
শেষ আপডেট: 13 May 2022 04:26
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বছর পঁয়ত্রিশের রাখি সিং দিল্লির বাসিন্দা। বাকি চারজন লক্ষ্মী দেবী, সীতা সাহু, মঞ্জু ব্যাস এবং রেখা পাঠক থাকেন বারাণসীতেই। এই পাঁচ মহিলাকে নিয়ে দেশের নানা মহলে এখন তুমুল আলোচনা। বিশেষ করে গেরুয়া শিবিরে কৌতুহল তুঙ্গে দিল্লি-বারাণসীর এই পাঁচ অখ্যাত মহিলাকে নিয়ে।
বারাণসীর জ্ঞানবাপী মসজিদ Gyanvapi Masjid() চত্বরে থাকা শৃঙ্গারগৌরী মন্দিরে বছরের সব দিন পূজাপাঠের অনুমতি পেতে স্থানীয় আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন তাঁরা। ধর্মাচরণ সংক্রান্ত অধিকার আদায়ে পাঁচজন মহিলা আবেদনকারী এই মূহূর্তে দেশের আরও কোনও মামলায় নেই। স্মরণকালের মধ্যেও এমন নজির নেই।
অযোধ্যায় রাম মন্দির-বাবরি মসজিদ সংক্রান্ত মামলা তিন বছর আগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আড়াইশো বছরের পুরনো সেই মামলায় বিভিন্ন সময়ে নতুন নতুন মামলাকারী যুক্ত হয়েছেন। তাঁদের একজনও মহিলা ছিলেন না।
অযোধ্যার মতোই মথুরার শ্রীকৃষ্ণ জন্মস্থান এবং বারাণসীর কাশী-বিশ্বনাথ মন্দিরের বেদখল জমি পুনরুদ্ধারে একাধিক মামলা আদালতের বিচারাধীন। মামলাকারীদের দাবি, মূল মন্দির ভেঙে তৈরি হয় জ্ঞানবাপী মসজিদ (Gyanvapi Masjid)। ওই সব মামলাতে একজন মামলাকারীও মহিলা নন।
জ্ঞানবাপী মসজিদ চত্বরে থাকা শৃঙ্গারগৌরী মন্দিরে এখন বছরে একদিন পূজা করার অনুমতি আছে হিন্দু ভক্তবৃন্দের। পাঁচ মহিলা আবেদনকারীর আর্জি আদালত সারা বছর পুজো করার অনুমতি দিক।
সূত্রের খবর, বারাণসীর বাসিন্দা চার মহিলাই গৃহবধূ। মামলায় নাম থাকলেও আদালতে ছোটাছুটি এবং প্রতিনিধিত্ব করছেন স্বামীরা। তাঁরা আবার বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও লতায় পাতায় বিশ্ব বিন্দু পরিষদ এবং আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত।
এক মামলাকারী রাখি সিং দিল্লির বিশ্ব বৈদিক সংস্থান সঙ্ঘ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তিনি যা করার করছেন দিল্লিতে বসে। যদিও মূল মামলাকারী হিসাবে নাম রয়েছে তাঁরই। কিন্তু একদিনের জন্যও আদালতে হাজির হননি। দিল্লি থেকে মামলার কাগজপত্র সইসাবুদ করে পাঠিয়ে দিয়েছেন। ওই সংগঠনের উত্তরপ্রদেশের আহ্বায়ক সন্তোষ সিং সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, রেখা সিং হিন্দুত্বের প্রসারে সামাজিক কাজ করে থাকেন।
কাশী-বিশ্বনাথ মন্দিরের অদূরে হনুমান পাঠক এলাকার বাডি তৃতীয় মামলাকারী রেখা পাঠকের। তাঁর কথায়, 'শৃঙ্গারগৌরী মা’কে পুজো করতে না পারার জন্য খারাপ লাগে। তাই আমি এই মামলায় যুক্ত হয়েছি। বছর চল্লিশের সীতা সাহুও কাশী-বিশ্বনাথ মন্দির চত্ত্বরের অদূরেই থাকেন। তাঁরও বক্তব্য, 'শৃঙ্গারগৌরী মা’কে পুজো করতে না পারার মনবেদনা থেকেই আদালতের দ্বারস্থ হওয়া। বারাণসীর বাকি মামলাকারীদের মতো মঞ্জু ব্যাসও কোনও সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নন। তাঁর কথায়, 'দেবী পুজো থেকে আমরা বঞ্চিত। তাই আদালতের কাছে বিচার চেয়েছি।'
