দ্য ওয়াল ব্যুরো: উত্তরাখণ্ডের নিজমোলা উপত্যকার ছোট্ট গ্রাম পাগনা। ছবির মতো সুন্দর। তিরতির করে বয়ে চলেছে শীর্ণকায় নদী। অখণ্ড নৈঃশব্দ্যের বুক চিড়ে কখনও ভেসে আসে পাহাড়ি ঝর্নার ধ্বনি। চারিদিক সবুজে সবুজ। হিমালয়ের ঐশ্বর্যের পুরোটা শুঁষে নিয়ে যেন বেড়ে উঠেছে গোটা উপত্যকা।
কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালেই বাসা বেঁধেছে অসুখ৷ এসেছে গুটিগুটি পায়ে। তারপর যত দিন গড়িয়েছে, ক্রমশ বেড়েছে দাপট। এককথায় উত্তরাখণ্ডের এই পার্বত্য প্রদেশে 'নন্দনে নরক' তৈরি করেছে অতিমারী… কোভিড। দেশের বাকি অংশের মতো এখানেও থাবা বসিয়েছে সংক্রমণ। বেড়েছে দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা। কিন্তু ফারাক একটাই— সময়ে সরকারি সাহায্য আসেনি। কখনও সপ্তাহ, কখনও বা মাস পেরিয়েছে৷ ওষুধ কিংবা ভ্যাকসিনের জন্য হাপিত্যেশ করে ঘর-বাহির করেছেন ফাল্গুনী দেবী, প্রেম সিংরা। শেষমেশ উপায় না দেখে নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন দায়িত্ব। সংক্রমণ এড়ানো না গেলেও নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আর হ্যাঁ, এড়ানো গেছে মৃত্যুও।

পাগনার কথাই ধরা যাক। হিন্দুদের পবিত্র তীর্থক্ষেত্র চারধামের অন্যতম বদ্রীনাথ যাওয়ার হাইওয়ে থেকে মেরেকেটে ২০ কিলোমিটারের পথ। একটু অফবিট গন্তব্য যাঁদের পছন্দ, সেই সমস্ত পর্যটকেরা বিভিন্ন মরশুমে এই গ্রামে ঢুঁ মেরে যান। তা ছাড়া এর একটা ঐতিহাসিক গুরুত্বও আছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ অফিসারেরা সুযোগ পেলেই, বিশেষ করে গরমের সময় এখানে কিছুদিন কাটিয়ে যেতেন।
কিন্তু আজ পাগনা তার সেই অতীতের গরিমা হারিয়েছে। যত দিন গেছে, 'নেই'-এর তালিকা বেড়েছে। রাস্তা নেই। হাসপাতাল নেই। স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত আনাগোনা নেই। সর্বোপরি সরকারের আগ্রহও নেই। আর এসবের জেরেই বিষদাঁত বসানোর সুযোগ পেয়েছে করোনা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, 'নিকটবর্তী' হাসপাতালটি রয়েছে গোপেশ্বর শহরে৷ দূরত্ব মোটামুটি ২৪ মাইল। অ্যাম্বুলেন্স ডাকলে ৯ মাইল দূরে দাঁড়িয়ে থাকে। ট্যাক্সিচালক চড়া দাম হাঁকেন। এই অবস্থায় কেউ করোনা আক্রান্ত হলে পায়ে হেঁটে বরফঠাণ্ডা নদী ডিঙিয়ে, পাহাড়ের চড়াই ভেঙে তাঁকে নিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।
কিন্তু এভাবে কতজন পা বাড়াবেন? পরিসংখ্যান বলছে, বিগত পাঁচ সপ্তাহ ধরে উপত্যকার বিভিন্ন গ্রামে ৮০ শতাংশ মানুষের কোভিডের কোনও না কোনও উপসর্গ ধরা পড়েছে। কারও মৃদু। কারও গুরুতর। বাড়িঘর ফেলে রেখে ২৪ মাইল পাড়ি দেওয়া কার্যত অসম্ভব।
এই অবস্থায় এগিয়ে আসে বেশ কিছু বিশ্বস্ত মুখ। তাঁদেরই একজন প্রেম সিং৷ বয়স ৩৬। পাগনার পাশের গ্রাম দুরমিতে বাড়ি। সমাজকর্মী প্রেম গোটা অবস্থার কথা জানিয়ে গোপেশ্বর জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিককে চিঠি লেখেন। নমুনা পরীক্ষার আর্জি জানিয়ে যত দ্রুত সম্ভব টিম পাঠাতে বলা হয়। কিন্তু দিন কাটে৷ সপ্তাহ ঘুরে যায়। কারও দেখা মেলে না। স্বাস্থ্যকর্মীদের একটা দল গ্রামে পা রাখে বেশ কয়েক সপ্তাহ পর৷ তাও হাতে র্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্টের সরঞ্জাম নিয়ে!

