শেষ আপডেট: 24 July 2018 08:50
পাকিস্তানের ইন্ডিপেন্ডেন্ট হিউম্যান রাইটস কমিশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এ রহমান বললেন, পাকিস্তান সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে ক্রমশ আরও বেশি অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছে। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যাতে সংখ্যালঘুরা এই নির্বাচনে তাঁদের ভোট বিনাবাধায় ও নির্ভয়ে দিতে পারেন।
পাকিস্তানের খ্রিস্টানরা
রাস্তার ধরে আবর্জনার স্তূপ। পলেস্তারাহীন সস্তা ইঁটের বাড়ি। দরজা লাগানোর পয়সা নেই, তাই লাগানো সস্তা পর্দা। হ্যাঁ, এটাই ইসলামাবাদের অনতিদূরে রিমশাহ নামে একটি জনবসতির সার্বিক চিত্র।
কয়েক বছর আগে এঁরা পালিয়ে এসেছিলেন এখানে। কারণ খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের এগারো বছরের ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত এক বালিকা নাকি ইসলাম অবমাননা করেছিল। এবংপাকিস্তানের জনতার একাংশ নাবালিকাকে পাথর ছুড়ে মারার ফরমান জারি করে। পরে শিশুটিকে হত্যা না করে সবকটি খ্রিস্টান পরিবারকেই এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। খ্রিস্টান পরিবারগুলি এই জায়গাটির নাম দেয় সেইরিমশাহর নামেই, যে মুসলিমদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থের পাতা ছিঁড়ে ফেলেছিল। যদিও তার শারীরিক অবস্থার কথা ভেবে পরে তাকে অপরাধের দায় থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।
.
মাইকেল রোজ়, পাকিস্তানের প্রায় ৩০ লক্ষ খ্রিস্টান ধর্মের মানুষের একজন ঠোঁটকাটা আইনজীবী। তিনি গত কয়েক মাস ধরে রিমশাহতে প্রচার চালিয়েছেন নির্দলীয় খ্রিস্টান প্রার্থী আসিফ শাহজাদার হয়ে। তাঁর মতে নির্দলীয় সংখ্যালঘু প্রার্থীরা খ্রিস্টানদের দাবি দাওয়া শোনার ও তুলে ধরার পক্ষে আদর্শ। রাজনৈতিক দলের সংখ্যালঘু প্রার্থীরা সংরক্ষিত সিটে জিতে পার্টি লাইন নিয়েই চলেন। খু্ব কমই সংখ্যালঘুদের সমস্যা তুলে ধরেন, নিজের আখের গোছাতে।
মাইকেল রোজ় যাঁর হয়ে প্রচার করছেন, সেই আরবী নামের খ্রিস্টান যুবক শাহজাদা বললেন বললেন, "আমি এই ভোট যুদ্ধে সামিল হয়েছি কেবল আমার সম্প্রদায়কে বাঁচাতে। আমাদের অনেক সমস্যা। না আছে শিক্ষা। না আছে স্বাস্থ্য। না আছে চাকরিবাকরি। এমনকী, পানীয় জলও নেই।" তাই এবারের ভোটের জিতে পাকিস্তানের খ্রিস্টানদের হাল বদলানোর স্বপ্ন দেখছেন শাহজাদা।
হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় এবারের ভোট
হিন্দু সম্প্রদায় হলো পাকিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। সংখ্যায় প্রায় কুড়ি লক্ষ। সিন্ধুপ্রদেশের দক্ষিণ অংশে দরিদ্রতম মানুষ হিসেবেই মূলত এঁদের বসবাস। এই এলাকার বেশিরভাগ হিন্দুই পাকিস্তানের বৃহত্তম জায়গীরদারদের অধীনে ক্রীতদাস হিসেবেই থাকেন। হিন্দুরাই সবচেয়ে বেশী অত্যাচার ও বঞ্চনার শিকার হন ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে চিরশত্রু মনোভাবের জন্য।
ভারত পাকিস্তানের মধ্যে যত সম্পর্ক খারাপ হয়, পাকিস্তানের হিন্দুদের উপর অত্যাচারের মাত্রা ততোধিক বৃদ্ধি পায়। পাকিস্তানের মানবধিকার কর্মীরা হিন্দু মেয়েকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করা নিয়ে প্রায় রুটিন করে বিক্ষোভ করে থাকেন।
ভিরু কোহলি ক্রীতদাস হিসেবেই জন্মেছিলেন। কিন্তু তরুণী ভিরু একদিন মালিকের কবল থেকে পালান। বাচ্চাদের ফেলে রেখে। তিনদিন হেঁটে পাকিস্তানের মানবধিকার কমিশনের একটি অফিস খুঁজে পান। কিছু মানুষ তাঁকে সাহায্য করেন। তাঁদের সাহায্য নিয়ে তরুণী ভিরু কোহলি জমিদারের কাছে ফেরেন এবং তাঁর ছেলেমেয়ে-সহ আরও আট হিন্দু ক্রীতদাসকে জমিদারের কবল ও দাসত্ব থেকে মুক্ত করেন। ভিরু কোহলি এবারের সাধারণ নির্বাচনে একজন নির্দলীয় হিন্দু প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন।
