কেরলের সায়ানাইড-কিলার: হাসিখুশি 'অধ্যাপিকা', ধার্মিক জলি কেন খুনি হয়ে গেলেন, সরছে রহস্যের পর্দা
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দু'পাশে দুই মহিলা কনস্টেবল। মাঝে সিরিয়াল কিলার জলি জোসেফ। সামনে-পিছনে অন্তত একশো পুলিশকর্মী। আদালত চত্বর থেকে বেরনোর পর পুলিশি ঘেরাটোপে জলিকে দেখতে গতকাল উপচে পড়েছিল ভিড়। রাস্তায় যাঁদের ঠাঁই মেলেনি, তাঁরা আশ্রয় নিয়েছিলেন
শেষ আপডেট: 11 October 2019 18:30
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দু'পাশে দুই মহিলা কনস্টেবল। মাঝে সিরিয়াল কিলার জলি জোসেফ। সামনে-পিছনে অন্তত একশো পুলিশকর্মী। আদালত চত্বর থেকে বেরনোর পর পুলিশি ঘেরাটোপে জলিকে দেখতে গতকাল উপচে পড়েছিল ভিড়। রাস্তায় যাঁদের ঠাঁই মেলেনি, তাঁরা আশ্রয় নিয়েছিলেন স্থানীয়দের বাড়ির ছাদে, বারান্দায়। গোটা দেশকে নাড়িয়ে দেওয়া এই জলিকে কিন্তু অন্যভাবেই চিনতেন প্রতিবেশী, আত্মীয়রা। গৃহবধূ নয় বরং তাঁর পরিচয় ছিল একজন অধ্যাপিকা হিসেবে।
২০০২ সাল থেকে ২০১৬ পর্যন্ত পরিবারের ছয় সদস্যকে খুন করার অভিযোগে গত শনিবার জলি জোসেফকে গ্রেফতার করে কেরল পুলিশের অপরাধ দমন শাখা। জলির সঙ্গেই পাকড়াও করা হয় তাঁর বর্তমান স্বামী শাজু, জলির বন্ধু এমএস ম্যাথু এবং জলিকে সায়ানাইড পাচারে সাহায্য করা প্রাজিকুমারকে। বুধবার তাঁদের আদালতে তোলা হয়। পরবর্তী শুনানি হবে আগামী বুধবার। বিচারক উচ্চপর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। আপাতত তিনজনকে ছ’দিনের পুলিশি হেফাজতে রাখা হবে। সব তথ্যপ্রমাণ আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই আদালতে পেশ করা হবে বলে জানিয়েছেন তদন্তকারী অফিসাররা।
যত দিন যাচ্ছে একটু একটু করে রহস্যভেদ করছেন তদন্তকারীরা। জলির প্রকৃত পরিচয় ধীরে ধীরে সামনে আসছে। ইদ্দুকির কাট্টাপানার সম্ভ্রান্ত ক্যাথলিক পরিবারের মেয়ে জলিকে ধার্মিক বলেই এলাকায় চিনতেন সকলে। বিয়ের আগে নিয়মিত চার্চে প্রার্থনা করতে যেতেন জলি। একই অভ্যাস ছিল বিয়ের পরেও। নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন এনআইটি (ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি)-র অধ্যাপিকা হিসেবে। পুলিশ সুপার কেজি সিমন জানিয়েছেন, সেখানকার রেজিস্টার পঙ্কজাকশানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা যায়, এনআইটিতে এমন কোনও মহিলা ছিলেন না যাঁর নাম জলি। অথচ জলির শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়রা শুধু নন, পাড়া-প্রতিবেশীরাও জানতেন রোজ সকালে গাড়ি চেপে জলি কলেজে যান। প্রতিদিন সকালে জলি তাহলে কোথায় যেতেন? সেটা এখনও রহস্য তদন্তকারীদের কাছে।
