দ্য ওয়াল ব্যুরো: অন্ধকার ঘরে খাটিয়ার সঙ্গে তাকে শক্ত করে বেঁধেছিল ঠাকুর ও বানিয়া পরিবারের লোকজন। ছিলেন প্রেমিকার কাকা-কাকিমা ও এলাকার মাতব্বরেরাও। আর্তনাদ করে উঠছিল তেইশের ছেলেটা। চিৎকার বন্ধ করতে শুরু হয় বেদম মার। দু’হাত মুচড়ে ধরেছিলেন প্রেমিকার কাকিমা। লাঠির ঘা এলোপাথাড়ি পড়ছিল শরীরের নানা জায়গায়। রক্তের ধারায় মিশে গিয়েছিল কান্নার জল। কেরোসিন দিয়ে যখন তাকে স্নান করানো হয়েছিল, তরুণ প্রায় অচৈতন্য। জ্ঞান ফেরে আগুনের তপ্ত ফুলকিতে। নিজের চামড়া পোড়ার গন্ধ পেয়েছিল সে। হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর কয়েক সেকেন্ড আগে পরিবারকে এমনটাই জানিয়ে গিয়েছিল অভিশাঙ্ক পাল। উচ্চবর্ণের তরুণীর সঙ্গে প্রেম করার ‘অপরাধে’ দিন কয়েক আগেই যাকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে গ্রামের উচ্চবর্ণের লোকজন।
উত্তরপ্রদেশের হরদোই জেলার বাদাইচা গ্রামের এই ঘটনায় তোলপাড় হয়েছিল দেশ। ছিছিক্কারে ভরে গিয়েছিল সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়াল। অভিশাঙ্কের মৃত্যুর ঠিক পরের দিনই মৃত্যু হয় তার মায়েরও। সার্কল অফিসার বিজয় কুমার রানা জানিয়েছেন, মৃত্যুর আগে পাঁচ জনকে চিনিয়ে দিয়েছিল তরুণ। তার প্রেমিকা, প্রেমিকার কাকা-কাকিমা, স্থানীয় ঠাকুর পরিবারের দু’ জন সত্যম সিং ও শিখর সিং। গতকাল, সোমবার এই পাঁচজনকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। শুরু হয়েছে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত।
অভিশাঙ্কের বাবা মিথিলেশ ভাগচাষি। বাড়িতে মা রামবেতি আর দুই ভাইবোন রুবি ও প্রদীপ। পাশেই থাকেন কাকারা। এই দলিত পরিবার গ্রামে কোণঠাসা হলেও, অভিশাঙ্ককে ভালোবাসতেন অনেকেই। মেধাবী, ক্রিকেট-পাগল এই ছেলেটা ছিল এলাকার বিরাট কোহলি। মিথিলেশ জানিয়েছেন, ছেলে পুলিশ অফিসার হওয়ার স্বপ্ন দেখত। গত বছর হরদোই টাউনের শিবম কলেজে বিএ-তে ভর্তি হয়েছিল। সরকারি চাকরির প্রস্তুতিও চলছিল সমান তালে। শান্তশিষ্ট, মুখচোরা ছেলেটার জীবনে ঝড় ওঠে এলাকারই একটি মেয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হওয়ার পর থেকে। শিবানী গুপ্ত। শিবানীর পরিবার ছিল হারদোইয়ের উচ্চবিত্ত পরিবারদের মধ্যে একটি। বানিয়া ও ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। কাজেই শিবানীর পরিবার এই প্রেম মেনে নিতে পারেনি। রাস্তাঘাটে হুমকি, হেনস্থা প্রায়ই সইতে হত অভিশাঙ্ককে। তবে সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেনি সে।
হরদোই টাউনের বাদাইচা গ্রামে হাজার পাঁচেক মানুষের বাস। দলিতরা সংখ্যালঘু। গ্রামে তাদের জন্য অলিখিত বেড়া তুলে দেওয়া আছে। সব জায়গায় তাদের অবাধ অনুপ্রেবেশের স্বাধীনতা নেই। মিথিলেশের পরিবারেরও ছিল না। গ্রামের বাইরের স্কুল-কলেজেই তাই অভিশাঙ্কের পড়াশোনা। মিথিলেশ বলেছেন, “ছোট থেকে চাষের কাজে সাহায্য করত ছেলে। কলেজ থেকে ফিরেই জমিতে চলে যেত। আমরা বারণ করতাম। চাইতাম ছেলের স্বপ্ন পূরণ হোক। বড় পুলিশ অফিসার হয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াক। সেটা আর হলো না।”
শিবানির সঙ্গে সম্পর্ক ছিল পাঁচ বছরের। ইদানীং ঝামেলাটা বেড়েছিল। মিথিলেশ জানিয়েছেন, তলে তলে ছেলেকে খুন করার পরিকল্পনা করেছিল স্থানীয় ঠাকুর পরিবার। এরই মধ্যে অভিশাঙ্কের মা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তাঁর চিকিৎসার জন্য ২৫,০০০ টাকা জোগাড় করেছিল তরুণ। সেই টাকা নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার দিনেই এই দুর্ঘটনা ঘটে। সেদিন ছিল ১৫ সেপ্টেম্বর। পুলিশের কাছে মিথিলেশ বলেন, “ছেলে বলেছিল শিবানীর পরিবার তার সঙ্গে দেখা করতে চায়। আমি বারণ করেছিলাম। ও শোনেনি। এখন বুঝতে পারছি এই ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে ছিল শিবানীও। “ গুপ্ত ও ঠাকুর পরিবারের লোকজন রাস্তাতেই পাকড়াও করে অভিশাঙ্ককে। একটা পরিত্যক্ত অন্ধকার ঘরে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। দরজা বন্ধ করে শুরু হয় অত্যাচার। রক্তাক্ত অভিশাঙ্ককে জ্যান্ত জ্বালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল তারা। কোনও ভাবে বুঝতে পেরে দরজা ভেঙে অভিশাঙ্ককে উদ্ধার করেন এলাকাবাসীরা। ততক্ষণে তরুণের দেহের ৭০ শতাংশের বেশি ঝলসে গেছে। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরে কয়েক ঘণ্টা বেঁচেছিল অভিশাঙ্ক। তার মধ্যেই অপরাধীদের চিনিয়ে দিয়ে যায় সে।
পুলিশ জানিয়েছে, শিবানীর পরিবার তো বটেই, স্থানীয় ঠাকুর পরিবারের সকলকে জেরা করা চলছে। শিবানীর ফোন কল ও মেসেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযুক্তরা কেউই দোষ স্বীকার করতে রাজি নন। তাঁদের দাবি, বাড়িতে এসে অভিশাঙ্কই নাকি তাঁদের অপমান করেছিল। তারা শুধু পাল্টা জবাব দেয়। হরদোই পুলিশ সুপার অলোক প্রিয়দর্শী জানিয়েছেন, বয়ান যতই বদলাক, কোনও ভাবেই ছেড়ে দেওয়া হবে না অপরাধীদের। ধৃতদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২, ১৪৭, ৫০৪, ৫০৬ এবং তফসিলি জাতি-উপজাতি নির্যাতন রোধ আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
