দ্য ওয়াল ব্যুরো:‘দ্য ল্যানসেট’ মেডিক্যাল জার্নালের তথ্যের উপর ভিত্তিকের কোভিড চিকিৎসায় ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের ব্যবহার বন্ধের কথা বলেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)। ল্যানসেট মেডিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে বিজ্ঞানীরা দাবি করেছিলেন, কোভিড সংক্রমণ সারাতে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের কোনও কার্যকরী প্রভাব দেখা যায়নি, উল্টে এই ওষুধের প্রভাবে রোগীদের মৃত্যুহার বেড়েছে। তবে সম্প্রতি ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর) তাদের একটি সমীক্ষায় দাবি করেছে, করোনা রোগীদের সংক্রমণ সারাতে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের ভূমিকা আছে কিনা সেটা প্রাধান্য বিষয় নয়, বরং হাই-রিস্ক গ্রুপে রয়েছে যাঁরা সেই স্বাস্থ্যকর্মীদের শরীরে সংক্রমণ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে পারে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন। সেক্ষেত্রে এই ওষুধের হাই ডোজ কার্যকরী প্রফিল্যাক্সিস ড্রাগ হিসেবে কাজ করতে পারে।
করোনা চিকিৎসায় বিশ্বজুড়ে যে ৭০ রকমের ড্রাগ নিয়ে সলিডারিটি ট্রায়াল চলছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয়েছে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন নিয়ে। এই ওষুধের নানারকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা সামনে আসায়, করোনা সারাতে আদৌ হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন নিরাপদ কিনা সেই নিয়ে নির্ভরযোগ্য কোনও তথ্য এখনও মেলেনি। দ্বিধায় রয়েছে বিজ্ঞানীমহল। আইসিএমআর যদিও আগেই বলেছিল, করোনা রোগীদের উপরে নয়, বরং সংক্রমণের ঝুঁকি যাঁদের বেশি তেমন মানুষজনের উপরেই নির্দিষ্ট ডোজে প্রয়োগ করা যেতে পারে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন। সেক্ষেত্রে হাই-রিস্ক গ্রুপে যাঁরা পড়েন যেমন ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, আশা কর্মী অথবা কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে বা বাড়িতে পর্যবেক্ষণে থাকা রোগীদের কাছাকাছি থেকে তাঁদের সেবাযত্ন করছেন যাঁরা, সেই ব্যক্তিদের সুরক্ষিত রাখতে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন দেওয়া যেতে পারে। কাদের ওই ওষুধ দেওয়া যাবে এবং কী ডোজে, সেই নিয়ে আইসিএমআরের গাইডলাইনও রয়েছে।
‘ইন্ডিয়ান জার্নাল অব মেডিক্যাল রিসার্চ’-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণাপত্রে আইসিএমআরের বিজ্ঞানীরা ল্যানসেটের তথ্য উল্লেখ করেই বলেছেন, কোভিড রোগীদের উপরে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন ও ক্লোরোকুইনের প্রভাব নেই এটা অমান্য করা যাচ্ছে না, এই ওষুধের ডোজের হেরফেরে রোগীদের মৃত্যুহার বাড়তে পারে সেটাও অনেকটাই ঠিক, তবে এই ওষুধে করোনা সারাবার বদলে করোনা প্রতিরোধ কী ভাবে গড়ে তোলা যায় সেটাই গবেষণার বিষয়। আইসিএমআরের দাবি, করোনার ঝুঁকি বেশি এমন স্বাস্থ্যকর্মীদের বেশি ডোজে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন দিয়ে দেখা গেছে তাঁদের সংক্রামিত হওয়ার সম্ভাবনা কমেছে।
ল্যানসেটের জার্নাল
https://twitter.com/TheLancet/status/1263809104633569281
সাতশোর বেশি স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর কন্ট্রোলড ক্লিনিকাল ট্রায়াল করে আইসিএমআরের টাস্ক ফোর্স জানিয়েছে, কোভিড পজিটিভ রোগী যাঁদের শরীরে সংক্রমণ বেশিমাত্রায় ছড়িয়ে পড়েছে এবং সাইটোকাইন প্রোটিনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার জন্য প্রদাহজনিত রোগ দেখা গিয়েছে, তাঁদের সংক্রমণ কমাতে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের কার্যকরী প্রভাব নাও থাকতে পারে। বরং সেক্ষেত্রে এই ওষুধের অধিক ব্যবহার ঝুঁকির কারণ হতে পারে। কিন্তু ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য কেমোপ্রফিল্যাক্সিস ড্রাগ হিসেবে প্রয়োগ করা যেতে পারে ক্লোরোকুইন ও হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন। ৮ মে থেকে ২৩ মে পর্যন্ত ৭৫১ ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীদের এই ওষুধ খাইয়ে তার প্রভাব পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, কন্ট্রোলড ট্রায়ালে যে ৩৭৩ জন স্বাস্থ্যকর্মীকে বেশি ডোজে এই ওষুধ খাওয়ানো হয়েছিল তাদের করোনা রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো দেখা গেছে সেগুলি অন্যান্য ওষুধের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। যেমন বমিভাব (৮ শতাংশের), মাথাধরা (৫ শতাংশের) ও পেট খারাপ (৪ শতাংশের)। কোনও ‘অ্যাডভার্স ড্রাগ রিঅ্যাকশন’ এখনও দেখা যায়নি। সাত সপ্তাহ ধরে প্রতি সপ্তাহে ৪০০ মিলিগ্রাম ডোজে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনের ডোজ ঠিক করে এই কন্ট্রোলড ট্রায়াল চলছে বলে দাবি করেছে আইসিএমআর।
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি থাকা প্রায় ১ লক্ষ করোনা রোগীকে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন দিয়ে তার গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তথা সাইড এফেক্ট দেখে ল্যানসেট মেডিক্যাল জার্নাল দাবি করেছিল এই ওষুধের ব্যবহার করোনা রোগীদের কার্ডিওভাস্কুলার রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। তাছাড়া সংক্রমণ সারাতেও ম্যালেরিয়ার ওষুধের কার্যকরী ফল দেখা যায়নি। এই তথ্যের উপর ভিত্তি করেই হু প্রধান টেড্রস অ্যাডানাম গেব্রেইসাস বলেন, কোভিড-১৯ রোগীদের ক্ষেত্রে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের প্রয়োগ কতটা নিরাপদ, তার পর্যালোচনা চলছে এখনও। এমন কোনও প্রামাণ্য ও গবেষণালব্ধ তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি, যাতে করে করোনা সংক্রমণে বা সম্ভাব্য সংক্রমণের ক্ষেত্রে এই ওষুধকে পুরোপুরি কার্যকর ও নিরাপদ বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। তাই তার আগে পর্যন্ত এই ওষুধটির পরীক্ষামূলক ব্যবহার স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে হু। তবে আইসিএমআর জানিয়েছে, করোনা রোগীদের উপরে নয়, আপাতত হাই-রিস্ক গ্রুপেই এর ট্রায়াল চলতে পারে। তবে অবশ্যই নির্দেশিকা মেনে এবং সঠিক পদ্ধতিতে।