যদি তিনি জেতেন, তিনি হবেন পাকিস্তানের পার্লামেন্টে দ্বিতীয় হিন্দু মহিলা। এর আগে পাকিস্তান পিপলস পার্টির হয়ে কৃষ্ণ কুমারী পাকিস্তানের পার্লামেন্টের আপার হাউস বা সেনেটের সদস্য হন পার্লামেন্ট সদস্যদের ভোটে জিতে।
শিখ মহল্লার পরিস্থিতি
পাকিস্তানে শিখরা মূলত বসবাস করেন আফগান সীমান্ত সংলগ্ন খাইবার-পাখ্তুনখোয়া প্রদেশে। পাকিস্তানে বসবাসরত দুলাখ শিখরা প্রায়ই তালিবান আক্রমণের শিকার হন। সম্প্রতি আইসিস জঙ্গিদের আক্রমণের শিকার হয়ে প্রদেশ ছাড়তে হয়েছে অসংখ্য শিখ পরিবারকে। এঁদেরই একজন রাদেশ সিং জানিয়েছেন শুধু শিখ নয়, সন্ত্রাসবাদীদের হাতে মারা যাচ্ছেন মুসলিমরাও। রাদেশ সিং একজন নির্দলীয় শিখ প্রার্থী হয়ে ভোটে লড়ছেন প্রদেশের রাজধানী পেশোয়ার থেকে। মাটি কামড়ে আছেন। এলাকা ছেড়ে পালাননি। তাঁর বিরুদ্ধে লড়তে নামা ধনী প্রার্থীদের সঙ্গে সমানে সমানে টক্কর দিয়ে যাচ্ছেন।
"আমি দেখাতে চাই যে গরিবরা লড়তে পারে। বড়লোক প্রার্থীরা গরিবদের ভোটে জেতে কিন্তু গরিবদের কিছুই ফিরিয়ে দেয় না প্রতিদানে। "
রাদেশ সিং তাঁর এলাকার সরু রাস্তার দুধারে সারি সারি ছোট ছোট দোকান গুলির প্রতিটিতে ঢুকছেন। দোকানগুলো তাঁর মুসলিম প্রতিবেশীদের। এক বয়স্ক মুসলিম দোকানদার আল্লা মীর রাদেশ সিংকে আলিঙ্গন করে জানালেন, যে, তিনি ভোট রাদেশ সিংকেই দেবেন।
আল্লা মীর বলেন, "আমি ধর্মটর্ম দেখিনা, আমি কেবল ভালো মানুষ দেখে ভোট দিই।
কী বলছেন সংখ্যালঘু শিয়ারা?
যদিও মুসলিম বলেই শিয়াদের জানে পৃথিবী। কিন্তু পাকিস্তানে শিয়াদের প্রতি মুহূর্তে চূড়ান্ত অত্যাচারের শিকার হতে হয়। মৌলবাদী সুন্নি মুসলিম গোষ্ঠীর হাতে প্রতি বছর হাজার হাজার শিয়াকে মরতে হয়। কারণ সুন্নি উগ্রবাদীরা শিয়াদের ইসলামের সবচেয়ে বড় শত্রু বলে মনে করে। শিয়াদের সংখ্যালঘুদের মতোই পার্লামেন্টে সিট সংরক্ষণ নেই। তাদের হয় কোনও পার্টির টিকিটে, নয় নির্দল প্রার্থী হয়ে ভোটের লড়তে হয়।
আহমেদিয়া সম্প্রাদায়ের অসহায়তা
ইসলাম ধর্ম থেকে সরে আসা একটি শাখা। এঁরা মহম্মদকে শেষ নবী মানেন না। নবী মানেন মির্জা গুলাম আহমেদকে। এই আহমেদ থেকেই আহমেদিয়া নামক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উৎপত্তি। পাকিস্তান ১৯৭৪ সালে আহমেদিয়াদের অমুসলিম বলে ঘোষণা করে। শয়ে শয়ে আহমেদিয়াকে হত্যা করা হয় পরবর্তী সময়ে। বেশিরভাগ আহমেদিয়া পাকিস্তান ছেড়ে পালিয়ে যায়। আহমেদিয়াদের ধর্মস্থান ভেঙে দেওয়া হয়। এখন মাত্র কয়েকশো আহমেদিয়া পাকিস্তানে বাস করেন।
আহমেদিয়া সম্প্রদায়ের মুখপাত্র সলিমউদ্দিন জানান, তাঁদের ওপর ধারাবাহিক অত্যাচারের প্রতিবাদে ও তাঁদের আলাদা ভোটার তালিকায় রাখার জন্য আহমেদিয়ারা বুধবারের সাধারণ নির্বাচন বয়কট করছেন। সলিমউদ্দিন বলেন "আমাদের আলাদা ভোটার তালিকায় রাখাটাই প্রমাণ করে আমরা সাধারণ পাকিস্তানি নই। কিন্তু কেন?"
কে উত্তর দেবে? আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্মের ভিত্তিতে ছিনিয়ে তৈরি হওয়া ভূখণ্ডে অন্য ধর্মকে রেয়াত করার মানসিকতা পাকিস্তানের নেই। কারণ পাকিস্তান জানে ধর্মের আফিম ছাড়া এই ভূখণ্ডকে ধরে রাখা যাবে না। তাই মৌলবাদী শক্তি সরকারি প্রশয়ে সংখ্যালঘু নিধন যজ্ঞে নেমেছে। বিশ্বের দরবারে পিঠ বাঁচাতে সংবিধানের শিলমোহর চাই। পাকিস্তানের এবারের সাধারণ নির্বাচন কার্যত সেই শিলমোহর। তাই পাকিস্তানের সংখ্যালঘুরা তাদের প্রার্থীদের জেতাতে 'আর পার কি লড়াই' শুরু করেছেন।