দ্য ওয়াল ব্যুরো: ছিল জুতো, হয়ে গেল স্যানিটাইজার! না না, কোনও ম্যাজিক বা স্বপ্ন নয়। নিছক বাস্তব। কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবির একটি দোকানের এই সামান্য বদলই যেন রূপকথা লিখছে দরিদ্র সে দেশে। 'সেফ হ্যান্ডস কেনিয়া' নামক উদ্যোগে শুরু হয়েছে এই প্রচেষ্টা। সামিল হয়েছেন সাধারণ মানুষও, নিজেদের সাধ্যমতো। তাতেই কাজ হচ্ছে অন্য অনেক দেশের চেয়ে বেশি। এই মুহূর্তে সে দেশে করোনায় আক্রান্ত ২২৫ জন, মারা গেছেন ১০ জন। সে দেশের জনসংখ্যার তুলনায় যা বেশ কম।
মার্চের পর থেকেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বব্যাপী মহামারী ঘোষণা করে কোভিড ১৯-কে। বিশ্বজুড়ে দীর্ঘ হয়ে চলেছে মৃত্যুমিছিল। সামান্য কয়েকটি ছোট দেশ ছাড়া, আর কেউ বলতে গেলে ছাড় পায়নি এই মারণভাইরাসের হাত থেকে। কিন্তু মৃত্যর ঝুঁকির চেয়েও এই অসুখের সব থেকে বড় ভয়, এর দ্রুত সংক্রমণ ক্ষমতা।
উল্টোদিকে, ওষুধ প্রতিষেধক কিছুই আবিষ্কৃত হয়নি এখনও। তাই বিশ্বজুড়ে বিশেষজ্ঞদের একটাই মত সামাজিক দূরত্ব বজায়, অন্তত কিছুদিনের জন্য পারস্পরিক সংস্পর্শে না আসা, ঘনঘন সাবান অথবা অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধোওয়া। এই সামাজিক দূরত্ব বজায় রক্ষার তাগিদেই পৃথিবীর বহু দেশ লকডাউনের অধীনে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, একটি ঘন জনবসতিপূর্ণ ও দারিদ্র্য সীমার নিচে থাকা অঞ্চলে কার্যত কি আদৌ সম্ভব এই লকডাউন? ইতিমধ্যেই নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন লকডাউন বা সামাজিক দূরত্ব বজায়ের মত সিদ্ধান্ত দরিদ্র দেশগুলির জন্য কঠিন। অন্তত সেই সব দেশে যেখানে মানুষের হাতে অর্থ নেই, তাই পেটের দায়েই মানুষকে যে কোন প্রকারে বাইরে আসতেই হবে। একই সুরে সুর মিলিয়েছেন আরও দুই নোবেলজয়ী এস্থার ডাফলো এবং অমর্ত্য সেনও। এই সব দেশগুলিতে ছোট ছোট এলাকায় ছোট ছোট স্থানীয় উদ্যোগের কথাই বলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারই উদাহরণ গড়তে পেরেছে 'সেফ হ্যান্ডস কেনিয়া'র মতো উদ্যোগ। পৃথিবীর অন্যতম দরিদ্র মহাদেশগুলির মধ্যে আফ্রিকা একটি। জনবহুল তো বটেই। করোনার আতঙ্ক সেখানেও কিছু কম ছিল না। তার ওপরে কয়েক বছর আগের ইবোলা-মহামারীর ক্ষত এখনও সেখানে টাটকা। তাই সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও ছোট ছোট পদক্ষেপ সেখানে জরুরি।

যেমন নাইরোবির এক জুতো ব্যবসায়ী নিকানর ওচিইয়েং। ড্যান্ডোরা নামের এক জনবসতিপূর্ণ দরিদ্র অঞ্চলে ২৯ বছরের নিকানর জুতোর দোকান চালাতেন। কিন্তু এখন তাঁর সেই দোকানে বিনামূল্যে পাওয়া যাচ্ছে হ্যান্ড স্যানিটাইজার। শুধু স্যানিটাইজার না, বিভিন্ন সামগ্রী যেমন মাস্ক, সাবান এই সময়ে প্রয়োজনীয় এরকম বেশ কিছু জিনিসে সেজে উঠেছে তার সেই জুতোর দোকান। 'সেফ হ্যান্ডস কেনিয়া'র সহায়তাতেই নিকানর এই প্রচেষ্টায় সামিল হয়েছে। নিকানরের মতো আরও বহু মানুষ এই ভাবেই কাজ করে যাচ্ছেন নিজের নিজের এলাকায়।
বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মানুষদের হাতে প্রতিমুহূর্তে পৌঁছে যাচ্ছে এ সব প্রয়োজনীয় জিনিস। দারিদ্রসীমার নীচে থাকা যে সব মানুষ রোজগারের তাগিদে ঘরে বসে থাকতে অক্ষম, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাও কার্যত অসম্ভব, তাঁদের পক্ষে লড়ছে 'সেভ হ্যান্ডস কেনিয়া'।
নিকানরের মতে, ড্যান্ডরার মোটো জনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে করোনার সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা সব থেকে বেশি ছিল। কিন্তু মানুষকে এভাবেই প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। শুধু খাদ্যসমস্যা নয়, বেশ কিছু জায়গায় জলের সমস্যাও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে সাবান খুব বেশি ব্যবহার করা মুশকিল। এই অবস্থায় স্যানিটাইজার ছাড়া উপায় নেই। সেই কারণেই তাঁর এভাবে এগিয়ে আসা। ছোট উদ্যোগ, বড় উদ্দেশ্য।
প্যানডেমিক বা বিশ্বব্যাপী মহামারী খুব ভয়ংকর হলেও তা আদতে নতুন বা বিরল নয়। পৃথিবীর ইতিহাসে বহু মহামারী দাপট দেখিয়েছে এর আগে। আবার সভ্যতার ইতিহাস তাকে বারবার করায়ত্তও করেছে। করোনাও হয়তো একদিন পৃথিবীর ইতিহাসে পরাজিত হবে। কিন্তু সেই ইতিহাসের পাতায় নিকানরদের মত যুবকদের এই ছোট ছোট লড়াই হয়তো চাপাই পড়ে থাকবে।