
শেষ আপডেট: 30 May 2023 03:05
দ্য ওয়াল ব্যুরো: তিনি দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী। দশের স্বাস্থ্য ভাল রাখাই তাঁর দায়িত্ব। তবে তাঁর আগে নিজের স্বাস্থ্য নিয়েও বেজায় সচেতন নরেন্দ্র মোদী সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রী মনসুখভাই মন মাণ্ডবিয়া (Health Minister Mansukh Mandaviya)। আগে রোজ সাইকেল চালিয়ে সংসদে যেতেন। শরীরও একেবারে লম্বা, ছিপছিপে। সোমবার কলকাতায় এসে জানালেন, তাঁর স্বাস্থ্য ঠিক রাখার গোপন চাবিকাঠি রয়েছে। এক, রাতে এক্কেবারে না খাওয়া। দুই, ডায়েটিশিয়ানের কথামতো বিকেল ঠিক পাঁচটায় চারটে করে ডিম খাওয়া (4 Eggs Daily)!
সরকার ও সংগঠনের কাছে কলকাতায় এসেছিলেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী (Health Minister Mansukh Mandaviya)। আজ, সোমবার বিকেলে বিজেপির সল্টলেকের দফতরে ঘরোয়া আড্ডায় বসেছিলেন সাংবাদিকদের সঙ্গে। সেখানেই তাঁর ব্যক্তিগত জীবনচর্যা নিয়ে এমনই নানা অজানা গল্পের খোঁজ দিলেন মনের সুখে।
মনসুখ জানালেন, তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায়ই প্রোটোকল মেনে নয়াদিল্লির এইমস (AIIMS Delhi) থেকে চিকিৎসকরা আসতেন তাঁর কাছে। পেল্লায় গাড়িতে নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি নিয়ে তাঁদের আসা দেখে মন্ত্রীর পরিবার ভেবে বসেছিলেন, কিছু হয়ে-টয়ে গেল নাকি! এভাবেই একবার পরীক্ষা-নীরিক্ষার পর ডাক্তাররা জানিয়েছিলেন, মনসুখ ভাইয়ের ফ্যাটি লিভার (Fatty Liver) রয়েছে।
মন্ত্রীর কথায়, “ওঁরা বললেন, গ্রেড টু ফ্যাটি লিভার। আমি জানতে চাইলাম, তা হলে সলিউশন কী? কোনও ওষুধ খেতে হবে? ওঁরা বললেন, তেমন সলিউশন নেই। খাদ্যাভাসে বদল আনতে হবে।”

বাঙালিদের মতো গুজরাতিরাও ভোজনরসিক। বেড়াতে ভালবাসেন। মনসুখ (Health Minister Mansukh Mandaviya) বললেন, “খাদ্যাভাসে বদলের কথা শুনে প্রথমটা তাই চিন্তায় পড়েছিলাম। এমন সময়ে আলাপ হল এক তরুণ চিকিৎসকের সঙ্গে। উনি ডক্টর ইন মেডিসিন। বললেন, স্যার আমার কথা শুনে খাওয়াদাওয়া করুন, কথা দিচ্ছি, চার মাসে ফ্যাটি লিভারের সমস্যা কমিয়ে দেব।”
ওই তরুণ ডাক্তারই তাঁকে নিদান দেন, সকালে উঠে ঘিয়ে ভাজা মুগকলাই খেতে। ঘি-তে রয়েছে ফ্যাট, আর মুগকলাইয়ে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন। ফলে সাতসকালেই ফ্যাট ও প্রোটিনের চাহিদা মিটে গেল। এরপর দুপুরে অল্প ব্রাউন রাইস, ডাল আর মিক্সড শাকসবজি খেতে হবে। ব্যাস! তারপর থেকে আর পেটে কিচ্ছু দেওয়া যাবে না। ওই শেষ! পরের খাবার আবার পরের দিন সকাল ছ’টায়।
এরকম কয়েক মাস চলার পরেই স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ফ্যাটি লিভারের (Fatty Liver) সমস্যা মিটে যায়। মাণ্ডবিয়া জানালেন, এখন তাঁর ফ্যাটি লিভারের কোনও সমস্যাই নেই। এখনও রাতে কিছু খান না। তবে তাঁর চিকিৎসক এখন ডায়েটটা একটু বদলে দিয়েছেন। এখন দুপুরে বাজরার রুটিও খান কখনও। আর বিকেল পাঁচটা বাজলেই চারটে করে সেদ্ধ ডিম খেতে বলেছেন ডাক্তারবাবু।
কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রী এদিন সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘরোয়া আড্ডায় বসেন বিকেল সওয়া পাঁচটা নাগাদ। তার আগে দলের সল্টলেকের দফতরে বসে চারটে ডিম (4 Eggs Daily) খেয়ে নেন। তাও আবার কুসুম সমেত!

