
শেষ আপডেট: 27 November 2023 15:09
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারত তথা গোটা বিশ্বেরই উদ্বিগ্নের কারণ শিশুশ্রম। শুধু তাই নয়, শিশুদের শিক্ষা ও তাদের মাসসিক সুস্থতা নিয়েও ভাবনার অন্ত নেই। কত পরিবার আছে, যেখানে শিশুদের দু'বেলা দু'মুঠো খাবার তুলে দেওয়াই অসম্ভব, সেখানে পড়াশুনা তো অলীক স্বপ্ন! এইসব শিশুদের নিয়ে ভাবাচ্ছে কলকাতার স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের।
সম্প্রতি ইউনিসেফ ও রোটারি ইন্ডিয়া স্বাক্ষরতা মিশনের একটি আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল। সেখানে উপস্থিত ছিলেন শহরের বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীরা। অনলাইন আলোচনায় শিক্ষার্থীদের কথায় উঠে আসে সমাজের পিছিয়ে পড়া শিশুদের প্রসঙ্গ। যেমন ধরা যাক এমসি কেজরিওয়াল বিদ্যাপীঠের ছাত্র চিরাগ তুলশিয়ানের কথা। সে শিশুশ্রম নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলে, 'আমাদের মতো পড়ুয়াদের এইসব শিশুদের জন্য কিছু করা উচিৎ।' নিজের অভিজ্ঞতার কথা এদিনের অনুষ্ঠানে ব্যক্ত করে চিরাগ।
সে একবার এক গ্রামে ঘুরতে গিয়েছিল, সেখানে গিয়ে অনেক শিশুকে দেখেছে। যাদের পরিবারে দারিদ্র ছিল প্রকট। ওই গ্রামের বেশিরভাগ পরিবারের জীবন নির্ভর করে কৃষিকাজের ওপর। কিন্তু মূলত অনাবৃষ্টি ও অসময়ে বৃষ্টিপাতের ফলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এহেন পরিস্থিতিতে বাবা-মায়েরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাচ্চাদের পড়াশোনা ছাড়িয়ে কাজে যোগ দেওয়াতে বাধ্য হয়। সেইসব বাচ্চাদের নিজের উদ্যোগে পড়াশোনা করানো শুরু করে চিরাগ।
কীভাবে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ করে রেখে, তা ভবিষ্যতে কাজে লাগানো যায়, কীভাবে অনাবৃষ্টির সময় জমানো জল দিয়ে কৃষিকাজে ব্যবহার করা সম্ভব--- সেইসব ছিল চিরাগের পড়ানোর বিষয়। যখন সে শুরু করে তখন হাতেগোনা কয়েকজন বাচ্চা এসেছিল তার কাছে পড়তে পড়তে। একমাসে সেই সংখ্যা অনেক বেড়ে যায় বলে জানায় চিরাগ। সে ওই গ্রাম থেকে চলে এলেও তার শুরু করা পাঠশালা এখনও আছে। এখনও অনেকে সেখানে পড়াশোনা করে।
একা চিরাগ নয়, অনলাইন আলোচনায় হরিয়ানা বিদ্যামন্দিরের তপস্যা জৈনও তুলে ধরে শিশুশ্রমের বিষয়। সে তার বক্তৃতায় জানায়, 'আমার অনুরোধ আপনারা সকলে বুঝুন যে তারাও (সমাজের পিছিয়ে পড়া শিশুরা) মানুষ এবং এই বয়সটা তাদের উপার্জন করার সময় নয়। শিশুশ্রম শিশুদের বিভিন্ন শারীরিক নির্যাতনের শিকার করে তোলে। এতে তাদের পড়াশুনার দফারফা হয়ে যায়।'
চিরাগ ও তপস্যার মতো পড়ুয়াদের কথা শুনে পশ্চিমবঙ্গ শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশনের (WBCPCR) চেয়ারপার্সন সুদেষ্ণা রায় এগিয়ে আসেন। ওই আলোচনায় উপস্থিত সকল ছাত্রছাত্রীদের তিনি অনুরোধ করেন, যাতে তারা তাদের বাড়িতে যাঁরা কাজ করেন তাঁদের বাচ্চাদের যত্ন নেয়। শিশুদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার দায়িত্ব ছাত্রছাত্রীদের সেটাই মনে করিয়ে দেন সুদেষ্ণা রায়।
শুধু শিশুশ্রম নয়, ছাত্রছাত্রীরা যে এখন যথেষ্ট মানসিক চাপের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে সেই নিয়েও বক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। ডিপিএস মেগাসিটি স্কুলের বাঞ্ছিত আগরওয়াল বলে, কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আত্মহত্যার ক্রমবর্ধমান হার যথেষ্ট চিন্তার কারণ। জীবনে বেড়ে ওঠার সময় হতাশা যেন বাধা না হয়ে দাঁড়ায় তা দেখাও জরুরি।
এইসব ব্যাপারে ইউনিসেফ ও রোটারি ইন্ডিয়া একই লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করবে বলে ঘোষণা করেন পশ্চিমবঙ্গের ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত প্রধান অমিত মেহরোত্রা। তিনি বলেন, 'সরকারি সংস্থাগুলির সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি ইউনিসেফ বঞ্চিতদের কাছে পৌঁছনোর জন্য অন্য অনেক সংস্থার সঙ্গেও কাজ করার চেষ্টা করছে। শিশুদের আরও উন্নতির জন্য তাদের মতামত নেওয়া প্রয়োজন।'
আলোচনায় অংশ নিয়ে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিক জয়ন্ত বসু আবার পরিবেশের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, বিশ্ব উষ্ণায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, সুন্দরবনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারী মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে। সেই প্রভাব সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান জয়ন্ত বসু । অনুষ্ঠানে শিশু অধিকার আয়োগের উপদেষ্টা অনন্যা চক্রবর্তীও উপস্থিত ছিলেন।