কিন্তু কার বা কাদের কথায় তাঁরা মামলায় যুক্ত হলেন, কীভাবে পাঁচ মহিলার আলাপ-পরিচয় হল, এসব বিষয়ে এই চার মহিলা মুখ খোলেননি। সে সব প্রশ্নের জবাব মিলেছে পঞ্চম মামলাকারী লক্ষ্মী দেবীর স্বামীর মুখ থেকে। ৬৫ বছর বয়সি এই মহিলা বারাণসীর মাহমুরগঞ্জের বাসিন্দা। তাঁর স্বামী সোহনলাল আর্যর কথায়, 'আমার স্ত্রী পুরোপুরি গৃহবধূ। তিনি সাধারণত বাড়ি থেকেই বের হন না।' বাড়ি থেকে কয়েক কিলোমিটার দুরের আদালতেও একদিনের জন্য যাননি। শুনানির দিন যান তাঁর স্বামী।
আসলে এট কাণ্ডের আসল কারিগর বছর সত্তরের সোহনলালই। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বারাণসী মহানগরের ভাইস প্রেসিডেন্ট তিনি। বৃদ্ধ সেই ১৯৮৪ সাল থেকে সংগঠনের মুখপাত্রের কাজও করে চলেছেন। বারাণসীর কাশী-বিশ্বনাথ মন্দির-জ্ঞাননবাপী মসজিদের (Gyanvapi Masjid) জমি বিতর্কের মামলার মূল মামলাকারীও তিনি। ১৯৮৫ সাল থেকে ওই মামলা নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
সোহনলাল জানাচ্ছেন, তিনিই পাঁচ মহিলাকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। নিজের স্ত্রী এবং বাকি চার মহিলাকে বেছে নিয়েছেন তিনিই। তাঁর কথায়, মহিলারাই সংসারে শান্তি-সমৃদ্ধির কামনায় শৃঙ্গারগৌরী দেবীর পুজো করে থাকেন। তাই সেই দেবীর মন্দিরে ভক্তের যাতায়াত অবাধ করার জন্য মামলা মহিলাদের দিয়ে করিয়েছি।
প্রসঙ্গত, মসজিদ চত্ত্বরে হওয়ায় এখন মন্দিরটিতে বছরে মাত্র একদিন পুজো করার অনুমতি দেয় প্রশাসন। প্রশাসনের কাছে বহু বছর ধরে আবেদন-নিবেদন করা হচ্ছে সারা বছর পুজো করার অনুমতি দেওয়া হোক। তাতে সাড়া না মেলাতেই আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন মহিলারা। ওই মামলায় বৃহস্পতিবার বারাণসীর আদালত নতুন করে মসজিদ চত্বরে সমীক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছে। ভিডিওগ্রাফি করার নির্দেশ দিয়েছে গোটা চত্বরের।
আদালতের এই নির্দেশে অনেকেই মনে করছেন, মসজিদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে শৃঙ্গার গৌরী দেবীর মন্দিরে সারা বছর পুজোর অনুমতি দেওয়া যায় কি না, তা খতিয়ে দেখতে চাইছে আদালত। অনেকেরই আশঙ্কা, মন্দির-মসজিদ ঘিরে অসংখ্য বিবাদের তালিকায় এবার যুক্ত হল প্রধানমন্ত্রীর সংসদীয় কেন্দ্র বারাণসী। ইতিমধ্যেই শহরের পরিস্থিতি থমথমে। মসজিদে সমীক্ষা করত দিতে নারাজ মসজিদ কর্তৃপক্ষ। বেশ কয়েকবার বাধা দিয়েছে তারা। এবার আদালতের রায় কীভাবে কার্যকর করে প্রশাসন, দু'পক্ষ আগামীতে কী অবস্থান নেয় সেটাই দেখার।
শিবকুমারের জ্বলন্ত চিতার পাশে একা দাঁড়িয়ে জাকির হুসেন, ফের সম্প্রীতির ফ্রেম খুঁজে পেল দেশ