এমনিতে ডিম বাঙালির বরাবরের সঙ্গী। ব্রিগেডের সভা হোক বা কচিকাঁচা পড়ুয়াদের মিড-ডে মিল— ডিম নিয়ে প্রায়ই সরগরম হয়ে ওঠে রাজনীতি। দূরপাল্লার ট্রেনে ভ্রমণ করলে ‘এগ মিল’ নিলে দুটো ডিম না পেলে সামান্য মনঃক্ষুণ্ণ তো হন অনেকেই। কিন্তু একসঙ্গে চারটে ডিম? স্বাস্থ্যরক্ষার তাগিদে কেউ কেউ একাধিক ডিম খেলেও, সাধারণত কুসুম বাদ দিয়ে খেতেই দেখা যায় সচেতন মানুষদের। তবে মাণ্ডবিয়ার ক্ষেত্রে তা নয়।
কলকাতার বিসি রায় হাসপাতালের প্রাক্তন পুষ্টিবিদ সঞ্চিতা চট্টোপাধ্যায় অবশ্য ফ্যাটি লিভার থাকলেও পাতে ডিমের আধিক্যে কোনও অন্যায় দেখছেন না। তাঁর কথায়, 'কেন জানি না ডিমের এত বদনাম। ডিম একটি হাই বায়োলজিক্যাল ভ্যালুর প্রোটিন ফুড, যা সারা বছর সুলভ। ডিম খুব সহজে হজমও হয়। ডিমের পুষ্টিগুণ আসে তার সাদা ও কুসুম দু'টো অংশ থেকেই। আমি তো বলব সাদা অংশের থেকে ডিমের কুসুম আমাদের জন্য অনেক বেশি উপকারী। এতে কোলিন থাকে, যা অ্যাসিটাইল কোলিন নামে একটি প্রয়োজনীয় নিউরোট্রান্সমিটার তৈরিতে কাজে লাগে। গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁদের প্রতিদিনের ডায়েটে কোলিন কম থাকে, তাঁদের বরং ফ্যাটি লিভার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি হয়, কারণ কোলিন লিভারকে সুরক্ষা প্রদান করে এবং লিভারের অসুখ সারাতে সাহায্য করে।'
ফ্যাটি লিভার নিয়ে চিকিৎসক মহেশ গোয়েঙ্কা (Doctor Mahesh Goenka) কী বলেছেন 'দ্য ওয়াল'-কে?