শান্ত স্বভাব ও ঠাণ্ডা মেজাজের জলি নাকি কোনওদিন উঁচু গলায় কথাই বলেননি। স্থানীয়দের থেকে পুলিশ খোঁজ নিয়ে জেনেছে, সবসময়েই মুখে হাসি লেগে থাকত জলির। সকলের সঙ্গে মিষ্টি ব্যবহার করতেন। আপাত ভদ্রতার আড়ালে এমন একজন ঠাণ্ডা মাথার খুনি লুকিয়ে রয়েছেন, সেটা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি কেউ। তদন্তকারীদের দাবি, সম্পত্তি আর ক্ষমতার লোভ সাঙ্ঘাতিক ভাবে ছিল জলি জোসেফের। মনে করা হচ্ছে, তিনি একজন সাইকোপ্যাথ। খুনের নেশা চেপে বসেছিল তাঁর।
৪৭ বছরের এই সিরিয়াল কিলার জানিয়েছেন, প্রথম খুনটা তিনি করেন ২০০২ সালে। প্রথম শিকার ছিলেন তাঁর শাশুড়ি আন্নামা টমাস। ৫৭ বছর বয়সী আন্নাম্মা আচমকাই মারা যান। গোটা ঘটনাটা এমনভাবে সাজিয়েছিলেন জলি যাতে মনে হয় স্বাভাবিক মৃত্যু। তদন্ত শুরু হলেও সেটা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় পুলিশ। তদন্তকারী অফিসার সিমন জানিয়েছেন, আন্নামা ছিলেন পরিবারের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী মহিলা। সম্পত্তির দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। কাজেই সবচেয়ে আগে তাঁকে সরাবার প্রয়োজন ছিল।
শাশুড়ির মৃত্যুতে পথের কাঁটা অনেকটাই সরে যাওয়ায় জলির পরবর্তী লক্ষ্য ছিল তাঁর স্বামী রয় টমাস এবং শ্বশুর মানে আন্নামার স্বামী টম। ২০০৮ সালে টমকে খুন করেন জলি। দেখানো হয় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েই মৃত্যু হয়েছে টমের। তৃতীয় খুন ২০১১ সালে। ৪০ বছর বয়সে একই ভাবে মৃত্যু হয় তাঁদের ছেলে তথা অভিযুক্ত জলির স্বামী রয় টমাসের। পর পর তিনটি মৃত্যুর পরে সন্দেহ হয় পুলিশের। রয় টমাসের মৃতদেহ ময়নাতদন্তে পাঠানো হলে রিপোর্টে বিষক্রিয়ার বিষয়টি উঠে আসে।
রয় টমাসের মৃত্যুর ঠিক দু’বছর পর, ২০১৬ সালে টমাসের খুড়তুতো ভাই শাজু-র স্ত্রী এবং এক বছরের মেয়ে অ্যালফনসার মৃত্যু হয়। পর পর মৃত্যুতে বিপর্যস্ত পরিবার এ বার পুলিশের দ্বারস্থ হয়। তদন্ত শুরু হয় জোরকদমে। এরই মধ্যে শাজুর সঙ্গে দ্বিতীয় বার বিয়ে হয় জলির। শ্বশুর রয় টমাসের উইল মাফিক সমস্ত সম্পত্তির উপর নিজের মালিকানা দাবি করে জলি। বাধ সাধেন জলির দেওর মোজো। তাকেও খুন করে জলি। রহস্যমৃত্যুর জট খুলতে গিয়ে কবর খুঁড়ে নিহতদের মৃতদেহের ফরেন্সিক পরীক্ষা হয়। তাতে দেখা যায়, মৃত্যুর আগে প্রত্যেকেই কিছু না কিছু খেয়েছিলেন। প্রত্যেকের শরীরে সায়ানাইডের অস্তিত্ব মেলে।
পড়ুন, দ্য ওয়ালের পুজোসংখ্যার বিশেষ লেখা...
https://www.four.suk.1wp.in/pujomagazine2019/%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a7%81-%e0%a6%ab%e0%a6%b2-%e0%a6%90%e0%a6%b6-%e0%a6%b0%e0%a7%8b%e0%a6%b7-%e0%a6%93-%e0%a6%aa%e0%a6%bf%e0%a6%97%e0%a6%ae%e0%a6%bf-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%9c-2/