প্রেম জানান, তাঁরা যবে এসেছেন ততদিনে অনেকেরই উপসর্গ গায়েব। জ্বর-কাশি-সর্দি— কিচ্ছুটি নেই৷ পাহাড়ি জটিবুড়ি মেশানো গরম জল খেয়েই বেশিরভাগ গ্রামবাসী চাঙ্গা হয়ে উঠেছেন। বিশেষ করে যুবক-তরুণেরা। নিজেরা সুস্থ হয়ে বাড়ির বয়স্কদের দেখভাল, গেরস্থালি ঠেলার কাজও আরম্ভ করে দিয়েছেন। কিন্তু এতকিছুর পরেও প্রশাসনিক উদাসীনতা দেখে থ মেরে গেছেন প্রেম সিং।
আড়ালে থেকে কাজ করা আরেকজন থান সিং। তিনি 'উদ্যোগিনী' নামে একটি অলাভজনক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত৷ পাহাড়ি ঔষধির চারা লাগানোর কাজও করেন। কেউ অসুস্থ হলেই বাড়ি বাড়ি তুলসী, জাতামানসির পাতা বিলি করেছেন থান। পাশে দাঁড়িয়েছেন গোদাবরী দেবীও। স্বনির্ভর অঙ্গনওয়াড়ি গোষ্ঠীর হয়ে কাজ করেন গোদাবরী। প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও তিনমাস ধরে সরকারি সাহায্য পাননি তাঁরা। তবুও এরই মধ্যে দোরে দোরে ঘুরে প্রতিদিনের রেশন পৌঁছনো, গায়ের তাপমাত্রা মাপার কাজ জারি রেখেছেন। এগিয়ে এসেছেন গ্রামের মুখিয়ারাও। বরাদ্দ তহবিলে টান চলছে। তবু তার মধ্যে থেকে গ্রামবাসীদের জন্য স্যানিটাইজার, মাস্ক কেনা হয়েছে।

এত বিতর্কের মুখে অবশ্য সাফাই দিয়েছে জেলা প্রশাসন। গোপীশ্বর হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়েছে, তারা পরিষেবা দিতে চাইলেও পরিকাঠামো বাধ সেধেছে। গোনাগুনতি স্টাফ, ৬টি আইসিইউ বেড এবং ১০০টি জেনারেল বেড নিয়ে কোনওমতে করোনার বিরুদ্ধে লড়াই চালানো হচ্ছে। গোপীশ্বরের চিফ মেডিক্যাল অফিসার মহেন্দ্র সিং খাতির বক্তব্য, নিজমোলা অত্যন্ত দুর্গম পাহাড়ি উপত্যকা। সেখানে একেকটা গ্রাম ঘুরে পরীক্ষা চালাতেই দু'সপ্তাহ লেগে যাবে। তাই গ্রামের বাইরে তাঁরা স্বাস্থ্য পরীক্ষার কেন্দ্র বসিয়েছেন। কোভিডে কর্মীদেরও অনেকে আক্রান্ত হওয়ায় কাজে দেরি হচ্ছে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তরাখণ্ডের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ত্রিবেন্দ্র সিং রাওয়াত উপত্যকা ঘুরে যান। শুনতে অবাক লাগলেও ৭০ বছরে এমন ঘটনা এই প্রথম। এর আগে দশকের পর দশক পেরিয়েছে। শীর্ষস্থানীয় কেউ পরিস্থিতির খোঁজ পর্যন্ত নেননি। কিন্তু শেষমেশ কেউ এসেছেন— ওটুকুই সান্ত্বনা। রাস্তা তৈরি, হাসপাতাল বানানোর একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি সেদিন দেওয়া হয়েছিল। যার একটিও বাস্তবায়িত হয়নি। এর জন্য কত বছর, কত দশক অপেক্ষা করতে হবে— জানেন না পাগনার বাসিন্দারা।