তবে পুষ্টিবিদ যাই বলুন, বাঙালি মধ্যবিত্ত বাড়িতে যদিও একলপ্তে চারটি ডিম পাতে দেওয়ার নজির খুব একটা নেই। ইদানীং জিম ও শরীরচর্চার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ওটস ও ডিমের সাদা অংশের খাতির খানিক বেড়েছে বটে! তবে দু’টোর বেশি ডিম দিতে আজও বাঙালি মায়েরা কিঞ্চিৎ সংকোচই করেন।
বাঙালি মায়েদের এই ‘ট্র্যাডিশনের’ সঙ্গে একমত হচ্ছেন বিশ্ববিখ্যাত মেয়ো ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞরাও। ডিমের সাদা অংশটা খাওয়াই ভাল— কার্যত এই কথা মেনেও মেয়ো ক্লিনিকের ওয়েবসাইট বলছে, সপ্তাহে সাতটি ডিম খাওয়াটা মোটের ওপর নিরাপদ বলে ধরা যেতে পারে। অর্থাৎ দিনে গড়ে একটা। সেখানে সপ্তাহে ২৮টি ডিম? হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের টি এইচ চ্যান স্কুল অফ পাবলিক হেলথও বলছে, ডিমের বহু ভাল গুণ রয়েছে, কিন্তু তাও, বর্তমান দুনিয়ায় ডিম খাওয়া যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণে রাখাই ভাল।
এখানে একটা কথা না বললেই নয়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও মনে করেন, দিনে একটা করে ডিম খাওয়াই যায়। তাতে কোনও ক্ষতি হয় না।
গুজরাতে যদিও আমজনতা খাদ্যাভাসের দিক দিয়ে নিরামিষ পথেই বেশি আস্থা রাখতে অভ্যস্ত। গুজরাতের ক্যাম্বে উপসাগরের তীরে ভাবনগরে জন্ম মনসুখ মাণ্ডবিয়ার। দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির সঙ্গে যুক্ত তিনি। ২০০২ সাল থেকে ছিলেন গুজরাত বিধানসভায় বিধায়ক। পরে রাজ্যসভায় নির্বাচিত করিয়ে নিয়ে আসা হয় তাঁকে। গুজরাত বিজেপির সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন তিনি। বর্তমানে নরেন্দ্র মোদীর অত্যন্ত আস্থাভাজন বলে পরিচিত মনসুখ। স্বাস্থ্য মন্ত্রকের পাশাপাশি রাসায়নিক ও সার মন্ত্রকের দায়িত্বেও রয়েছেন তিনি।
তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হওয়ার অনেক আগে থেকেই নিজের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে ঘোর যত্নশীল ছিলেন গুজরাতের ভাবনগরের এই নেতা। আজও তিনি যাকে বলে অত্যন্ত ‘ফিট’! বস্তুত দুপুরের পর কিছু না খাওয়া— এই ডায়েটও আজ বেশ পরিচিত। অভিনেতা মনোজ বাজপেয়ীও এরকম ডায়েট মেনে চলেন। দুপুরের পর আহার নৈব নৈব চ’।
কিন্তু ডিম যেখানে কোলেস্টেরলের আধার বলেই পরিচিত, সেখানে চারটে ডিম প্রতিদিন (4 Eggs Daily) খেয়েও ফ্যাটি লিভার থেকে মুক্ত রয়েছেন মনসুখ? এ প্রায় বৈপ্লবিক বৈকি!
তবে এই বিপ্লবের সমর্থনেই কথা বলছেন পুষ্টিবিদ (Nuritionist)। তাঁর কথায়, 'একটি ডিমে ২০০ মিলিগ্রামেরও কম কোলেস্টেরল থাকে, যেখানে জীবদেহ প্রতিদিন এক গ্রাম করে কোলেস্টেরল নিজেই তৈরি করে। কারণ কোলেস্টেরলও আমাদের শরীরের একটি স্বাভাবিক উপাদান যা বিভিন্ন মেটাবলিক কাজে লাগে। তাই আমার মতে ডিম একটি সুপারফুড। তার কুসুমকে বাদ দিলে কিন্তু গুণও কমে যায়।'
ফ্যাটি লিভার খুব ভোগাচ্ছে? মেনে চলুন এই দশটি নিয়ম
ত্বকে কালচে ছোপ- র্যাশ? ফ্যাটি লিভারের এই লক্ষণগুলো দেখা যেতে পারে মুখেও