়। এর রাসায়নিক নাম C
6H
5CH=CH
2।
স্টাইরিন সাধারণ তাপমাত্রায় তরল অবস্থায় থাকে। ওই অবস্থাতেই গ্যাসটি কাজে লাগে প্লাস্টিক ও রবার শিল্পে। দেশজুড়ে বড়বড় কারখানাগুলিতে এর ব্যাপক ব্যবহার। বিভিন্ন প্যাকেজিং মেটেরিয়াল, ওয়্যারিং, ফাইবারগ্লাস, প্লাস্টিকের পাইপ, গাড়ির যন্ত্রাংশ, প্লাস্টিকের কাপ-- এই সব কিছু তৈরিতেই স্টাইরিন গ্যাস ব্যবহৃত হয়।

মানবদেহে এই গ্যাসের ঠিক কেমন ও কতটা প্রভাব তাই নিয়ে সেভাবে পরীক্ষা চালানো হয়নি কখনও, তাই নিশ্চিত করে সবটুকু এখনও জানা যায়নি। কিন্তু রসায়ন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্লেষণ করে এ গ্যাসের যা চরিত্র জানা যায়, তাতে একথা নিশ্চিত, যে এই গ্যাস শরীরে ঢুকলে প্রথমে শ্বাসকষ্ট হবে ও নাক-চোখ জ্বালা করবে। বমি হবে। জ্ঞান হারাবেন অনেকে।
বিশাখাপত্তনমে আজ হয়েওছে এমনই। রাস্তায়, নর্দমায় জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেছেন একের পর এক মানুষ। সারা শরীরে জ্বালাপোড়া ও শ্বাসকষ্টে অস্থির হয়ে উঠেছেন এলাকাবাসী।
কিন্তু বিপদের কথা হল, অল্প পরিমাণে গ্যাস কিছু সময়ের জন্য শরীরে ঢুকে থাকলেও তা দুটো ঘটনা ঘটাতে পারে। প্রথমত, স্নায়ুতন্ত্রকে প্রভাবিত করতে পারে, যার ফলে চিরকালের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে মানুষ। দ্বিতীয়ত, এটি কার্সিনোজেনিক অর্থাৎ এই গ্যাসের প্রভাবে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ এই গ্যাসের কারণে জিনের পরিবর্তন (মিউটেশন) ঘটার কারণ প্রবল। মূলত চোখের ও ত্বকের ক্যানসার সহজে ঘটাতে পারে এই গ্যাসটি।
ইউনাইটেড এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সি জানিয়েছে, অল্প সময়ের জন্য সামান্য পরিমাণ স্টাইরিন গ্রহণ করলেও মস্তিষ্কের মিউকাস মেমব্রেন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। চোখের ওপরেও প্রভাব ফেলবে এই গ্যাস। পাচনতন্ত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর বেশিক্ষণ যদি এই গ্যাসের মধ্যে কেউ থাকেন, তাহলে গোটা স্নায়ুতন্ত্রই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যার ফলে সঙ্গী হতে পারে আজীবন শারীরিক দুর্বলতা। শ্রবণশক্তি কমে যতে পারে। মাথাব্যথা, ক্লান্তিতে অস্থির হয়ে উঠতে পারে মানুষ।

গুয়াহাটি আইআইটির রসায়ন বিভেগের অধ্যাপক পরমেশ্বর আইয়ার জানিয়েছেন, এই স্টাইরিনের যা চরিত্র, তাতে এটি ৪-৫ কিলোমিটার পরিধি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে না। যে ঘটনা বিশাখাপত্তনমে ঘটেছে, যত দূর পর্যন্ত মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন, তাতে মনে হচ্ছে, অন্য কোনও গ্যাসও লিক করেছে। সেই গ্যাসের সঙ্গেই স্টাইরিন মিশে গিয়ে এত বড় বিপত্তি হয়েছে।
পুণের ন্যাশনাল কেমিক্যাল ল্যাবরেটরির প্রাক্তন ডিরেক্টর স্বামীনাথন শিবরামও জানালেন, শুধু স্টাইরিনের কাজ এটি নয়। তাঁর কথায়, "স্টাইরিন সাধারণত তরল অবস্থায় থাকে প্লান্টে। কারণ সেভাবেই এর ব্যবহার হয়। অতি উচ্চ তাপমাত্রায় এটি উদ্বায়ু গ্যাসে পরিণত হয়। মনে হচ্ছে, অন্য কোনও গ্যাস লিক করেছে বিশাখাপত্তনমে, যাতে স্টাইরিনের ভেপার মিশে গেছে। নইলে বিপদের মাত্রা আরও বেশি হতো।"

প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, মার্চের লকডাউনের সময় থেকেই এই প্লান্টটি পুরোপুরি বন্ধ ছিল। দেখাশোনাও হয়নি সেভাবে। তাই ঠিক কী হয়েছে, কী কী গাফিলতি ছিল, তা বিস্তারিত ভাবে খতিয়ে না দেখে এক কথায় বলা মুশকিল বলেই জানিয়েছেন তদন্তকারীরা। সবে কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমতি মিলেছিল কারখানা খোলার। তার পরেই ঘটে গেল এত বড় বিপদ।